প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনের খসড়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তা সংশোধনের পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেছেন সাংবাদিক নেতারা। অপপ্রয়োগের আশঙ্কা করে তাঁরা আইনটির খসড়া সংশোধনের মাধ্যমে গণমাধ্যমের জন্য সুরক্ষার দাবি করেন। কেননা সংবাদমাধ্যমের অনলাইন ও মাল্টিমিডিয়া আছে। সংবাদপত্রের ডিজিটাল ভার্সনের জন্যও আইনের খসড়ায় কোনো সুরক্ষাব্যবস্থা নেই। সাংবাদিক প্রতিনিধিদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রস্তাবিত খসড়া সংশোধনের লক্ষ্যে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও সাংবাদিকরা যাতে এ আইনের কারণে হয়রানির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইনি সুরক্ষার প্রস্তাব দেবে পর্যালোচনা কমিটি। কমিটিতে সম্পাদক ও সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরাও থাকবেন। কমিটি ১৫ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে সুপারিশ দেবে। তবে কমিটির সদস্যসংখ্যা ও কারা এতে থাকবেন, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
প্রধান তথ্য অফিসার সৈয়দ আবদাল আহমদ পর্যালোচনা কমিটির ফোকাল কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি সম্পাদক পরিষদ, অ্যাটকো ও সাংবাদিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে কমিটি গঠন ও বৈঠক আহ্বানের ব্যবস্থা করবেন। গতকাল সচিবালয়ে ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া পর্যালোচনায় গণমাধ্যমের অংশীজনদের নিয়ে আয়োজিত কনসালটেশন সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। ১০ সেপ্টেম্বরের পর এ আইন নিয়ে এটি ছিল দ্বিতীয় বৈঠক। খসড়া পর্যালোচনা সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, অ্যাটকোর মহাসচিব আবদুস সালাম, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. গীতি আরা নাসরীন, প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ, আমার দেশ-এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক জাহেদ চৌধুরী, আরটিবির হেড অব নিউজ ইলিয়াস হোসেন, সাবেক প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমসহ দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক, সাংবাদিক নেতা, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। আইনটির বিষয়ে দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘আমি মনে করি সংশোধন ছাড়া যদি এ আইন পাস হয়, তাহলে বাংলাদেশ বৃহৎ কারাগারে পরিণত হবে।’ ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘আইনের ড্রাফট দেখে খুবই উদ্বেগ প্রকাশ করেছি। এভাবেই যদি এ আইন হয় তাহলে মিডিয়ার ওপর বিরাট প্রতিবন্ধকতা আসবে। এমন কোনো আইন যেন সরকার না করে যাতে মিডিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে যার সংজ্ঞা নেই। যেহেতু সংজ্ঞা নেই তাই নানাভাবে প্রয়োগ হতে পারে।’
মাহফুজ আনাম প্রশ্ন রাখেন-‘মোবাইল কোর্ট কীভাবে মিডিয়ার ওপর জাজমেন্ট দিতে পারে? মোবাইল কোর্টের প্রবিশনটা অপ্রত্যাশিত। বাংলাদেশের কোনো আইনে কোনো দিন এই সাইবার সিকিউরিটি নিয়ে, মিডিয়াকে নিয়ে মোবাইল কোর্ট বিষয়টি আসেনি।’ জাতীয় প্রেস ক্লাব সভাপতি হাসান হাফিজ বলেন, ‘সাইবার সুরক্ষা আইনটা যেন হয়রানিমূলক না হয়। একই সঙ্গে বলব, সাংবাদিকদেরও দায়িত্বশীল ও পেশাগত আচরণ করতে হবে।’ অ্যাটকোর মহাসচিব আবদুস সালাম বলেন, ‘অনুসন্ধানী রিপোর্ট করলে কারও না কারও সেটি পছন্দ না-ও হতে পারে। এ নিয়ে অ্যারেস্ট করতে পারে, জেলে নিতে পারে। এটা তো হতে পারে না। তাহলে সাংবাদিকতা থাকবে না। মিডিয়ার যাঁরা কর্মী তাঁদের সুরক্ষা আগে নিশ্চিত করতে হবে।’
সরকারের বক্তব্য : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন যাতে কোনোভাবেই কোনো নিপীড়নমূলক আইনে পরিণত না হয় এবং কোনো সাংবাদিক বা গণমাধ্যম যেন এর শিকার না হন, সে বিষয়ে সরকার সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টের সংশোধন আনার লক্ষ্যে খসড়া বিলটি ইতঃপূর্বে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হয়েছিল। মন্ত্রিসভা থেকে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে যাতে সাইবার স্পেসে কর্মরত আইটি বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা ও পরামর্শ করা হয়। সেজন্য সমাজের সর্বস্তরের মতামত সংগ্রহের জন্য খসড়া বিলটি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, মানবাধিকার সংগঠন, শিক্ষার্থী এবং সাইবার স্পেসের ব্যবহারকারীরা তাঁদের মূল্যবান মতামত পাঠিয়েছেন এবং তা সরকারের পক্ষ থেকে সংকলন করা হয়েছে।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা মিডিয়াকে টার্গেট করে এ আইন করতে চাই না।
কোনো সাংবাদিক যেন এ আইনের অপপ্রয়োগের শিকার না হন, সেটিই আমাদের মূল লক্ষ্য। কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ বা গ্রেপ্তারের আগে আদালতের পূর্বানুমতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হবে।’ সভায় তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, ‘সংজ্ঞা নির্ধারণ, কল্যাণ নিশ্চিত করা, ওয়েজবোর্ডসহ সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় সরকার কাজ করছে।’ তিনি সাংবাদিকদের পেশাগত স্বীকৃতির জন্য একটি সুস্পষ্ট কাঠামো প্রণয়নের প্রস্তাব দেন। এ ক্ষেত্রে বার কাউন্সিলের মতো কোনো ব্যবস্থা করা যায় কি না, সে বিষয়ে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট পরামর্শ আহ্বান করেন তিনি।