Image description

ভোরে সেচের পাম্প চালাতে গিয়ে কৃষকের প্রথম হিসাব এখন ডিজেলের দাম। এক বিঘা জমিতে সেচ দিতে বাড়তি কত টাকা লাগবে, পাওয়ার টিলারের ভাড়া কত বাড়বে, ধান কাটার সময় কম্বাইন হারভেস্টারের খরচই বা কত দাঁড়াবে-এসব হিসাবই ঘুরপাক খাচ্ছে কৃষকের মাথায়। এর সঙ্গে ফসল বাজারে নিতে পরিবহন খরচ বাড়লে উৎপাদনের প্রতিটি ধাপেই বাড়তি টাকা গুনতে হবে। ফলে ডিজেলের লিটারে ২০ টাকা মূল্যবৃদ্ধি কৃষকের জন্য নতুন করে বড় ব্যয়ের বোঝা হয়ে উঠতে পারে।

সরকার ভর্তুকির বোঝা কমানো এবং জ্বালানি তেল পাচার ঠেকানোর প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে গত সোমবার থেকে ডিজেলের খুচরা দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করেছে। একই সঙ্গে পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দামও লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। কৃষিতে এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বিশেষভাবে পড়তে পারে। কারণ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সেচ ও কৃষিযন্ত্র পরিচালনায় এখনো ব্যাপকভাবে ডিজেল ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ক্ষুদ্র সেচসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশে কৃষিকাজে সেচের জন্য প্রায় ১২ লাখ ২০ হাজার ছোট ডিজেলচালিত পাম্প ব্যবহৃত হয়।

সরকারের সৌরসেচবিষয়ক রোডম্যাপের তথ্য অনুযায়ী, সেচের আওতাধীন কৃষিজমির অর্ধেকের বেশি এখনো ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর নির্ভরশীল। এসব পাম্পে বছরে প্রায় ১০ লাখ টন ডিজেল ব্যবহৃত হয়। এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ডিজেলের দাম বাড়ায় সম্পূরক সেচের খরচ বাড়বে। বিশেষ করে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হলে আমন ধান চাষে কৃষকদের বাড়তি ব্যয় বহন করতে হবে। শীতকালীন সবজি উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়তে পারে। এসব ফসলে সেচের পাশাপাশি বিভিন্ন কৃষিযন্ত্র পরিচালনায় ডিজেল ব্যবহৃত হয়। তিনি বলেন, শ্রমিকসংকট এবং দ্রুত ফসল কাটার প্রয়োজনীয়তায় দেশে কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার, থ্রেশার, পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টরের ব্যবহার বাড়ছে। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে এসব যন্ত্র পরিচালনার খরচ সরাসরি বাড়বে। 

যন্ত্রের মালিক ও চালকেরা বাড়তি জ্বালানি ব্যয় পুষিয়ে নিতে ভাড়াও বাড়াতে পারেন। অর্থনীতিবিদ গোলাম হাফেজ কেনেডি বলেন, আমন ধান সাধারণত বৃষ্টিনির্ভর হলেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় সম্পূরক সেচের প্রয়োজন হচ্ছে। বর্তমানে ৩০ শতাংশের বেশি ধানজমিতে কম্বাইন হারভেস্টার ব্যবহার হচ্ছে। আর প্রায় ৯৮ শতাংশ কৃষিজমি পাওয়ার টিলার বা ট্রাক্টরের মাধ্যমে চাষ করা হয়। তিনি বলেন, যান্ত্রিকভাবে ফসল কাটার ফলে প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় শ্রম ও কাটাই খরচ ৫০ শতাংশের বেশি কমে। তবে জ্বালানির দাম বাড়লে এসব যন্ত্রের পরিচালন ব্যয়ও বাড়বে। 

এতে কৃষকের সাশ্রয়ের পরিমাণ কমে যেতে পারে। বিশেষ করে ধান ও ভুট্টা চাষে এর প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। কারণ অল্প সময়ের মধ্যে ফসল কাটার প্রয়োজন হওয়ায় ওই সময়ে যন্ত্রের চাহিদা বেড়ে যায় এবং ভাড়াও বাড়ার ঝুঁকি থাকে। ভ্যালু-চেইন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ মজিবুল হক বলেন, কৃষিপণ্য পরিবহনে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহনে ব্যাপকভাবে ডিজেল ব্যবহৃত হয়। ডিজেলের দাম বাড়লে উৎপাদন এলাকা থেকে পাইকারি বাজার ও শহরে চাল, সবজি, আলু ও অন্যান্য কৃষিপণ্য পরিবহনের খরচও বাড়বে। তিনি বলেন, এর প্রভাব শুধু ফসল পরিবহনে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সার, বীজসহ কৃষি উপকরণ উৎপাদন এলাকা পর্যন্ত পৌঁছানো থেকে শুরু করে কৃষকের উৎপাদিত পণ্য বাজারে নেওয়া পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থায় বাড়তি ব্যয় তৈরি হবে। 

এর সম্মিলিত প্রভাব শেষ পর্যন্ত খাদ্যপণ্যের দামের ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে। তবে অতিরিক্ত ব্যয়ের কতটা কৃষক, যন্ত্রের মালিক, ব্যবসায়ী ও পরিবহনকারীরা বহন করবেন, তার ওপর প্রভাবের মাত্রা নির্ভর করবে। বাংলাদেশ অ্যাগ্রিকালচারাল ফার্ম লেবারার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক গোলাম সারোয়ার বলেন, কৃষি উপকরণের বাড়তি দামের কারণে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় এমনিতেই বেড়েছে। এর মধ্যে জ্বালানির দাম বাড়ায় চাপ আরও বাড়বে। উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কৃষিপণ্যের দাম না বাড়লে কৃষকের মুনাফা কমে যেতে পারে। ক্ষতি এড়াতে কৃষকদের সরাসরি নগদ সহায়তা দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

রংপুর থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, আমন চাষিরা বলছেন, অনাবৃষ্টির কারণে এবার বাড়তি সেচ দিতে হয়েছে। এর মধ্যেই দুই দফায় তেলের দাম বাড়ায় তাদের উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়েছে। নগরীর খাসবাগ এলাকার আমনচাষি আসাদুজ্জামান আফজাল জানান, তাঁর ২৪ শতক জমিতে এ পর্যন্ত চার দফা সেচ দিতে হয়েছে। প্রতি ঘণ্টায় সেচে খরচ হয়েছে প্রায় ১২০ টাকা। এখন পর্যন্ত ২২-২৫ ঘণ্টা সেচ দিতে দুই হাজার টাকার বেশি খরচ হয়েছে। তাঁর হিসাবে, প্রতি একরে বাড়তি সেচ ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৮ হাজার টাকা। জমিতে আরও দুই থেকে তিনবার সেচ দিতে হবে বলে জানান তিনি। বগুড়া থেকে বিশেষ প্রতিনিধি জানান, ডিজেলের দাম বাড়ায় সেচের পাশাপাশি জমি প্রস্তুত, ফসল কাটা, মাড়াই এবং কৃষিপণ্য পরিবহনেও ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্থানীয় কৃষকদের হিসাবে, বোরো ধান উৎপাদনের মোট খরচের প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশই সেচে ব্যয় হয়। ফলে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি উৎপাদন ব্যয়ে পড়বে। বগুড়ার কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবসায়ীরাও বলছেন, ঘাসকাটা মেশিন, পানির পাম্প, পাওয়ার টিলার ও জেনারেটরের মতো যন্ত্রপাতির বাজারেও বাড়তি ব্যয়ের চাপ আসতে পারে। হবিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, জমি চাষ, সেচ ও ধান কাটার মতো বিভিন্ন কাজে ডিজেলের ব্যবহার থাকায় দাম বাড়ার প্রভাব উৎপাদন ব্যয়ে পড়বে বলে কৃষকেরা মনে করছেন। একই সঙ্গে চলতি মৌসুমের আমন চাষেও বাড়তি ব্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। 

বানিয়াচংয়ের জ্বালানি তেল ব্যবসায়ী শাহী ইয়ার ইমন আক্কল বলেন, কৃষিতে বিপুল পরিমাণ ডিজেল প্রয়োজন হয়। দাম বাড়ায় সামনের বোরো মৌসুমে কৃষকদের বাড়তি উৎপাদন ব্যয় নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। মুন্সিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ধান, আলু, সবজি ও অন্যান্য ফসল উৎপাদনে পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর ও সেচযন্ত্রের ব্যবহার রয়েছে। জমি প্রস্তুত, সেচ, ফসল কাটা, মাড়াই এবং হাটবাজারে পণ্য পরিবহনের প্রতিটি ধাপেই জ্বালানি ব্যয় জড়িত। ফলে ডিজেলের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা।