খুনোখুনি, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদকব্যবসা, আধিপত্য বিস্তার, দখল ও সংঘাতের মতো এমন কোনো অপরাধ নেই যেখানে কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা মিলছে না। যার পরিপ্রেক্ষিতে কোনো ঘটনা ঘটলেই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা গ্রেপ্তার হচ্ছে। কিন্তু তাদের পেছনে থাকা মূল হোতা ও পৃষ্ঠপোষকরা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। এসব পৃষ্ঠপোষকই গ্যাংয়ে নতুন সদস্য ভিড়িয়ে আরও সহিংস রূপে আবর্তিত হচ্ছেন। কোনো গ্যাং সদস্য গ্রেপ্তার হলে তাকে কারাগারে বিশেষ সুবিধা প্রদান ও
জামিনের ব্যবস্থা করছেন পৃষ্ঠপোষকরা। আর এসব কারণেই ভয়ংকর থেকে ভয়ংকরতম হয়ে উঠছে পাড়ামহল্লার কিশোর গ্যাং সদস্যরা। কেউ কেউ উঠতি বয়সের ক্রেজ ও হিরোইজম দেখাতে গিয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসীর ছায়াতলে সন্ত্রাসী হয়ে উঠছে। কিন্তু অপ্রাপ্ত বয়স্কের সুযোগে এই কিশোররাই এখন শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ট্রাম্পকার্ড। অন্যদিকে রাজনৈতিক শক্তির আধিপত্য বিস্তারও এই কিশোর গ্যাংনির্ভর হয়ে উঠছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সারা দেশেই কিশোর গ্যাং এখন মহামারির মতো হয়ে উঠেছে। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রাজধানীর ৫০ থানা এলাকায় সক্রিয় ১৫৮টি কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকের সংখ্যা শতাধিক। এ অবস্থায় পুলিশের বিশেষ অভিযানের পাশাপাশি পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনা জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, কুমিল্লায় কিশোর অপ্রতিম হত্যার পরে সংশ্লিষ্ট সব ইউনিটের কাছেই আপডেট তালিকা চেয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনা দিয়েছিল পুলিশ সদরদপ্তর। পরে রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়া, কন্টেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, মোহাম্মদপুরের দখলবাজির ঘটনাকে কেন্দ্র করে শনিবার পুলিশ সদরদপ্তর থেকে পুনরায় কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে ঢাকাসহ সারা দেশে একযোগে সাঁড়াশি অভিযান অঘোষিতভাবে শুরু হয়েছে। আগামী বুধবারের পর এ অভিযান আরও জোরদার হতে পারে বলে জানা গেছে।
পুলিশের এক কর্মকর্তা জনিয়েছেন, বিভিন্ন গ্যাংয়ে জড়িত ১০-১৫ বছর বয়সি কিশোরদের আটক করে মুচলেকায় পরিবারের জিম্মায় দিতে বলা হয়েছে। তবে দ্বিতীয়বার আর ছাড় দেওয়া হবে না বলে অভিভাবকদের কঠোর বার্তা দিতে বলেছে। কারণ নিজের সন্তানকে বাবা-মা শাসনে না রাখলে অপরাধ দমন করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে যাবে।
ঢাকাতেই সক্রিয় শতাধিক পৃষ্ঠপোষক : একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রাজধানীর ৫০ থানা এলাকায় সক্রিয় ১৫৮টি কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকের সংখ্যা শতাধিক। যাদের মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতা, শীর্ষ সন্ত্রাসী, মোহাম্মদপুর ও মিরপুরকেন্দ্রিক হাউজিং কোম্পানি এবং পদহীন প্রভাবশালীরা রয়েছেন। কোনো অপরাধ হলে অল্প বয়সি কিশোররা গ্রেপ্তার হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে যাচ্ছেন তাদের পৃষ্ঠপোষকরা। আবার অনেকে পট-পরিবর্তনের পর বিদেশে পালিয়ে গেলে বা রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার হলেও তাদের গ্যাং এলাকায় ঠিকই দাপিয়ে বেড়ায়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিরপুরের পিয়াস গ্রুপের পৃষ্ঠপোষক ১১ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহ মোহাম্মদ কিবরিয়া ওরফে পিয়াস ও মো. আমিরুল ইসলাম। কাফরুলের ভাই ব্রাদার গ্রুপের হোতা মানিক হাসান রকি। পটেটো রুবেল গ্রুপের হোতা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দারুস সালাম থানার সাংগঠনিক সম্পাদক সাজেদুর রহমান রাসেল এবং অতুল গ্রুপের