গত দুই বছরে সরকার বদলের সঙ্গে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য বদল হয়েছে মোটাদাগে দুই থেকে তিনবার। এর মধ্যে ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ‘রাজনৈতিক তৎপরতার’ অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় রাজনীতির ছায়া আগের মতোই স্পষ্ট।
এখন নতুন মাত্রা যোগ করেছে শিক্ষকদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের একাংশের আচরণ। এসব ঘটনা কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি; শিক্ষার নিচের স্তর অর্থাৎ স্কুল-কলেজেও তা ছড়িয়েছে।
বরাবরই প্রবণতা হলো, সরকার বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। আবার শিক্ষকদের একাংশের মধ্যেও থাকে দলঘেঁষা সুবিধাবাদী তৎপরতা। শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও শিক্ষাবিদেরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দলীয় রাজনীতির কবলে চলে যাওয়ার সেই পুরোনো দিনগুলোই আবার ফিরে আসছে। এর সঙ্গে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের অবনতির প্রভাব পড়ছে শিক্ষার পরিবেশেও। আর এসবের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পড়াশোনা।
এ বাস্তবতায় আজ ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হচ্ছে। শিক্ষকদের পেশার সুরক্ষা, মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও ভবিষ্যৎ গঠনকে প্রতিপাদ্য করে এবার বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদ্যাপিত হচ্ছে। এবার ১০০ জন শিক্ষককে সম্মাননা দেবে সরকার।
শিক্ষকদের মর্যাদা, অধিকার ও পেশাগত স্বাধীনতার কথা স্মরণ করার দিনে তাই বড় প্রশ্ন—শিক্ষক রাজনীতি কি অধিকার ও পেশাগত স্বার্থ রক্ষার জায়গায় থাকবে, নাকি তা পদপদবি ও ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার হয়ে থাকবে?
বরাবরই প্রবণতা হলো, সরকার বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। আবার শিক্ষকদের একাংশের মধ্যেও থাকে দলঘেঁষা সুবিধাবাদী তৎপরতা। শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও শিক্ষাবিদেরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দলীয় রাজনীতির কবলে চলে যাওয়ার সেই পুরোনো দিনগুলোই আবার ফিরে আসছে। এর সঙ্গে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের অবনতির প্রভাব পড়ছে শিক্ষার পরিবেশেও। আর এসবের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পড়াশোনা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, প্রথমত, সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের পছন্দের লোক বসাতে চায়। দ্বিতীয়ত, অল্পসংখ্যক শিক্ষক পদপদবির জন্য সরকারের আনুকূল্য চাইতে থাকেন। এভাবেই দলবাজির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মূলত আওয়ামীপন্থী শিক্ষকেরাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য হতেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পাওয়া সব উপাচার্য মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেন। তখন বিএনপি ও জামায়াতপন্থী শিক্ষকেরা উপাচার্যের চেয়ারে বসেন।
এখন বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া উপাচার্যদের সরিয়ে ৬১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের প্রায় সবাই বিএনপিপন্থী শিক্ষক রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান পদেও একই ধরনের বেশ কিছু চিত্র দেখা গেছে। অর্থাৎ, পুরোনো ধারাবাহিকতাই চলছে। সাধারণ শিক্ষকদের বড় অংশ এসব চান না বলে আলোচনা রয়েছে। কিন্তু মুষ্টিমেয় শিক্ষকের অতিমাত্রায় রাজনীতির প্রভাব পড়ছে পুরো শিক্ষাঙ্গনে।
শিক্ষা–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, রাজনৈতিক মতপ্রকাশ ও সংগঠন করার অধিকার সবার রয়েছে। সমস্যা হয় তখন, যখন রাজনৈতিক পরিচয় পেশাগত যোগ্যতার জায়গা দখল করে নেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ, শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, প্রশাসনিক দায়িত্ব কিংবা গুরুত্বপূর্ণ পদে দলীয় পরিচয় যোগ্যতার চেয়ে বড় হয়ে উঠলে এর প্রভাব পড়ে পুরো প্রতিষ্ঠানে।
শিক্ষকেরা বলছেন, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা হতে পারে। কিন্তু শারীরিকভাবে হেনস্তা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
শিক্ষকদের হেনস্তার নতুন মাত্রা
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসায় শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, তদন্ত, তালিকা তৈরি, বরখাস্ত, দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া, পদত্যাগে বাধ্য করা কিংবা হেনস্তার ঘটনা ঘটেছে। কোথাও অপরাধ, অসদাচরণ বা প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে সামনে এসেছে রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় সম্পৃক্ততা কিংবা কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে অবস্থানের অভিযোগ। কিছু ঘটনায় শিক্ষকদের নিজেদের দ্বন্দ্ব, দলাদলি ও পদপদবি দখলের প্রতিযোগিতার বিষয়ও উঠে এসেছে।
গত ডিসেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এক শিক্ষককে শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয়। গত জানুয়ারিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষার দায়িত্ব পালন করতে আসা এক শিক্ষককে শারীরিক হেনস্তার পর টেনেহিঁচড়ে প্রক্টর কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। এ রকম ঘটনা আরও আছে। শিক্ষকেরা বলছেন, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা হতে পারে। কিন্তু শারীরিকভাবে হেনস্তা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর সিন্ডিকেট সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জিনাত হুদাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী প্রথম আলোকে বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণে জিনাত হুদাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের তদন্তের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তবে সাময়িক বরখাস্তের বিষয়ে অধ্যাপক জিনাত হুদা প্রথম আলোকে বলেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা ছয়টি অভিযোগের একটিও তারা প্রমাণ করতে পারেনি। শিক্ষক সমিতির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া ও তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার জন্যই এটি করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অপ্রয়োজনীয় বিভাগ বা ইনস্টিটিউট খুলে শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে পদের অপব্যবহার এবং স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছিল।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত দুই বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত ৩২ জন শিক্ষককে একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখাসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর শিক্ষার্থীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ৬০ জনের বেশি শিক্ষক বিভাগীয় সিদ্ধান্তে বা নিজ উদ্যোগে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে বিরত ছিলেন।
এদিকে আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন নীল দলের ২৩১ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও উঠেছে। ‘গোপন তৎপরতায় লিপ্ত’ থাকার অভিযোগে গত ১৩ আগস্ট তিন সদস্যের কমিটি করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলকে সক্রিয় করার লক্ষ্যে ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষকের ‘গোপন তৎপরতায়’ যুক্ত থাকার কথা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯২ জন শিক্ষকের নাম থাকার কথা বলা হয়। তাঁদের মধ্যে ৫৮ জনের নাম শনাক্ত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ১৫ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না, তা পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এসব সিদ্ধান্ত ও তদন্ত নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে ‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক’।
আ.লীগ আমলেও দলবাজি
তবে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কিছু শিক্ষকের অতিমাত্রায় দলবাজির বিষয়টি নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অপ্রয়োজনীয় বিভাগ বা ইনস্টিটিউট খুলে শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে পদের অপব্যবহার এবং স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছিল। তখন অভিযোগ উঠেছিল, যোগ্যতার চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। উপাচার্য নিয়োগেও দলীয় ব্যক্তিরাই প্রাধান্য পেতেন। আবার এসব উপাচার্যের কারও কারও বিরুদ্ধে দলীয়করণের পাশাপাশি ব্যাপকভাবে স্বজনপ্রীতি করার অভিযোগ উঠেছিল। যেমন: খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক একজন উপাচার্য অনিয়ম-স্বজনপ্রীতি করে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে নিজের ছেলে, মেয়ে, শ্যালক-শ্যালিকার ছেলে ও ভাতিজাকে নিয়োগ দেন। সব মিলিয়ে উপাচার্য নিজের পরিবারের সদস্য-আত্মীয়দের মধ্যে নয়জনকে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর স্ত্রীকেও অধ্যাপক পদে নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, যদিও পারেননি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন অভিযোগ ও ঘটনায় ৩৮ জন শিক্ষক-কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দুই শিক্ষক ও দুই কর্মকর্তাকে বরখাস্ত, তিন শিক্ষকসহ ১৭ জনকে সাময়িক বরখাস্ত এবং ১১ শিক্ষককে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে আওয়ামীপন্থী ছয় ডিনকেও দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র
রাজশাহী, জগন্নাথ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একই ধরনের অভিযোগে তদন্ত কমিটি হয়েছে। বিষয়টি উচ্চ আদালতেও গড়িয়েছে।
২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শতাধিক শিক্ষকের বিরুদ্ধে গঠিত ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং, অনুসন্ধান বা তদন্ত কমিটি কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, জানতে চেয়ে রুল দিয়েছেন হাইকোর্ট। ২১ সেপ্টেম্বর একটি রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে এ রুল দেওয়া হয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন অভিযোগ ও ঘটনায় ৩৮ জন শিক্ষক-কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দুই শিক্ষক ও দুই কর্মকর্তাকে বরখাস্ত, তিন শিক্ষকসহ ১৭ জনকে সাময়িক বরখাস্ত এবং ১১ শিক্ষককে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে আওয়ামীপন্থী ছয় ডিনকেও দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া জুলাই অভ্যুত্থানবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে প্রায় ৩০০ শিক্ষকের তালিকা উপাচার্যের কাছে দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গত দুই বছরে শিক্ষকদের ঘিরে অন্তত ছয়টি ঘটনায় উত্তেজনা, বিক্ষোভ, হেনস্তা, তদন্ত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় জড়িত ও মদদ দেওয়ার অভিযোগে ১৯ জন আওয়ামীপন্থী শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত হয়। এর ভিত্তিতে ১০ জনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে এ শাস্তি নিয়ে শিক্ষার্থীদের আপত্তি থাকায় তা এখনো অনিষ্পন্ন অবস্থায় আছে।
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ কেকা রায় চৌধুরী ও সহকারী অধ্যাপক ফারহানা খানম ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট মবের শিকার হয়ে পদত্যাগ করেন। পরে তাঁরা আদালতের আশ্রয় নেন। এখনো বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়নি।
মবের শিকার শিক্ষক
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে বেসরকারি স্কুল-কলেজেও সরকার পরিবর্তনের পর ‘মব’ করে শিক্ষকদের হেনস্তা ও জোর করে পদত্যাগ করানোর বহু ঘটনা ঘটেছে। তবে কত শিক্ষক এমন ঘটনার শিকার হয়েছেন, তার তথ্য সরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে নেই।
জোরপূর্বক পদত্যাগ, অপসারণ, বরখাস্ত, বাধ্যতামূলক ছুটি, কর্মস্থলে অবাঞ্ছিত ইত্যাদি ঘটনার শিকার শিক্ষকদের নিয়ে একটি সংগঠন গড়ে তোলা হয়েছে। ‘পদবঞ্চিত প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষক জোট’ নামে এ সংগঠনের আহ্বায়ক আনোয়ারুল ইসলাম তালুকদার বলেন, তিনি ধামরাইয়ের সূয়াপুর নান্নার স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। জুলাই অভ্যুত্থানের পর তাঁকে জোর করে পদত্যাগ করানো হয়।
আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, তাঁদের সংগঠনে এমন ভুক্তভোগী শিক্ষকের সংখ্যা ৩০০। তবে তাঁরা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, প্রায় ৯৫০ জন শিক্ষকের এমপিও বন্ধ আছে। আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বেতন বন্ধ আছে প্রায় সাড়ে চার হাজার শিক্ষকের।
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ কেকা রায় চৌধুরী ও সহকারী অধ্যাপক ফারহানা খানম ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট মবের শিকার হয়ে পদত্যাগ করেন। পরে তাঁরা আদালতের আশ্রয় নেন। এখনো বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়নি।
ঢাকা সিটি কলেজের অধ্যক্ষ বেদারউদ্দিন আহমেদকেও জোর করে পদত্যাগ করানো হয়। ২০২৫ সালের মার্চে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়, তাঁর পদত্যাগ সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সঠিক হয়নি। বর্তমান অধ্যক্ষ কাজী নেয়ামুল হকের নিয়োগ বৈধ না হওয়ায় বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়। এখনো কোনো ব্যবস্থা হয়নি। বেদারউদ্দিন আহমেদ আদালতের আশ্রয় নিয়েছেন। ২০২৪ সালের আগস্টে এই কলেজের শিক্ষক কায়কোবাদ সরকারসহ আরও ছয়জন শিক্ষককে বহিষ্কার করা হয়েছিল। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তাঁদের পুনর্বহালের নির্দেশ দিলেও কলেজ কর্তৃপক্ষ তা মানছে না বলে ওই শিক্ষকদের একজন প্রথম আলোকে জানিয়েছেন।
শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আওয়ামী লীগ, অন্তর্বর্তী সরকার ও বিএনপি—সব সরকারের আমলেই কমবেশি শিক্ষকদের দলবাজির ঘটনা ঘটছে। এতে যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব ও দায়িত্ব বণ্টনের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে না; রাজনৈতিক সমীকরণ শিক্ষকতার ক্যারিয়ারে প্রভাব ফেলে। তবে শিক্ষকদের ‘দলবাজির’ সমালোচনা করতে গিয়ে অপরাধের জবাবদিহি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কোনো শিক্ষক হামলা, সহিংসতা, দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ, দায়িত্বে গুরুতর অবহেলা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিভঙ্গের সঙ্গে জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত ও শাস্তি হওয়া উচিত। বিচার হতে হবে প্রমাণের ভিত্তিতে, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিয়ে। কিন্তু দলবাজি বন্ধ হতে হবে।
দলীয় রাজনীতিতে এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনীতির একটি বড় অংশ হলো শিক্ষক-কর্মচারীদের দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠা। পাঠদানের চেয়ে রাজনীতিতে বেশি সক্রিয় থাকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। স্থানীয় পর্যায়ে অনেকে সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত, যার প্রভাব পড়ে শিক্ষা কার্যক্রমে।
তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের (সরকার থেকে বেতন-ভাতাপ্রাপ্ত) রাজনীতি বন্ধ করতে আচরণবিধি করার চিন্তা আছে সরকারের।
এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক প্রথম আলোকে বলেন, এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। তবে তিনি ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের রাজনীতি বন্ধ হওয়া উচিত।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আরেকটি সমস্যা হলো, দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিতে দীর্ঘদিন ধরে দলীয় ছায়া কাজ করছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যদের আত্মীয়স্বজন, ঘনিষ্ঠজন, অনুসারী বা দলীয় নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন পদে বসছেন। আর্থিকভাবে লাভের সুযোগ আছে—এমন কাজেই বেশি আগ্রহী থাকার অভিযোগ রয়েছে এসব কমিটির বিরুদ্ধে।
এত দিন সহকারী শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারত পরিচালনা কমিটি। এখন তা এনটিআরসিএর মাধ্যমে হয়। স্কুল-কলেজের অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগও এনটিআরসিএর মাধ্যমে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
বাংলাদেশ অধ্যক্ষ পরিষদের সভাপতি ও প্রবীণ শিক্ষকনেতা মোহাম্মদ মাজহারুল হান্নান প্রথম আলোকে বলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা মূল বেতনের শতভাগই সরকারের কাছ থেকে পান। কম হলেও কিছু ভাতাও পান। তাই সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও পরিচালনা পর্ষদ প্রয়োজন নেই।
এসব অবশ্যই বন্ধ হওয়া উচিত
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের সহজ উপায় হলো যথার্থ ব্যক্তিকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া। কিন্তু বর্তমানে এখানেই বড় ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষকদের বেতন-ভাতাও কম। ফলে অনেক শিক্ষক অর্থনৈতিক লাভের আশায় কোচিং, প্রাইভেটসহ নানা কাজে ছুটছেন।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মনে করেন, দলবাজি অবশ্যই বন্ধ হওয়া উচিত। দলবাজির জন্য শুধু শিক্ষকদের দায়ী করলে হবে না, বরং সরকারের দায় বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন চাওয়ার মূল উদ্দেশ্যই ছিল বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বাধীন রাখা। নির্বাচনের মাধ্যমে ডিন, সিনেট, সিন্ডিকেটসহ বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্ব নির্বাচিত হবে, যাতে গণতান্ত্রিক চর্চা থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই গণতান্ত্রিক মডেল আর নেই।
[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন প্রথম আলোর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি]