Image description

কের দলবদ্ধ হামলা, কোথাও জমি ও ভবন দখলের চেষ্টা, আবার কোথাও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও আবাসন প্রকল্পের স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। এর আগে কুমিল্লায় মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে ১৩ বছর বয়সী স্কুলছাত্র অপ্রতিমকে হত্যার ঘটনাও জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এসব ঘটনার পাশাপাশি রাজধানীতে হত্যা, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির মামলার পরিসংখ্যানও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব ঘটনা শুধু ঢাকায় নয়। সারা দেশের চিত্র একই। দখলবাজি, চাঁদাবাজি, খুনখারাবি, ছিনতাইয়ের ঘটনা মহামারির মতো বাড়ায় নিরাপত্তা শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে নানা নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেও বলেছেন, অভিযান আরও জোরদার করা হচ্ছে।
ঢাকা মহনগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্যানুযায়ী, চলতি বছর জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত রাজধানী ঢাকায় ১৬০টি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে। এরমধ্যে জানুয়ারিতে ১৬টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৫টি, মার্চে ২২টি, এপ্রিলে ১৬টি, মে মাসে ১৮টি, জুনে ২৩টি, জুলাইয়ে ৩০টি ও আগস্টে ২টি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে। একই সময়ে ১৯৯টি ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে। ২০২৫ সালে মোট ৫২৩টি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। ২০২৩ সালে এর সংখ্যা ছিল ১৬৪টি। এছাড়া রাজধানীতে চাঁদাবাজির অভিযোগে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আট মাসে ৭২৩টি মামলা হয়েছে। ঢাকা মহানগরের ৫০টি থানার মধ্যে ৪৯টিতে এসব মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৪৮টি, ফেব্রুয়ারিতে ৪২, মার্চে ৫৮, এপ্রিলে ৭১, মে ৬৫, জুনে ৪৭, জুলাইয়ে ৪৯, আগস্টে ৬৭টি মামলা দায়ের হয়েছে। তদন্ত শেষ হওয়া মামলাগুলোর প্রায় ৮৫ শতাংশে চাঁদাবাজির অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে পুলিশ। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৪১৯টি চাঁদাবাজির মামলা দায়ের হয়।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, অপরাধীরা তখনই অপরাধের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় যখন সে অপরাধ করে সহজে পার পেয়ে যায়। প্রত্যেক অপরাধীই এখন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বেড়ে উঠছে। রাজনৈতিক কারণে তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও নীরব ভূমিকা পালন করে। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীদের সঙ্গে পুলিশ নিজেও নানা অপরাধে জড়িয়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা যেমন পাওয়া গেছে, তেমনি পুলিশি ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। থানার ওসিকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পুলিশের। কিন্তু পুলিশি দুর্বলতা যখন অপরাধীদের কাছে দৃশ্যমান হয় তখন তারা আরও বেপরোয়া হয়ে যায়। তাই পুলিশ বাহিনীকে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে হবে। না হলে ঊর্ধ্বগামী অপরাধপ্রবণতা কোথায় গিয়ে ঠেকবে আর জননিরাপত্তা একেবারে ভেঙে পড়বে।

২৬শে সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর ইসিবি চত্বরের দক্ষিণ মানিকদীতে নিউগিনি প্রোপার্টিজ আবাসন প্রকল্পে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। রাত সাড়ে ১০টা থেকে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চলা এ হামলায় পাঁচটি পিকআপে করে আসা দুর্বৃত্তরা গুলি করতে করতে প্রকল্পে প্রবেশ করে। তারা ৬-৭টি স্থাপনা ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুর করে এবং নগদ টাকা, মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন সামগ্রী লুট করে। এ ঘটনায় ১৩ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ১৫০-২০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলার ৪ নম্বর আসামি অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিনসহ এখন পর্যন্ত আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জমি নিয়ে নিউগিনি প্রোপার্টিজের মালিক নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়ার সঙ্গে গোলাম মহিউদ্দিনের দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরেই হামলা হয়েছে বলে জানা গেছে।

১৮ই সেপ্টেম্বর কুমিল্লার কোটবাড়ী থেকে নিখোঁজ হয় ১৩ বছর বয়সী স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। পরদিন লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিতে সাইফুল তাকে পরিকল্পিতভাবে জঙ্গলে নিয়ে যায়। ফোন নেয়ার সময় বাধা দিলে সাইফুল ও দুই কিশোর বাঁশের লাঠি দিয়ে তাকে আঘাত করে। পরে ফোনটি নিয়ে তারা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ২৫শে সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর মিরপুর-১-এর ৫২ বছরের পুরোনো রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে কয়েকশ’ মানুষ হামলা চালিয়ে দেশীয় অস্ত্র ও এস্কাভেটর দিয়ে ভবনটি গুঁড়িয়ে দেয়। পরে সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সাইনবোর্ড টাঙানো হয়। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ১০ কাঠা জমি দখলের উদ্দেশ্যেই হামলা চালানো হয়েছে। স্থানীয়দের বক্তব্যে বিএনপি নেত্রী ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিসহ কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১২ জন গ্রেপ্তার হলেও হামলার নির্দেশদাতা বা ইন্ধনদাতাদের গ্রেপ্তার করা হয়নি।

২৬শে সেপ্টেম্বর সকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান হাউজিং এলাকায় জমি দখলকে কেন্দ্র করে কয়েকশ’ মানুষ হামলা চালিয়ে স্থাপনা ও হাউজিং অফিস ভাঙচুর এবং নগদ টাকা লুট করে। ঘটনাটি বিট পুলিশিং অফিসের সামনেই ঘটলেও সে সময় পুলিশ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে এ ঘটনায় আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, অস্ত্রধারী ও মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান চলমান এবং তা আরও জোরদার করা হবে। চাঁদাবাজদের তালিকা করা পুলিশের নিয়মিত কাজ। এ তালিকায় সন্ত্রাসী, অস্ত্রধারী ও মাদক ব্যবসায়ীদের নামও থাকে। তালিকাগুলো নিয়মিত হালনাগাদ করা হয়। নতুন করে তালিকা করা হয়েছে এমন কিছু নয়। তবে নতুন করে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে কি না, সেটাই প্রশ্ন। সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী ও চাঁদাবাজদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এটা অব্যাহত আছে এবং আরও জোরদার করা হবে। তিনি বলেন, অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে না। আমরা যেকোনো রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে, অপরাধীকে অপরাধী হিসেবে ট্রিট করছি। মিরপুরের ঘটনায় একজন সংসদ সদস্যের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি তদন্তাধীন। তদন্তে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তিনি বলেন, অপরাধীদের কারও রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারে, কিন্তু সেটিকে আমলে নেয়া হবে না। এরইমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেন, সমাজে দখলবাজি, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, খুনসহ বিভিন্ন অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের পাশাপাশি রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় ও রাজনৈতিক পরিচয়ের অপব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সমানভাবে ও দ্রুত আইন প্রয়োগ করতে পারছে না। একইসঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে অপরাধপ্রবণ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণও যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনের সমান, কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক প্রয়োগ, আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা বাহিনীর সক্রিয়তা বৃদ্ধি, পুলিশের তথ্যসূত্রকে আরও কার্যকর করা এবং অপরাধ সংঘটনের আগেই পরিকল্পনা শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার উপর গুরুত্ব দিতে হবে।