শিক্ষার্থীদের জীবন রক্ষায় নিজেদের জীবনের পরোয়া না করে আগুনের ভয়াবহতার মধ্যে ছুটে গিয়েছিলেন উত্তরা মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুই শিক্ষিকা মাহরিন চৌধুরী ও মাসুকা বেগম। নিজেরা দগ্ধ হয়েছেন, শেষ পর্যন্ত জীবনও হারিয়েছেন; কিন্তু মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও শিক্ষার্থীদের ছেড়ে যাননি তাঁরা। শিক্ষকতার মানবিক, সাহসী ও আত্মত্যাগী রূপের অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন এই দুই শিক্ষিকা।
প্রতিবছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়। শিক্ষা ও সমাজ গঠনে শিক্ষকদের অবদান, ত্যাগ, দায়িত্ব এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁদের মানবিক দায়বদ্ধতার স্বীকৃতি জানাতেই দিবসটির আয়োজন। তবে বাংলাদেশের মানুষের কাছে এবারের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের স্মৃতিতে বিশেষভাবে ফিরে আসছে উত্তরা মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সেই ভয়াবহ দিনের কথা। বছর ঘুরে বিশ্ব শিক্ষক দিবস আসে, আর সেই সঙ্গে নতুন করে স্মরণে আসে মাহরিন চৌধুরী ও মাসুকা বেগমের সাহসিকতা ও আত্মত্যাগ।
২০২৫ সালের ২১ জুলাই দুপুর। উত্তরা মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ক্যাম্পাসে তখন চলছিল স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম। হঠাৎ বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান ক্যাম্পাসে বিধ্বস্ত হয়। মুহূর্তেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আগুন। সৃষ্টি হয় ভয়াবহ আতঙ্ক। শিক্ষার্থীদের অনেকে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করতে থাকে। চারপাশে তখন শুধু আগুন, ধোঁয়া, আতঙ্ক আর বাঁচার আকুতি।
এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে নিজের নিরাপত্তার কথা ভুলে শিক্ষার্থীদের উদ্ধারে এগিয়ে যান মাহরিন চৌধুরী। আগুনের মধ্যে শ্রেণিকক্ষে ঢুকে তিনি আতঙ্কিত শিক্ষার্থীদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। এরপর একে একে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে থাকেন। অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থীকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার কাজে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
শিক্ষার্থীদের নিরাপদে সরিয়ে দেওয়ার সময় তিনিও দগ্ধ হন। কিন্তু নিজের শরীরের যন্ত্রণা কিংবা মৃত্যুর ভয় তাঁকে থামাতে পারেনি। শিক্ষার্থীদের নিরাপদে সরিয়ে না নেওয়া পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করে যান। তাঁর ভাইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, মাহরিন বলেছিলেন, “তারা-ও তো আমার সন্তান, তারা পুড়ছে, আমি কীভাবে তাদের ছেড়ে আসি?”
এই একটি বাক্যেই যেন ফুটে ওঠে একজন শিক্ষকের সঙ্গে শিক্ষার্থীর সম্পর্কের গভীরতা। শ্রেণিকক্ষে পড়ানো, পরীক্ষার খাতা দেখা কিংবা নিয়ম-শৃঙ্খলা শেখানোর বাইরেও শিক্ষার্থীরা একজন শিক্ষকের কাছে কতটা আপন—মাহরিনের সেই শেষ সময়ের ভূমিকা তারই প্রমাণ।
একইভাবে ভয়াবহ আগুনের মধ্যে শিক্ষার্থীদের উদ্ধারে ছুটে যান আরেক শিক্ষিকা মাসুকা বেগম। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি আগুনের মধ্যে প্রবেশ করেন এবং শিক্ষার্থীদের বের করে আনার চেষ্টা করেন। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে হার মানেন তিনি।
মাসুকা বেগমের এই আত্মত্যাগও মাইলস্টোনের সেই ভয়াবহ দিনের স্মৃতির সঙ্গে চিরস্থায়ী হয়ে আছে। বিপদের মুহূর্তে একজন শিক্ষক যে শুধু নির্দেশ দেন না, বরং প্রয়োজনে শিক্ষার্থীর সামনে নিজের জীবনকে ঢাল হিসেবে দাঁড় করাতে পারেন—তাঁর সাহসিকতা সেটিই প্রমাণ করেছে।
মাহরিন চৌধুরী ও মাসুকা বেগমের গল্প তাই শুধু একটি দুর্ঘটনার গল্প নয়। এটি শিক্ষকতা পেশার মানবিক দায়িত্ব, ভালোবাসা, সাহস ও আত্মত্যাগের গল্প। তাঁদের কাছে শিক্ষার্থীরা শুধু শ্রেণিকক্ষের একটি সংখ্যা ছিল না; তাঁরা ছিলেন সন্তানের মতো। আর সেই কারণেই নিজের জীবন বিপন্ন জেনেও তাঁরা শিক্ষার্থীদের ফেলে নিরাপদে সরে যাননি।
বছর ঘুরে আবারও এসেছে বিশ্ব শিক্ষক দিবস। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে এদিন শিক্ষকদের অবদান নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে। বাংলাদেশেও শিক্ষার্থীরা তাঁদের প্রিয় শিক্ষকদের কথা স্মরণ করছে। কিন্তু এর মধ্যেই অনেকের মনে ফিরে আসছে মাইলস্টোনের সেই কালো দিনের স্মৃতি। মনে পড়ছে আগুনের মধ্যে ছুটে যাওয়া দুই শিক্ষিকার কথা—যাঁরা নিজের জীবন নিয়ে ভাবেননি, ভেবেছেন শিক্ষার্থীদের জীবন নিয়ে।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস শুধু শিক্ষকদের শ্রদ্ধা জানানোর একটি আনুষ্ঠানিক দিন নয়; এটি শিক্ষকতার প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করারও একটি দিন। একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের শুধু বইয়ের জ্ঞান দেন না, তাঁদের মানুষ হতে শেখান, ভালো-মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখান, বিপদে সাহসী হতে শেখান। আর মাহরিন চৌধুরী ও মাসুকা বেগম তাঁদের জীবন দিয়ে যেন সেই শিক্ষারই সবচেয়ে কঠিন বাস্তব উদাহরণ রেখে গেছেন।
তাঁদের আত্মত্যাগের কারণে বেঁচে যাওয়া শিক্ষার্থীদের কাছে এই দুই শিক্ষিকা চিরকাল বেঁচে থাকবেন। তাঁদের পরিবারের কাছে তাঁরা প্রিয়জন, সহকর্মীদের কাছে সাহসের প্রতীক এবং শিক্ষার্থীদের কাছে তাঁরা এমন দুই শিক্ষক, যাঁরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁদের আগলে রেখেছেন।
আজকের বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাই দেশের অসংখ্য শিক্ষকের অবদানের সঙ্গে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হচ্ছে মাহরিন চৌধুরী ও মাসুকা বেগমকে। তাঁদের সাহসিকতা মনে করিয়ে দেয়—শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি দায়িত্ব, ভালোবাসা ও মানবিকতার এক গভীর বন্ধন।
বছর ঘুরে বিশ্ব শিক্ষক দিবস আবারও আসবে। নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা নতুন নতুন শিক্ষকের কাছ থেকে জ্ঞান ও জীবনের পাঠ নেবে। কিন্তু মাইলস্টোনের সেই দুই সাহসী শিক্ষিকার কথা হারিয়ে যাবে না। যতদিন শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের কথা বলা হবে, যতদিন একজন শিক্ষকের মানবিক দায়িত্বের উদাহরণ দেওয়া হবে, ততদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে মাহরিন চৌধুরী ও মাসুকা বেগমের নাম।
তাঁরা দেখিয়ে গেছেন, বিপদের মুহূর্তে প্রকৃত শিক্ষক নিজের নিরাপত্তার আগে শিক্ষার্থীর নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেন। আর সেই কারণেই তাঁদের আত্মত্যাগ শুধু একটি দুর্ঘটনার স্মৃতি নয়—এটি শিক্ষকতার মহত্ত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
উল্লেখ্য, ইউনেস্কোর উদ্যোগে ১৯৯৪ সাল থেকে প্রতি বছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়ে আসছে। শিক্ষা ও উন্নয়নে শিক্ষকদের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি, তাঁদের দায়িত্ব ও অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি এবং সমাজে শিক্ষকদের মর্যাদা তুলে ধরাই এ দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য। বাংলাদেশ সরকারও দিবসটি উপলক্ষে এবছর নানা কর্মসূচি ঘোষণা দেন।