Image description

ব্যাংক খাতে আর্থিক সংকটের চিত্র ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। দেশের ৬৩টি ব্যাংকের ২২টি পুঞ্জীভূত লোকসানে রয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ২২টি ব্যাংকের পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা। একই সময়ে পুরো ব্যাংক খাতে পরিচালন মুনাফা ৭৮৯ কোটি টাকা হলেও নিট ক্ষতি হয়েছে ৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণ বেড়ে ৫ লাখ ৮১ হাজার ২৩৭ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অন্যদিকে, তারল্য সংকটে পড়া ১২টি ব্যাংককে সহায়তা হিসেবে ৮৪ হাজার ৯৪৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই সহায়তা দেওয়া হয়েছে। রোববার জাতীয় সংসদে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ব্যাংক খাতের এমন পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়।

সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে ব্যাংক খাতের স্বচ্ছ, জবাবদিহি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন কমিটির সদস্যরা। এ বিষয়ে পরবর্তী বৈঠকে সুস্পষ্ট তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপনের জন্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশের ২২টি ব্যাংক পুঞ্জীভূত লোকসানে রয়েছে। এসব ব্যাংকের মধ্যে চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক, দুটি বিশেষায়িত ব্যাংক, ১৫টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং একটি বিদেশি ব্যাংক রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে- জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংক। বিশেষায়িত ব্যাংক দুটি হলো- বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি) ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব)। লোকসানে থাকা বেসরকারি ব্যাংকগুলো হলো- এবি, বাংলাদেশ কমার্স, এক্সিম, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, আইসিবি ইসলামিক, আইএফআইসি, ইসলামী, মেঘনা, ন্যাশনাল, গ্লোবাল ইসলামী, পদ্মা, সীমান্ত, সোশ্যাল ইসলামী, দ্য প্রিমিয়ার ও ইউনিয়ন ব্যাংক। এ তালিকায় বিদেশি ব্যাংক হিসেবে রয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংক খাতের সম্পদের বিপরীতে উপার্জনের হার (আরওএ) ঋণাত্মক ১ দশমিক ০৩ শতাংশ এবং মূলধনের বিপরীতে উপার্জনের হার (আরওই) ঋণাত্মক ৪৪ দশমিক ২২ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর সম্পদ ও মূলধন ব্যবহারের বিপরীতে আয় পরিস্থিতিও নেতিবাচক।

ব্যাংকগুলোর লোকসানের পেছনে উচ্চ শ্রেণিকৃত ঋণ, প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ, মূলধন ঘাটতি ও সম্পদের দুর্বল মানকে দায়ী করা হয়েছে। এসব কারণে পরিচালন পর্যায়ে মুনাফা হলেও প্রভিশন, অন্যান্য ব্যয় ও সম্ভাব্য ঋণজনিত ক্ষতি সমন্বয়ের পর অনেক ব্যাংক নিট লোকসানে পড়ছে।

বৈঠকে জানানো হয়, ব্যাংক খাতের আর্থিক সক্ষমতার আরেকটি বড় দুর্বলতা মূলধন সংকট। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ৪০টি ন্যূনতম প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণ করতে পেরেছে। বিপরীতে, ১৫টি ব্যাংকের মূলধন ঋণাত্মক।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার হার (সিআরএআর) মার্চ ২০২৬-এ ঋণাত্মক ৩ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এ হার ছিল ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে মূলধন পর্যাপ্ততার হার আরও ০ দশমিক ৫৩ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে।

মূলধনের এই দুর্বলতা ব্যাংকগুলোর লোকসান মোকাবিলা, আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতাকে চাপে ফেলছে। এ পরিস্থিতিতে দুর্বল ব্যাংকগুলোর মূলধন পুনর্গঠন ও পুনঃমূলধনীকরণ জরুরি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পাশাপাশি সামগ্রিক শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ব্যাংক খাতে মোট ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ ছিল ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। একই সময়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮১ হাজার ২৩৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। মোট ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণের হার ৩১ দশমিক ৪১ শতাংশ। এর আগে ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৬৪ হাজার ১০৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। সে হিসাবে তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ১৩১ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এ সময়ে খেলাপি ঋণের হার ৩০ দশমিক ৯২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩১ দশমিক ৪১ শতাংশ হয়েছে।

অন্যদিকে, মার্চ শেষে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। তিন মাসে শ্রেণিকৃত ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা।

তবে এক বছরের তুলনায় শ্রেণিকৃত ঋণের অনুপাতে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ২০২৫ সালের জুন শেষে শ্রেণিকৃত ঋণের হার ছিল ৩৪ দশমিক ৪০ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুনে তা কমে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ হয়েছে। তা সত্ত্বেও শ্রেণিকৃত ঋণের বিপুল পরিমাণ ব্যাংক খাতের সম্পদের মান ও ঋণ আদায় পরিস্থিতি নিয়ে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।

শ্রেণিকৃত ঋণের মধ্যে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অংশ সবচেয়ে বেশি। জুন শেষে এসব ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৩৩ হাজার ৭০৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর শ্রেণিকৃত ঋণ ছিল ১ লাখ ৫২ হাজার ৪৬৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।

খেলাপি ঋণের উচ্চ হার কমাতে ১০ শতাংশের বেশি শ্রেণিকৃত ঋণ রয়েছে-এমন ব্যাংকগুলোর সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট টিমের সঙ্গে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে আলোচনা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শ্রেণিকৃত ঋণ আদায়ে প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে তা সমাধানের জন্য ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে কর্মপরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গভর্নরের নেতৃত্বে ব্যাংকগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে সভা করে ঋণ আদায়ের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

১২ ব্যাংককে জরুরি সহায়তা ৮৪ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা: তারল্য সংকট সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ১২টি ব্যাংককে জরুরি সহায়তা দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, ‘ল্যান্ডার অব লাস্ট রিসোর্ট’ হিসেবে দেওয়া ডিমান্ড লোনের পরিমাণ ৮৪ হাজার ৯৪৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এই সহায়তার মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পেয়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকা। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংককে দেওয়া হয়েছে ১৫ হাজার ৮১০ কোটি ৩২ লাখ টাকা, এক্সিম ব্যাংককে ১২ হাজার ১০ কোটি ২৫ লাখ টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে ১০ হাজার ৮৪২ কোটি ৭৯ লাখ টাকা এবং ন্যাশনাল ব্যাংককে ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।

এ ছাড়া ইউনিয়ন ব্যাংককে ৫ হাজার ৪২১ কোটি ১৬ লাখ, দ্য প্রিমিয়ার ব্যাংককে ৪ হাজার ৯০০ কোটি, এবি ব্যাংককে ৪ হাজার ২৭০ কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংককে ৩ হাজার ৩ কোটি ৮০ লাখ, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংককে ৬১৪ কোটি ৬৮ লাখ, পদ্মা ব্যাংককে ২৫২ কোটি ৩৮ লাখ এবং আইসিবি ইসলামিক ব্যাংককে ২৫১ কোটি ৯৮ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারে ডিমান্ড লোন নবায়ন বা রোলওভারের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধান উল্লেখ নেই। বর্তমানে সুদ পরিশোধের শর্তে ব্যাংকগুলো এসব ঋণ রোলওভার করছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, অধিকাংশ প্রচলিত ধারার ব্যাংকে পর্যাপ্ত তারল্য থাকলেও কিছু প্রচলিত ধারার ব্যাংক এবং অধিকাংশ ইসলামী ধারার ব্যাংকে তারল্য ঘাটতি রয়েছে। ব্যাংকগুলোর তরল সম্পদের বড় অংশ সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৩১ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত তফসিলি ব্যাংকগুলোর আবশ্যকীয় নগদ জমা সংরক্ষণের (সিআরআর) পরিমাণ ছিল ৬৯ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ব্যাংকগুলো ৮৯ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা নগদ জমা রেখেছিল। একই সময়ে আবশ্যকীয় সহজে বিনিময়যোগ্য সম্পদের (এসএলআর) পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৫৪ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা।

বৈঠকে আরও জানানো হয়, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের আইএফসি'র সহায়তায় আধুনিক অবয়বে নতুন দেউলিয়া বিষয়ক আইনের খসড়ার ইংরেজি সংস্করণ চূড়ান্ত করা হয়েছে। খসড়াটি বাংলায় অনুবাদের জন্য আইএফসি-কে সহায়তার অনুরোধ করা হয়েছে। বাংলা সংস্করণ চূড়ান্ত হওয়ার পর পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য তা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হবে।

কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠকে আরও অংশগ্রহণ করেন কমিটির সদস্য ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, জালাল উদ্দিন, মঈনুল ইসলাম খান, সফিকুর রহমান কিরন, সাইফুল আলম, সৈয়দ জয়নুল আবেদীন এবং আবুল হাসনাত।

বৈঠক শেষে জামায়াতের সাইফুল আলম সাংবাদিকদের জানান, আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য দলের পক্ষ থেকে তারা একটি প্রস্তাব তুলে ধরেছেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ব্যাংকের সংখ্যা কমাতে হবে। এতটুকু দেশে এত ব্যাংক আমাদের দরকার নেই, প্রায় ৬৩টা ব্যাংক আছে।

তিনি বলেন, কোন ব্যাংকের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর, অ্যাডিশনাল ম্যানেজিং ডাইরেক্টর, ডেপুটি ম্যানেজিং ডাইরেক্টরকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া চেয়ারম্যান বা পরিচালনা পরিষদ অপসারণ করতে পারবে না।

সাইফুল আলম আরও বলেন, দেশে অডিট যেটা হয়, এই অডিট আসলে সাহায্য করছে না। ফরেনসিক অডিট করতে হবে। আমার আসলে এনপিএল কত, আমানত কত, পুঁজি কত—এটা ফরেনসিক না করলে বুঝতে পারা যাবে না।