Image description

মিরপুরে ফুটপাথের হকার উচ্ছেদকে ঘিরে তুলকালাম কাণ্ড ঘটেছে। উচ্ছেদ অভিযানে গিয়ে হকারদের অতর্কিত হামলার শিকার হয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ সদস্যরা। হকাররা লাঠিসোটা নিয়ে তাদের ধাওয়া দেয় ও ইটপাটকেল ছুড়ে। এ সময় তারা ডিএসসিসি’র একটি ময়লার গাড়িতে আগুন ও দু’টি এস্কাভেটর ভাঙচুর করে। এ ছাড়া, পুলিশের একটি গাড়ি ও ট্রাফিক বক্স ভাঙচুর করা হয়। হকারদের হামলায় বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য ও সাংবাদিক আহত হন। তাদের হামলা থেকে রেহাই পাননি পথচারীরাও। পরে পুলিশ, এসআরবি ও আনসার সদস্যরা গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

বুধবার সকাল ১১টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বরের হোপ মার্কেট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। হামলার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম। হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন তিনি। পরে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। এ ঘটনায় চারটি মামলা দায়ের প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার আবুল বাসার মোল্ল্যা। এ ছাড়া, হামলার ভিডিও ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অন্তত ৪০ জনকে আটক করেছে পুলিশ।
এদিকে, হকার উচ্ছেদ অভিযানে সংঘর্ষ এবং কয়েকটি যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সমন্বয়ের অভাব ছিল বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এ ঘটনায় তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। অপরদিকে, জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান হকারদের উপযুক্ত জায়গায় ব্যবসার ব্যবস্থা করার আহ্বান জানিয়েছেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ফুটপাথের অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ করতে যান ডিএনসিসি’র ভ্রাম্যমাণ আদালত। সঙ্গে ছিল পুলিশ। বেলা ১১টার দিকে বায়তুল কুদ্দুস জামে মসজিদ মার্কেট এলাকায় অভিযান চলাকালে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে স্থানীয় কয়েকটি দোকানে আগুন ধরে যায়। এ সময় হকাররা বিক্ষুব্ধ হয়ে ডিএনসিসি প্রশাসনের ওপর হামলা চালায়। ভাঙচুর করে ডিএনসিসি’র তিনটি গাড়ি। সিটি করপোরেশনের একটি বর্জ্যবাহী গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় তারা। তখন পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। অন্যদিকে, হকাররা ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে এবং লাঠিসোটা নিয়ে ধাওয়া দেয়। হকারদের হামলার মুখে পিছু হটে পুলিশ। হামলায় বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য ও সাংবাদিক আহত হন। এদিকে, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে ফায়ার সার্ভিস। ‎ 

ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ, সাংবাদিক ও পথচারীরা জানান, হামলার সময় গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। তারা ঘটনার ভিডিও ও ছবি তুলতে গেলে হকারদের বাধার মুখে পড়েন। আগুনে পোড়া গাড়ির ছবি তুলতে গেলে সমকালের আলোকচিত্রী মাহবুব হোসেন নবীনের ওপর হামলা চালান হকাররা। সময় টিভি’র ক্যামেরাম্যান সিফাতের ওপর হামলা চালায় ও তার ক্যামেরা ভাঙচুর করে। প্রথম আলোর আলোকচিত্রী সাজিদ হোসেনের ওপর হামলা ও ক্যামেরার ফুটেজ ডিলিট করতে বাধ্য করা হয়। একই সময়ে ঢাকা পোস্টের সাংবাদিকের ওপর লাইভে থাকা অবস্থায় হামলা করা হয়। এ ছাড়াও আরও বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে হয়রানি করা হয়। একই সময়ে ভিডিও করার সময় একাধিক পথচারীর মোবাইল ভেঙে দিয়ে মারধর করে হকাররা। হাতে মোবাইল ফোন দেখলেই তেড়ে আসেন তারা। হকাররা জানান, সকালে সিটি করপোরেশনের লোকজন ফুটপাথের দোকান উচ্ছেদ করতে আসেন। হোপ মার্কেটের সামনের ফুটপাথের দোকান উচ্ছেদ করতে গিয়ে সেখানে বিদ্যুতের তার থেকে আগুন ধরে যায়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন হকাররা। পরে সিটি করপোরেশনের কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করেন তারা।

এদিকে, দুপুর ২টার পরে ফের উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে ডিএনসিসি। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে চলে অভিযান। এ দফায় প্রায় ৫০টি দোকান উচ্ছেদ করা হয় বলে স্থানীয় সূত্র জানায়। এ সময় বিপুল সংখ্যক পুলিশ, এসআরবি ও আনসার সদস্য উপস্থিত ছিলেন। তারা পুরো এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেন। অভিযান শেষ হতে না হতেই মিরপুর-১০ নম্বরের ফলপট্টি এলাকায় ফলের ভ্রাম্যমাণ দোকান নিয়ে বসেন হকাররা। বিকাল ৪টার দিকে বেশ কয়েকটি দোকান নিয়ে বসতে দেখা যায়। ওদিকে, উচ্ছেদ অভিযানের কারণে মিরপুর-১০ ও আশপাশের এলাকায় গতকাল ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। অভিযানের কারণে ফুটপাথে দোকানপাট না থাকায় পথচারীরা নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে। ফুটপাথ ঘিরে দোকান না থাকায় সড়কেও যানজট ছিল না। উচ্ছেদের কারণে স্বস্তি প্রকাশ করেন পথচারী ও সাধারণ যাত্রীরা।

বিন্দু পরিমাণ ছাড় নয়: ডিএনসিসি প্রশাসক
হামলা ও অগ্নিকাণ্ডের পর পরই ঘটনাস্থলে যান ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। এ সময় তিনি বলেন, ডিএনসিসি’র উচ্ছেদ অভিযান চলাকালে যেসব অরাজকতা সৃষ্টিকারী, দুষ্কৃতকারী ও অবৈধ ফ্যাসিজম দখলদার সিটি করপোরেশনের পরিবহন, পুলিশ ও সাংবাদিকদের ওপর হামলা করেছে— তাদের বিন্দু পরিমাণ ছাড় দেয়া হবে না। প্রয়োজনে আমার লাশের ওপর দিয়ে হলেও নগরবাসীরকে নির্বিঘ্নে ফুটপাথে চলাচলের পথ দখলমুক্ত করা হবে। প্রশাসক বলেন, অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা এবং নগরবাসীকে নির্বিঘ্নে ফুটপাথে হাঁটা চলায় বিঘ্নিত করায় তাদের বিরুদ্ধে এবং নগরবাসীর সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন প্রতিদিন প্রতিনিয়ত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করছে। তারই অংশ হিসেবে মিরপুর-১০ এ পরিচালিত অভিযানে ফ্যাসিজমের আমল থেকে ফুটপাথ দখলকারীরা ও তাদের দোসরদের ইন্ধনে এই হামলা করা হয়েছে। পরবর্তীতে মিরপুরের সাধারণ জনগণের প্রতিরোধের মুখে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। হামলার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও পুলিশের পক্ষ থেকে পৃথক মামলা করা হবে এবং তদন্ত সাপেক্ষে তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হবে।

মামলার প্রস্তুতি, আটক ৪০: পুলিশ জানায়, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ৪টি পৃথক মামলা হতে পারে। মামলাগুলোর প্রস্তুতি চলছে। এর মধ্যে হামলা, পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর, ট্রাফিক পুলিশ বক্স ভাঙচুর এবং ডিএনসিসি’র গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় একটি করে মামলা হবে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৪০ জনকে আটক করেছে পুলিশ। ঘটনার সময় বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়। এরপর গণমাধ্যমের ভিডিও ও সিসিটিভি’র ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অভিযান শুরু করে পুলিশ। এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার আবুল বাসার মোল্ল্যা মানবজমিনকে বলেন, এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে। এখন পর্যন্ত অন্তত ৪০ জনকে আটক করেছে পুলিশ। মামলা রুজু হলে তাদেরকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হবে। অভিযান চলমান রয়েছে। জড়িতদের সকলকে গ্রেপ্তার করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।