কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) উত্তরাঞ্চলজুড়ে নানা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। এ অঞ্চলের কৃষি উন্নয়নে সেচনালা নির্মাণ, খালখনন, বৃক্ষরোপণ, নিবিড় সেচ প্রদান এবং গ্রামীণ সড়ক নির্মাণের মতো প্রকল্প খাতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে সংস্থাটি বিপুল পরিমাণ অর্থ পেয়ে থাকে। কিন্তু এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে সংস্থাটির প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বারবার অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন। ক্রয়, টেন্ডার সেবা থেকে সব ক্ষেত্রে দুর্নীতির সর্বগ্রাসী থাবা বিএমডিএকে অতি দুর্নীতিপ্রবণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে।
সম্প্রতি বিএমডিএ’র ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ৬৭২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি করেছে কৃষি ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের হিসাব সম্পর্কিত ১৬ সদস্যের কমপ্লায়েন্স অডিট ইন্সপেকশন টিম। বিএমডিএ’র প্রধান কার্যালয়, আট প্রকল্প ও ১১টি আঞ্চলিক কার্যালয় এবং ২০টি ব্যয় কেন্দ্রের শতাধিক অনিয়ম-দুর্নীতি শনাক্ত করেছেন টিমের সদস্যরা। এসব অনিয়ম-দুর্নীতির আর্থিক মূল্য ৩৩৯ কোটি ৯৭ লাখ ৫৭ হাজার ৫৩২ টাকা। এ আর্থিক দুর্নীতি বিএমডিএ’র ৪০ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। অর্থ ব্যয়ে বিএমডিএ’র নির্বাহী পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারিতার ভয়াবহ চিত্র প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে বিএমডিএ নির্বাহী পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম খান জানান, অনেকগুলো আপত্তির জবাব ও ব্যাখ্যা আমরা দিয়েছি। যেসব বিষয়কে আর্থিক অনিয়ম হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে সেগুলো নিষ্পত্তির জন্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে আমরা বৈঠক ও আলোচনা করছি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অর্থ ব্যয়ের যুক্তিসংগত কারণ থাকে। আশা করি-এসব বিষয় নিষ্পত্তি হয়ে যাবে।
জানা গেছে, নিয়ম অনুযায়ী-বাধ্যতামূলকভাবে তহবিলের (এফডিআর) ৫০ ভাগ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে রাখতে হবে। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪০টি ব্যাংকে বিএমডিএ ২৭২টি এফডিআরে ৪০৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা জমা রাখে। সিংহভাগ অর্থই ২২টি বেসরকারি ব্যাংকে রাখা হয়। এর পরিমাণ ২৯৮ কোটি ৮ লাখ ১০ হাজার টাকা। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ আটটি ব্যাংকে সীমার অতিরিক্ত ৮৫ কোটি ৮০ লাখ ৫৬ হাজার ৩৬৭ টাকা রাখা হয়েছে। এছাড়া ২০২৪ সালের ৩০ জুনের মধ্যে প্রয়োজন ছাড়াই নাটোর জোনে ১ কোটি ৯ লাখ ৫ হাজার ৫৯০ টাকায় স্বল্প উত্তোলক পাম্প (এলএলপি) কেনা হয়েছে। দুই বছর ধরে গুদামে পাম্পগুলো ফেলে রাখা হয়েছে। নাটোরে সেচ প্রকল্পের বাঁধ নির্মাণের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সুপারস্টার এনার্জিকে ৭ কোটি ৬২ লাখ ৭৬ হাজার ৩২১ টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ঠিকাদার ৭ হাজার ২৬৫ সিসি ব্লক সরবরাহ করলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ১০ হাজার ৬৬৮ ব্লকের বিল পরিশোধ করেছেন। অতিরিক্ত ২২ লাখ ৩৯ হাজার ১৭৭ টাকা বেশি পরিশোধ করা হয়েছে।
বিভিন্ন পূর্ত কাজ ও পণ্য ক্রয়ে এক বছরে ১০৯ কোটি ৭৭ লাখ ৫৯ হাজার ২৬৭ টাকার আর্থিক অনিয়ম করেছেন বিএমডিএ’র কর্মকর্তা। সংশ্লিষ্টরা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছেন। ইউপিভিসি পাইপ সরবরাহে ৯ ঠিকাদারকে ১২টি লটের ১০টি বিলের বিপরীতে ৫৪ কোটি ৯২ লাখ ২৩ হাজার ৮৩১ টাকা পরিশোধ করেন নির্বাহী পরিচালক (ইডি)। এ বিপুল পরিমাণ বিল পরিশোধের ক্ষমতাপ্রাপ্ত নন তিনি। অসৎ উদ্দেশ্যে একই প্রকল্পের সেচনালা নির্মাণকাজের ৬৬টি প্যাকেজকে ১০টি করে উপলটে ভাগ করে তিনি ৬৬০টি ছোট প্যাকেজে পরিণত করেছেন। পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দিতে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই তিনি আরও ৫৪ কোটি ৮৫ লাখ ৩৫ হাজার ৬৩৮ টাকা পরিশোধ করেছেন। ১০ তলা বিএমডিএ ভবন নির্মাণে অনিয়মের মাধ্যমে অনভিজ্ঞ ও অদক্ষ প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শক নিয়োগ দিয়ে ৫৫ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এ কাজে পাঁচটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আবেদন করলেও কারিগরি যোগ্যতাহীন প্রতিষ্ঠান দোয়া প্রোপার্টিজ অ্যান্ড ইকোটেক পরামর্শক নিয়োগ করা হয়।
বিএমডিএ’র রংপুর ও নাটোরে সেচ সম্প্রসারণ প্রকল্প শেষ হওয়ার এক বছর পরও অব্যয়িত ৮ কোটি ৮৬ লাখ ১০ হাজার টাকা সরকারের কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়নি। গভীর নলকূপের বিদ্যুৎ বিল বাড়িয়ে ৩৯ লাখ ৯৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত তুলে নিয়েছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ। আবার অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের টাকা কৃষকের কাছ থেকে আদায় করা হয়েছে। গভীর নলকূপসহ সেচ অবকাঠামো সংস্কার ও পুরোনো উপকরণ বিক্রির টাকা না কেটে না রেখেই ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এতে ৬ লাখ ৮৫ হাজার টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। রংপুর ও ঠাকুরগাঁও জোনে খাল খাড়ি পুনঃখননে অতিরিক্ত মাটির কাজ দেখিয়ে ১ কোটি ৩৪ লাখ ৮৯ হাজার টাকার আর্থিক অনিয়ম করা হয়েছে।
বিপুল ব্যয়ে সোলার প্যানেল স্থাপন করা হলেও জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত না করায় সরকারের ২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়া ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়, অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে ট্রান্সফরমার সরবরাহে ১১ লাখ টাকা, বনায়ন খাতে ৬৩ লাখ ৮৬ হাজার, ব্যাংক আমানতের সুদ বাবদ ২৭ লাখ ৫৫ হাজার, মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দের অতিরিক্ত ১৩ কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয়, কাজ না করেই ঠিকাদারকে ২ কোটি ৩৮ লাখ টাকার বিল প্রদান, টেন্ডার বাতিলের পরও ১ কোটি ২৫ লাখ টাকার বিল পরিশোধ, মন্ত্রণালয়ের অুনমোদন ছাড়াই আগের বছরের ৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা পরিশোধ, বিবিধ আয়ের ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না করা, উন্মুক্ত টেন্ডারকে সীমিত টেন্ডারে পরিণত করে ৪ কোটি ৬১ লাখ টাকার বিল প্রদান ও একই পণ্য একই সময়ে একই প্রতিষ্ঠান থেকে বেশি দরে ক্রয় করে ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল পরিশোধের মতো আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। এছাড়া আরও ৭৯টি ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অনিয়ম শনাক্ত করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে আরও ১২০ কোটি টাকা অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে।