দেশের অন্তত এক হাজার ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ও সদস্যদের মেয়াদ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হতে যাচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী, মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকে পদ হারাবেন বর্তমান জনপ্রতিনিধিরা। তাদের স্থলে প্রশাসক নিয়োগ দিচ্ছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অন্তত ১৪৪ জন প্রশাসক ইতোমধ্যে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাদের কেউ সরকারি কর্মকর্তা আবার কেউ সরকারদলীয় নেতাকর্মী। যদিও স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন অনুযায়ী, সর্বশেষ নির্বাচন থেকে পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগের ১৮০ দিনের মধ্যে আরেকটি ভোট হওয়ার কথা।
কিন্তু তা না হওয়ায় দেশের তৃণমূল মানুষের নাগরিক সেবা দেওয়া এসব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম যাচ্ছে অনির্বাচিত ব্যক্তিদের হাতে। তবে সরকার ও নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে বলা হচ্ছে, আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে সব ইউপিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইসি ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। ইসি সূত্র আরও জানিয়েছে, চলতি বছরে তিন হাজারের বেশি ইউপি নির্বাচনের নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হচ্ছে। এর মধ্যে শুধু নভেম্বর মাসে এক হাজার ৮৫০টির বেশি ও ডিসেম্বরে প্রায় সাড়ে আটশ ইউপির ভোটের সময়সীমা শেষ হবে। তবে সরকারের অনাগ্রহের কারণে চলতি বছরে এসব ইউপিতে নির্বাচন আয়োজন করবে না কমিশন। জানুয়ারিতে দুই থেকে তিন ধাপে কমবেশি দুই হাজার ইউপিতে ভোটগ্রহণের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। বাকি ইউপির নির্বাচন রোজা, ঈদ, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে দিনক্ষণ ঠিক করবে ইসি। ওই নির্বাচনে জয়ী হওয়া নতুন জনপ্রতিনিধিরা দায়িত্ব নেওয়ার আগ পর্যন্ত দায়িত্বে থাকবেন প্রশাসকরা।
দেশের অন্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও পৌরসভাগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে নেই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন প্রশাসকরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্ধারিত সময়ে ভোট না হওয়া এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে অনির্বাচিত ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়া গণতন্ত্র চর্চার পরিপন্থি। এতে নাগরিক সেবা ব্যাহত হচ্ছে। উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্থানীয় অগ্রাধিকার কমে যাচ্ছে।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান প্রশাসক দিয়ে পরিচালনা সাংবিধানিকভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত বলে মনে করেন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক। যুগান্তরকে তিনি বলেন, সংবিধানে স্পষ্ট করে বলা আছে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান চালাবেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা। বর্তমানে সিটি করপোরেশন, উপজেলা, পৌরসভাসহ স্থানীয় সরকারের অনেক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে আছেন অনির্বাচিত প্রশাসকরা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অল্প সময়ের জন্য প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া কিছুটা গ্রহণযোগ্য ছিল। কিন্তু মাসের পর মাস প্রশাসক দিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান পরিচালনা সাংবিধানিকভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত। তিনি বলেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব দেওয়া উচিত। জানা গেছে, বর্তমানে দেশে চার হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। সম্প্রতি ইসিতে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় সচিবদের সামনে উপস্থাপন করা ইসির তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০২১ ও ২০২২ সালে সাত ধাপে ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০২১ সালের ২১ জুন ২০৪টি, ২০ সেপ্টেম্বর ১৬০টি, ১১ নভেম্বর ৮৪৮টি, ২৮ নভেম্বর ১০০৭টি ও ২৩ ডিসেম্বর ৮৪০টি ইউপিতে ভোট অনুষ্ঠিত হয়। পরের বছর ২০২২ সালের ৫ জানুয়ারি ৭০৭টি, ৩১ জানুয়ারি ২১৯টি ও ৭ ফেব্রুয়ারি ১৩৮টিতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এই হিসাবে ওই সময়ে প্রথম চার ধাপে অনুষ্ঠিত ৩ হাজার ৫৯টি ইউপি নির্বাচনের সময়সীমা ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে।
ইউপি নির্বাচনের সময়সীমা ও প্রশাসক নিয়োগের বিষটি ইউনিয়ন পরিষদ আইনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। আইনের ধারা ২৯ অনুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদের সাধারণ নির্বাচনের তারিখ থেকে পরবর্তী পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগের ১৮০ দিনের মধ্যে ভোট করার নিয়ম রয়েছে। অর্থাৎ ২০২১ সালের নভেম্বরে যেসব ইউনিয়ন পরিষদে সাধারণ নির্বাচন হয়েছে, সেগুলোতে চলতি বছরের জুন থেকে নভেম্বরের মধ্যে ভোট করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সে হিসাবে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন হাজারের বেশি ইউপিতে নির্বাচন হওয়ার কথা। ওই সময়ের মধ্যে নির্বাচন না করায় আইনের এ ধারার প্রয়োগ হচ্ছে না। যদিও ইসি ১২ নভেম্বর থেকে ধাপে ধাপে ভোটগ্রহণের পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু সরকারের আপত্তিতে তা থেকে সরে এসে জানুয়ারি থেকে নির্বাচন শুরুর পরিকল্পনা করছে। নভেম্বরেই পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, কুড়িগ্রাম, বাগেরহাট, খুলনা, বরিশাল, বরগুনা, ময়মনসিংহ, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ বেশির ভাগ জেলার এক বা একাধিক উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন করার আইনি সময়সীমা শেষ হবে।
এছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও পৌরসভার জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং ওই বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর কাউন্সিলরদের অপসারণ করা হয়। একই বছরের ১৯ আগস্ট তিন শতাধিক পৌরসভার মেয়র, সব উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং সব জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানকে অপসারণ করা হয়। আইন অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের পরিষদ বাতিলের পর ১৮০ দিনের মধ্যে ভোট করার কথা। কিন্তু জাতীয় সংসদের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। এ কারণে ওই সময় এসব নির্বাচন হয়নি। ইসি সূত্র জানিয়েছে, কমিশন এই মুহূর্তে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়েই বেশি ভাবছে। অন্যান্য নির্বাচনের বিষয়ে কমিশনের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হলেও সম্ভাব্য কোনো দিনক্ষণ নির্ধারণ হয়নি।
জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ যুগান্তরকে বলেন, আইনে কোন নির্বাচন কখন করতে হবে সেই সময়সীমা উল্লেখ করে দেওয়া আছে। সেখানে আরও বলা আছে, যদি ওই সময়সীমার মধ্যে নির্বাচন করতে না পারা যায়, তাহলে যথাসম্ভব শিগগিরই নির্বাচন করতে হবে। আমরা অনেক বাস্তব কারণে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ভোট করতে পারিনি সত্যি। তবে যথাসম্ভব দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের চেষ্টা করছি। জানুয়ারিতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরু করতে যাচ্ছি। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনের সময় সম্পর্কে তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর একসঙ্গে সিটি করপোরেশন, উপজেলা ও জেলা পরিষদ এবং পৌরসভার জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করতে হয়েছে। আগে কখনো এমন পরিস্থিতি হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে আমরা পর্যায়ক্রমে সব নির্বাচন যত তাড়াতাড়ি পারি আয়োজন করব।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন না করা আইনের ব্যত্যয় বলে মনে করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি যুগান্তরকে বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কোন নির্বাচন কখন হবে তা স্ব স্ব আইনে উল্লেখ আছে। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নির্বাচন আয়োজন না করা আইনের লঙ্ঘন। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে সংসদ-সদস্যদের প্রভাব বন্ধ করতে হবে। আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে নির্বাচন আয়োজনসহ অন্যান্য কার্যক্রম স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের হাতে দিতে হবে।
মেয়াদোত্তীর্ণ ইউপিতে বসছে প্রশাসক : স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরে অন্তত এক হাজার ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এর মধ্যে সেপ্টেম্বরে মেয়াদ শেষ হয়েছে ৩৩টির। চলতি অক্টোবরে ৮১টি, নভেম্বরে ১৩৯টি এবং ডিসেম্বরে ৫১৩টি ইউপির মেয়াদ শেষ হবে। চলতি বছরের জুলাই ও আগস্টে আরও বেশকিছু ইউপির মেয়াদ শেষ হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও একাধিক জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, মেয়াদোত্তীর্ণ ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে আইন অনুযায়ী প্রশাসক নিয়োগের প্রস্তাব পাঠাচ্ছেন জেলা প্রশাসকরা। তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে কোথাও সরকারি কর্মকর্তা আবার কোথাও দলীয় নেতাকর্মীদের প্রশাসক নিয়োগ দিচ্ছে মন্ত্রণালয়।
আগস্টে বরিশালের বাকেরগঞ্জ, মুলাদী ও উজিরপুর উপজেলার মেয়াদোত্তীর্ণ ১৯টি ইউনিয়ন পরিষদে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশাসক হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সেপ্টেম্বরে বরগুনা জেলার সদর ও আমতলী উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়, যারা সরকারি কর্মকর্তা।
এছাড়া জুলাইয়ে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক হিসাবে বিএনপির নেতা মো. নূরনবী ভূঁইয়াকে নিয়োগ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের ১২ নেতানেত্রীকে পরিষদের সদস্য হিসাবে নিয়োগ দেয় স্থানীয় সরকার বিভাগ। একই ভাবে বরগুনার বেতাগী উপজেলার মোকামিয়া ও মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার বাউশিয়া ইউনিয়ন পরিষদে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।