২৩ বছরের ইসরাফিল হককে কৌশলে প্রথমে পানীয়র সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাওয়ায়ে অচেতন করা হয়। রানা নামে পূর্বপরিচিত একজনের সহযোগিতায় ঘুমন্ত এই যুবককে নাইলনের রশি দিয়ে দুই হাত ও পা বেঁধে ফেলেন আপন দুই ভাই ইসমাইল ও ইব্রাহিম। আর্তচিৎকার যাতে করতে না পারেন, সেজন্য মুখ বাঁধা হয় গামছা দিয়ে। এর মধ্যে সজাগ হতেই দেখেন ইসমাইলের হাতে চাপাতি। তখন লোহার পাইপ দিয়ে মাথায় জোরে আঘাত করলে অচেতন হয়ে পড়েন তিনি। এরপর চাপাতি দিয়ে কনুই থেকে তার দুই হাত বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।
আপন দুই ভাইয়ের হাতে এমনই নৃশংসতা ঘটেছে গত বছরের ২৪ এপ্রিল নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার খাজুর কাজিপাড়া এলাকায়। ভুক্তভোগী ইসরাফিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার চকঘোড়াপাখিয়া এলাকার তাইজুল ইসলামের ছেলে। তবে তারা জীবিকার প্রয়োজনে নাটোরের সিংড়ার হাতিয়ান্দহ এলাকায় থাকতেন।
ইসরাফিল পেশায় নির্মাণশ্রমিক ছিলেন। পরিবারের দাবি, মেজো ভাই ইসমাইলের স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়ার অভিযোগে এমনটা করা হয়েছে। ঘটনার পর থেকে তিনি চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছেন। পুরো শরীর স্বাভাবিক থাকলেও তার দুই হাতের কার্যক্ষমতা নেই।
এ ঘটনায় অনেক গড়িমসি করার পর মামলা করেন ইসরাফিলের বড় ভাই ব্যাংক কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান হাবিব। তবে শুরু থেকে তার ভূমিকা রহস্যজনক। এখন পরিবার মামলা তুলে নিয়ে ইসরাফিলকে হুমকি দিচ্ছে। এ কারণে ২০ দিন ধরে মা ভাত খেতে দিচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী। তার আইনজীবী জানিয়েছেন, এ মামলা প্রত্যাহারের সুযোগ নেই।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর ইসরাফিলের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। এরপর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও দীর্ঘ অনুসন্ধানে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠেছে। জানা গেছে, গত বছরের ২৩ এপ্রিল বিকালে ইসরাফিল পেশাগত কাজে নাটোর শহরে অবস্থান করছিলেন। এ সময় নলডাঙ্গার খাজুর কাজিপাড়া এলাকার কামরুজ্জামানের ছেলে রানা তার সঙ্গে দেখা করেন। একপর্যায়ে রানা কোমল পানীয়ের সঙ্গে ঘুমের ট্যাবলেট মিশিয়ে ইসরাফিলকে খাওয়ান। অচেতন হয়ে পড়লে রানা তাকে নিজ বাড়িতে নিয়ে যান। রাতে রানা ফোন করে ইসমাইল ও ইব্রাহিমকে ডাকেন। ভোর ৫টার দিকে ইসরাফিলকে হাত ও পা নাইলনের রশি দিয়ে এবং মুখ গামছা দিয়ে বেঁধে প্রথমে লোহার পাইপ দিয়ে মাথায় জোরে আঘাত করেন তারা। পরে চাপাতি দিয়ে দুই হাত কনুই থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।
এ ঘটনার পর স্থানীয়রা ইসরাফিলকে নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে মাত্র দুদিন চিকিৎসার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আপত্তি সত্ত্বেও জোর করে রিলিজ নিয়ে তাকে বাড়ি আনেন বড় ভাই হাবিব। বাড়ি নিয়ে যাওয়ার পর তাকে একটি কক্ষে বন্দি করে রাখা হয়। অল্প কিছুদিন প্রয়োজনীয় ওষুধ খাওয়ানোর পর বন্ধ করে দেওয়া হয়। এমনকি চিকিৎসার কাগজপত্রও গায়েব করে ফেলেন হাবিব।
ইসরাফিলের অভিযোগ, তার ভাই হাবিব শুরুতে মামলা করতে রাজি ছিলেন না। এরপর পুলিশ জানায় যে, এ ঘটনায় পরিবারের কেউ মামলা না করলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে। বাধ্য হয়ে হাবিব তার দুই ভাই এবং রানাকে আসামি করে নলডাঙ্গা থানায় মামলা করেন। হাবিব মামলা করলেও কোনো আইনজীবী নিয়োগ দেননি। শেষে গত বছরের ১৩ অক্টোবর জাতীয় আইন সহায়তা প্রদান সংস্থা বিশ্বজিৎ কুমার ঘোষ নামে একজন আইনজীবীকে ইসরাফিলের কৌঁসুলি হিসাবে নিয়োগ দেন। এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নলডাঙ্গা থানার এসআই শাহীন বাদশা জানান, যে ঘরে ইসরাফিলের ওপর হামলা হয়, সেখানে চালের ড্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া দুই হাতের অংশ উদ্ধার করা হয়।
ইসরাফিলের দাবি, কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর গোপনে নাটোর আদালতে মামলার বিষয়ে খোঁজ নেন তিনি, যা তার পরিবার ভালোভাবে নেয়নি। এ মামলায় তার সেজো ভাই ইব্রাহিম কারাগারে রয়েছেন। অপর দুই ভাই এবং বাবা-মা তাকে প্রতিনিয়ত মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দিচ্ছেন। মামলা তুলে না নিলে দুই চোখ উপড়ে এবং পা ভেঙে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে কয়েকদিন ধরে বেশ কয়েকবার ফোন করেও হাবিবের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তার বাবা তাইজুল ইসলাম বলেন, ‘ভাবির সঙ্গে পরকীয়ার কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে অন্য দুই ভাই তার হাত কেটে নিয়েছে। ইসরাফিলের মা অসুস্থ। এ কারণে তাকে খাওয়ানো ও গোসল করাসহ অন্য কাজ করতে পারছেন না। তাকে খেতে না দেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়। তাকে মামলা তুলে নিতে বলেছি। এজন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগ ভিত্তিহীন।’
ইসরাফিলের আইনজীবী বিশ্বজিৎ কুমার ঘোষ বলেন, ‘যে ঘটনাটি ঘটছে, তা অত্যন্ত নৃশংস। পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ সৃষ্টি করলেও তার সুযোগ নেই।’
ইসরাফিল বলেন, ‘মামলা প্রত্যাহারে রাজি না হওয়ায় মা রাহেলা বেগম এখন আর আমাকে খাবার দিচ্ছেন না। গত ২০ দিন থেকে ভাত খাইনি। টয়লেটে নিয়ে যাচ্ছেন না মা। এক মাস ধরে একই পোশাক পরে আছি।’ আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘পরিবারের লোকজন বাইরের মানুষের সঙ্গে মিশতে দিচ্ছেন না। তাদের চোখ এড়িয়ে দু-একবার বাইরে যাই। দয়া করে কেউ হালকা কিছু দিলে খাই। আমি মানুষের সহযোগিতা চাই। বিচ্ছিন্ন দুই হাত প্রতিস্থাপনে এগিয়ে আসার জন্য সমাজের বিত্তবান মানুষের কাছে বিশেষভাবে অনুরোধ জানাই।’