Image description

খোদ রাজধানী ঢাকার ফুটপাতে দোর্দণ্ড প্রতাপের সঙ্গে অপতৎপরতা চালাচ্ছে ৫ শতাধিক দখলবাজ। তারা আগে যেমন ছিল, এখনো তেমন আছে। তবে সময় পরিবর্তনে বদলে গেছে তাদের ছত্রছায়া। সব মিলিয়ে আগের মতোই তারা চাঁদার টাকা তুলছে। উপরন্তু বাড়িয়েছে নিয়ন্ত্রণ এলাকাও। এদিকে ফুটপাত দখলদারদের উচ্ছেদে নিজেদের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক মো. আবদুুস সালাম। তাঁরা ইতোমধ্যে হুঁশিয়ার করেছেন, ফুটপাতের অবৈধ দখলদারদের বরদাশত করা হবে না।

অন্যদিকে রাজধানী ঢাকার ফুটপাতে দখলদারদের নিয়ে সরেজমিন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ৫ শতাধিক দখলবাজের অধিকাংশই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী ও শীর্ষ সন্ত্রাসী। ফুটপাত ভাড়া দিয়ে লাখ লাখ টাকার উৎকোচ সংগ্রহের প্রশ্নে তারা সবাই এককাট্টা। অনুসন্ধানের তথ্য বলছে, মিরপুর-১০ নম্বর হোপের গলি এবং পার্শ্ববর্তী ফুটপাতে দোকানের সংখ্যা ৭০০-৮০০। রোজ প্রতিটি দোকান থেকে ৪০০ টাকা চাঁদা এবং বৈদ্যুতিক বাতি বাবদ নেওয়া হয় ৫০ টাকা করে। এ অবৈধ আর্থিক সুবিধা মিরপুর থানার কর্মকর্তারাও পেয়ে থাকেন। মিরপুর-১০ নম্বরের আইডিয়াল স্কুল এবং সেনপাড়া পর্বতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের ফুটপাতে ৩০০-৪০০ দোকান আছে। এসব দোকান থেকে প্রতিদিন ২০০ টাকার পরও ৫০ টাকা করে বৈদ্যুতিক বাতি বাবদ নেওয়া হয়। রাড্ডার সামনে এবং ফায়ার সার্ভিসের সামনের ফুটপাতে দোকান আছে হাজারখানেক। এসব দোকান থেকে প্রতিদিন নেওয়া হয় ৩০০-৪০০ টাকা করে এবং বৈদ্যুতিক বাতির জন্য বাড়তি ৫০ টাকা। এসব চাঁদা তোলেন জামাল, হাসনাত, সুলতান, সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা ও বর্তমানে বিএনপি পরিচয়দাতা শাহাদাত ও আবু।

রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকার ফুটপাত ভাড়া দিয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা চাঁদা ওঠানো হচ্ছে। বিশেষ করে নীলক্ষেত মোড়, গাউছিয়া, চন্দ্রিমা মার্কেট, নূরজাহান মার্কেট এলাকার ফুটপাত চাঁদা ওঠানোর মূল এলাকা। একাধিক সূত্র ও ফুটপাত দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নীলক্ষেত মোড়ের নিউমার্কেটের কোনা থেকে নিউমার্কেট ৪ নম্বর গেট ফুটওভার ব্রিজ পর্যন্ত ফুটপাত ভাড়া দিচ্ছেন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি আমীর হোসেন ও হারুন হাওলাদার। এ ফুটপাতে ৩ শতাধিক দোকান রয়েছে। প্রতি দোকান থেকে প্রতিদিন ১৫০-৩০০ টাকা চাঁদা নেওয়া হচ্ছে। হকারদের কাছ থেকে টাকা তুলছেন মীজান, জহির, ইমরান নামে তিন লাইনম্যান।

ধানমন্ডি হকার্স মার্কেটের কোনা থেকে গ্লোব শপিং সেন্টার পর্যন্ত ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করছেন নিউমার্কেটের প্রভাবশালী মীজান বেপারি ও বহিষ্কৃত নিউমার্কেট থানা যুবদলের সদস্যসচিব কে এম চঞ্চল চৌধুরী।  চঞ্চলের হয়ে ফুটপাত থেকে প্রতিদিন চাঁদার টাকা তোলেন সুমন, মাহবুব ও ইখতিয়ার। গাউছিয়ার কোনা থেকে ইস্টার্ন মল্লিকা পর্যন্ত ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করছেন প্রভাবশালী মো. সাইফুল ইসলাম ও ফকির আলমগীর। রাফিন প্লাজা থেকে চাঁদনি চক পর্যন্ত বাবুল মোল্লা নিয়ন্ত্রণ করেন। নীলক্ষেত জিলানী বই মার্কেট থেকে থানা মোড় পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করেন খান মনির।

চন্দ্রিমা সুপার থেকে নায়েম গলি পর্যন্ত ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের বহিষ্কৃত পাঁচ নেতা জুলহাস মৃধা, সুমন শিকদার, প্রিন্স খন্দকার, সাগর খান ও মির্জা গোলাম রায়হানের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। নিউমার্কেটের ভিতরের ফুটপাত দখল করেও চলছে লাখ লাখ টাকার বাণিজ্য। গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, গুলশানে ফারুক ওরফে ভাগ্না ফারুক, লালন, সালাম মুন্সি, তফিকুল, খুররুম, নেহাল, কলিং মেহেদী, জিসান ও রাজু এবং বাড্ডায় আরিফ, আনোয়ার, সিরাজুল, শফিকুল, সায়হাম, জুয়েল, জীবন, ফারহান, ওমর খোইয়ান ও ফয়সাল ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করে চাঁদাবাজি করছেন। এ ছাড়া পুলিশের এক নথি থেকে জানা গেছে, ধূপখোলা বাজার ও তৎসংলগ্ন মাঠের পাশে ফুটপাতে প্রায় ১৪২টি দোকান ঘিরে চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট গড়া হয়েছে। এটি নিয়ন্ত্রণ করেন প্রভাবশালী আবদুল হাকিম এবং মামুন।

শ্যামপুর মাইক্রো স্ট্যান্ডে প্রতিটি মাইক্রোবাস বা প্রাইভেট কার থেকে দৈনিক ৮০-১০০ টাকা তোলা হয়। প্রায় ২০০-২২০টি দোকানবিশিষ্ট শ্যামপুর কাঁচাবাজারেও চলে চাঁদাবাজি। শনিরআখড়া এলাকায় আয়েশা মোশাররফ মার্কেট থেকে জাপানি বাজার পর্যন্ত ২০০-২৫০টি দোকানের চাঁদা তোলেন ওই মার্কেটেরই ম্যানেজার মোবারক হোসেন। এটি নিয়ন্ত্রণ করেন আহসান হাবিব শওকত।

শনিরআখড়া থেকে জিয়া সরণি পর্যন্ত এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করেন স্থানীয় প্রভাবশালী রিপন ও আসিফ মামুন।

সাদেক খান কৃষি মার্কেটসংলগ্ন বেড়িবাঁধে রাজেশ খান, মার্কেট ম্যানেজার ডালিম, জিল্লালসহ কয়েকজন চাঁদা তোলেন। অন্যান্য জায়গার মধ্যে যারা চাঁদার নিয়ন্ত্রক হিসেবে আছেন তারা হলেন সলিমুল্লাহ রোডের পানির ট্যাংকি এলাকায় সাজেদুল হক খান রনি, মিজানুর রহমান ইসহাক, লাইনম্যান জসিম ও সিয়াম; জাকির হোসেন রোডে লিটন মাহমুদ বাবু; চন্দ্রিমা মডেল টাউন ঈদগাহ মাঠ এলাকায় মনোয়ার হোসেন জীবন ওরফে লেদু হাসান; বছিলা গার্ডেন সিটি মূল সড়কে শামীম, মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জ্যাক জাকির, ফিরোজ, শফিক; চাঁদ উদ্যান হোসেন মার্কেটের সামনে মান্নান শাহীন,

ঢাকা উদ্যান নদীর পাড়ে মনোয়ার হোসেন জীবন ওরফে লেদু হাসান; বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের সামনে জুয়েল রাজ, মাসুম খান রাজেশ; আল্লাহ করিম মসজিদ থেকে বেড়িবাঁধ চার রাস্তা এলাকায় বাদল শরীফ, কাউসার মোল্লা, রুবেল মোল্লা; আদাবর ১০ নম্বর বালুর মাঠ এলাকায় আনোয়ার বয়াতি; সুনিবিড় হাউজিং সোসাইটি এলাকায় জালাল মাতবর। বাইতুল আমান হাউজিং এলাকায় রাকিব হোসেন বিশাল; আগারগাঁও পঙ্গু হাসপাতালের সামনে জামাল ওরফে পিচ্চি জামাল, আগারগাঁও সরকারি সংগীত কলেজের সামনে ও নতুন রাস্তার ফুটপাতে ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের মিজানুর রহমান স্বপন, শেরেবাংলা এলাকার বদিউজ্জামান বিপ্লব; ফুল মার্কেট ও কাঁচাবাজার, আগারগাঁওয়ে ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের নুরুল হক নুরু, ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের মনজুরুল কবির তমাল চাঁদাবাজিতে জড়িত; ফার্মগেট সুপার মার্কেট, সিজন পয়েন্ট, কুতুববাগ মসজিদ পর্যন্ত ফুটপাতে আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার; শিশু, পঙ্গু ও চক্ষু হাসপাতালের সামনে এবং আগারগাঁও সমবায় মাঠ এলাকায় নুরুল হক নুরু ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের আবু হানিফ; 

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালের সামনের ফুটপাতে ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের মহসিন; রামপুরা কাঁচাবাজার থেকে আবুল হোটেল পর্যন্ত ২২ নম্বর ওয়ার্ডের নিজামউদ্দিন টিপু; উলন বাজার, ডিআইটি রোড ও ওয়াপদা রোডে রামপুরা এলাকা  ইব্রাহিম খান তুষার; মগবাজার মোড় এবং নিউ ইস্কাটন, বাংলামোটর এলাকায় ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডে ফেরদৌস আহমেদ সায়মন; মগবাজার মোড়, বিশাল মার্কেট এবং ওয়্যারলেস মোডে রমনা ও হাতিরঝিলের জাফর ইমাম তরফদার মণ্ডল; মধুবাগ, নয়াটোলা চেয়ারম্যান গলি ও বউবাজার এলাকায় শ্যামল বিশ্বাস; মগবাজার ওয়্যারলেস রেলগেট ও আশপাশে আবদুর রশিদ খান ও বাবুল মিয়া; রামপুরা মূল কাঁচাবাজারে চিহ্নিত মাদক কারবারি কমল, সাদ্দামসহ কয়েকজন; রামপুরা কাঁচাবাজার আবু সাঈদ মার্কেট এবং ওয়াপদা রোডে নিজামউদ্দিন টিপু, নবাব; কারওয়ান বাজারে জনতা টাওয়ারের উত্তর পাশ, স্টেশন রোড, তেজকুনিপাড়া ও রেলগেটে খায়রুল ইসলাম সেলিম; মাছের আড়ত, কামারপট্টি, প্রণতি টাওয়ার ও পার্ক মার্কেটের আশপাশে; কামারপট্টির সামনের মাছের বাজারে জালাল মোল্লা;

স্টেশন রোডে খায়রুল ইসলাম সেলিম; তেজকুনিপাড়া কলোনির চায়ের দোকান ও ময়লার গাড়িতে মনিরুল ইসলাম সুমন; পার্ক মার্কেট, ২ নম্বর মার্কেটের উত্তর পাশ, প্রগতি ভবন ও ওয়াসা ভবনের পেছনে কাজী বাবু; সুরমা হোটেল এবং ওয়াসার পেছনে ইউসুফ হোসেন মিন্টু ওরফে ফুট মিন্টু; ডিআইটি মার্কেটের আশপাশের চায়ের দোকানে বিল্লাল হোসেন;  ট্রাক স্ট্যান্ড এবং জনতা টাওয়ারের সামনের ফলের মার্কেটে প্রভাবশালী কাজী শাহ আলম; কারওয়ান বাজারের আড়ত ও ফুটপাতে এল রহমান; এরশাদ বিল্ডিংয়ের সামনে পলাশ; কারওয়ান বাজারের ফুটপাতের ভ্যানে রাসেল ওরফে জঙ্গি রাসেল;  ডিআইটি মার্কেটের আশপাশের চায়ের দোকানে শাহিন সিকদার; প্রগতি টাওয়ারের সামনে জি এম জাহাঙ্গীর; কিচেন মার্কেট ও ২ নম্বর ডিআইটির মধ্যবর্তী ফকিরনি বাজারে তাজমুদ্দিন তাজু; পেঁপে পট্টি, এসআইবিএল ব্যাংকের কর্নারে লিটন; ফকিরনি বাজারের কর্নার, ২ নম্বর ডিআইটি মার্কেটের পশ্চিম পাশ ও জুতা পট্টিতে জিল্লাল মৃধা; বাপেক্স, কাহাফ সুপার মার্কেট, ১ নম্বর ডিআইটি মার্কেট, সোনারগাঁ হোটেলের সামনের সিএনজি ও মাইক্রো স্ট্যান্ডে মিলন ওরফে চাঁদাবাজ মিলন।

অনুসন্ধান অনুযায়ী, চাঁদাবাজিতে রাজনৈতিক ছত্রছায়া বদলেছে। মাঠপর্যায়ে টাকা তোলার কাজটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই করছে সেই একই লাইনম্যান-ম্যানেজাররা। শুধু নতুন নেতার নাম ব্যবহার হচ্ছে।

সূত্র জানায়, ফুটপাত দখলের সুযোগ করে দিয়ে এই চাঁদাবাজি নেটওয়ার্ক পরিচালনা করা হয়। তবে পুলিশ এসব দখলবাজি উচ্ছেদে প্রায়ই অভিযান চালাচ্ছে। কিন্তু ফুটপাত দখলমুক্ত করা যাচ্ছে না।

এ বিষয়ে ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন বলেন, নগরবাসীর নির্বিঘ্নে চলাচল নিশ্চিত করতে ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান অব্যাহত থাকবে।

ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আবদুুস সালাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বারবার উচ্ছেদ করার পরও ফুটপাতগুলো দখল হয়ে যাচ্ছে। কেউ নিয়ম মানতে চায় না। অথচ আমরা হলি-ডে মার্কেট ও মতিঝিল এলাকায় অফিস টাইমের পরে হকারদের বসার কথা বলেছিলাম।’ 

দখলমুক্ত করতে অ্যাপের পরামর্শ : প্রযুক্তি খাতে শীর্ষ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান মাইসফট হ্যাভেন (বিডি) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মো. মোফাখখারুল ইসলাম বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ ফুটপাত ও বাজার এলাকায় স্মার্ট সিসিটিভি বসিয়ে এআই ভিডিও অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করা যেতে পারে, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবৈধ স্থাপনা বা দখল শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্কবার্তা পাঠাবে। জিআইএস প্রযুক্তি দিয়ে প্রতিটি ফুটপাতের নির্দিষ্ট মানচিত্র তৈরি করে তা ডিজিটাল ডেটাবেসে সংরক্ষণ করা উচিত, যাতে কোথায় বৈধ/অবৈধ দখল হচ্ছে তা তাৎক্ষণিকভাবে চিহ্নিত করা যায়। একটি সহজ মোবাইল অ্যাপ বা হটলাইন চালু করা যেতে পারে, যেখানে সাধারণ মানুষ পরিচয় গোপন রেখে ফুটপাত দখল বা চাঁদাবাজির অভিযোগ জানাতে পারবে। জিপিএস লোকেশনসহ অভিযোগ সরাসরি সংশ্লিষ্ট থানা বা কন্ট্রোল রুমে চলে যাবে।’