Image description

দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমছে ২০২৩ সাল থেকে। মধ্যপ্রাচ্যে বিদ্যমান সংকটের কারণে জ্বালানি ও আর্থিক খাতের ওপর চাপ বাড়ছে। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণে ঘাটতি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মতো কাঠামোগত সমস্যাগুলো বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এতে চলতি বছরে দেশে দারিদ্র্য ও আয়বৈষম্য বাড়ছে। দ্রুত জ্বালানি ও রাজস্ব খাতে সংস্কার না হলে প্রবৃদ্ধি বাড়বে না বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি সংকট মেটাতে পারলে ২০২৮ সালে প্রবৃদ্ধি ৩.৯ শতাংশ পৌঁছাতে পারে। এদিকে প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘অপেক্ষা করতে হবে। সময় বলে দেবে প্রবৃদ্ধি কত হবে।’ তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জ্বালানি সংকট কাটানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতির নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানবিষয়ক ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যঁ পেসমে বলেন, অর্থনৈতিক মন্দা এড়ানো এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে হলে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত ও সাহসী সংস্কার প্রয়োজন। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া এবং আরও বেশি ও উন্নত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

গতকাল বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। বিনিয়োগ কার্যক্রমে ভাটা, রপ্তানির গতি কমা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে এবং ব্যবসার ব্যয় বেড়েছে। আর্থিক খাতের দুর্বলতা ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে সীমিত আর্থিক সক্ষমতার কারণে সরকারি বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উন্নতির কারণে দেশের বৈদেশিক খাত স্থিতিশীল। জ্বালানি সরবরাহে ধীরে ধীরে উন্নতি এবং সরকারের সংস্কার কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়িত হলে ২০২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।

প্রতিবেদনে ২০২৮ সালে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের নিচে নামলেও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর মধ্যে ভারতের প্রবৃদ্ধি ৭.১ শতাংশ, পাকিস্তানে ৩ শতাংশ, নেপালে ৪.২ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। শ্রীলঙ্কার প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চলতি ২০২৬ অর্থবছরে দারিদ্র্য ও বৈষম্য বেড়েছে। আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি স্থবির হয়ে পড়েছে এবং নারীরা কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। এ সময়ে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাও আরও বেড়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ থাকলেও ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। রাজস্ব আহরণ জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ, যা বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন। ফলে প্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় করার সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়েছে। ২০২৬ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা ২০২৫ অর্থবছরে ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। বিশ্বব্যাংক বলেছে, সামাজিক সুরক্ষা, জ্বালানি ও কৃষি ভর্তুকি দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে সহায়তা করছে। তবে সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেকই এখনো কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই। এসব কর্মসূচিতে আরও কার্যকরভাবে উপকারভোগী নির্বাচন করা গেলে দারিদ্র্য কমানোর প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। বিভিন্ন খাদ্যভিত্তিক ভর্তুকি একীভূত করা এবং বিদ্যমান নগদ সহায়তা কর্মসূচির আরও কার্যকর লক্ষ্য নির্ধারণের সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড সমন্বয় করা গেলে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদার কারণে বৈশ্বিক ধাক্কা মোকাবিলায় দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকবে এবং চলতি বছর অঞ্চলটির প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। তবে বৈশ্বিক প্রতিকূলতা বাড়ায় ২০২৭ সালে প্রবৃদ্ধি কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে নামতে পারে। বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জুট বলেন, চ্যালেঞ্জিং বৈশ্বিক পরিবেশের মধ্যেও দক্ষিণ এশিয়া উল্লেখযোগ্য স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে। তবে এই গতি ধরে রাখতে এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তিতে বিনিয়োগ প্রয়োজন।

এদিকে চলতি ও আগামী অর্থবছরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মাত্র ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস নিয়ে ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘প্রবৃদ্ধি কত হবে সেটা সময় বলে দেবে।’ গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কার্যালয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। অর্থনীতি সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আইনুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ৩.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। এটি অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতার একটি গুরুতর সতর্কসংকেত। কারণ গত এক দশকে বাংলাদেশের গড় প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৫.৬ শতাংশের কাছাকাছি। ফলে ৩.৪ শতাংশে নেমে আসা অর্থনীতির স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধির গতি থেকে উল্লেখযোগ্য বিচ্যুতি নির্দেশ করে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, কম প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি একসঙ্গে চললে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর দ্বৈত চাপ সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি কমে যায়। বাংলাদেশের মতো দেশে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে; তাই ৩.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থানের চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়।