পৃষ্ঠপোষক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সহসভাপতি সাইদুর রহমান বাপ্পী ও সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার তাহেরের ভাই মো. রায়হান। এ ছাড়া হাকিম গ্রুপের পৃষ্ঠপোষক উজ্জ্বল, পল্লবীর আশিক গ্রুপের হোতা বিদেশে পলাতক মফিজুর রহমান মামুন ও রাজু গ্রুপের হোতা নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের পল্লবী থানার সাংগঠনিক সম্পাদক মিলন ঢালি। রকি গ্রুপের পৃষ্ঠপোষক ৯১ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের কর্মী ফারুক হোসেন ও পিন্টু-কাল্লু গ্রুপের হোতা মহানগর উত্তর যুবলীগের সদস্য সুলতান।
রোমান্টিক গ্রুপের হোতা বিহারি ক্যাম্পের জালাল উদ্দিন বন্টু ও ভাই ভাই গ্রুপের হোতা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৫ নম্বর ওয়ার্ড সেক্রেটারি খলিলুর রহমান। এ ছাড়া, মুরাদ গ্রুপের পৃষ্টপোষক কাজী জহিরুল ইসলাম, আরমার গ্রুপের যুবলীগকর্মী সাইফুল ও সোহেল গ্রুপের হোতা নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. নাইম। এদিকে, শাহআলীর মামুন গ্রুপের হোতা স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা তোফাজ্জল হোসেন সেন্টু, রুবেল গ্রুপের হোতা যুবলীগের সোহেল রানা ও রূপনগর আবাসিক এলাকার লিমন। কাইল্লা সাগর গ্রুপের হোতা কাউসার মোল্লা ও মোহাম্মদপুরের পাটালী গ্রুপের পৃষ্টপোষক মো. জহিরুল ইসলাম অপু ও ওসমান রেজা। এ ছাড়া ঠেলা গ্রুপ ও লেভেল হাই গ্রুপের হোতা শীর্ষ সন্ত্রাসী বিদেশে পলাতক কিলার বাদল। আনোয়ার গ্রুপের পৃষ্টপোষক এক্সেল বাবু, টক্কর গ্রুপ ও ফরহাদ গ্রুপের হোতা মান্নান শাহীন।
আর্মি আলমগীর ও নবী গ্রুপের হোতা শীর্ষ সন্ত্রাসী মো. নবী, ডাইল্লা গ্রুপের মো. শাকিল, এলক্স গ্রুপের পাপ্পু ও আকবর গ্রুপের আলী কাওছার মিন্টু। এ ছাড়া গাংচিল গ্রুপের হোতা লম্বু মোশারফ, আশরাফ গ্রুপের গ্যারেজ সোহেল ও স্টার বন্ড গ্রুপের হোতা মো. খোকন। ভাইব্বা ল কিং গ্রুপের হোতা মো. কবির, চেতাইলেই ভেজাল গ্রুপের লিটন মাহমুদ বাবু ও ঘুটা দে গ্রুপের পৃষ্টপোষক নবোদয় হাউজিংয়ের মো. কবির। এদিকে, শেরেবাংলা নগরের জাকির গ্রুপের পৃষ্টপোষক মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি মো. আসাদুজ্জামান এবং হাতিরঝিলের বাঁধন ও পলক গ্রুপের হোতা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ২২ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি গোলাম রসুলের ছেলে শেখ ওমর ওরফে পলক।
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের সিয়াম-সিরাজ গ্রুপের পৃষ্টপোষক বাদল ও আল-আমিন, রতন গ্রুপের মোহাম্মদ মানিক মিয়া ও মোহাম্মদ মোশারফ। তুরাগের পাভেজ গ্রুপের পৃষ্টপোষক যুবলীগকর্মী ইমরান হোসেন ও উত্তরখানের নাইন এমএম বিগ বস গ্রুপের মহিন। এ ছাড়া শাকিল গ্রুপের আসলাম জনি ও রুস্তম গ্রুপের হোতা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের উত্তরখান থানার সাধারণ সম্পাদক মো. জয়নাল আবেদীন। দক্ষিণখানের বিগবস গ্রুপের হোতা আক্তারুজ্জামান ওরফে ছোটন ও ইয়ং স্টার গ্রুপের হাসিবুল হাসান শান্ত। এ ছাড়া ব্লাড বয়েজ গ্রুপের পৃষ্টপোশক নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের উত্তরা পূর্ব থানা সভাপতি নুরুল আফসার ও শাওন গ্রুপের মো. শাওন ওরফে রাশেদুল ইসলাম।
স্টার গ্রুপের পৃষ্টপোষক নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের উত্তরা পশ্চিম থানার সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক জুয়েল ও ভাটারার রবিন গ্রুপের হোতা সাবেক কাউন্সিলর মো. শফিকুল ইসলাম বাছেদ। এ ছাড়া বনানীর বাউন্ডারি বস্তি কিশোর গ্যাং গ্রুপ ও পোড়া বস্তি গ্যাংয়ের পৃষ্টপোষক নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ২০ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সভাপতি তুহিন। এদিকে, কদমতলীর শুক্কুর গ্রুপের পৃষ্টপোষক নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক নেতা নীরব ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের আজিজ মিয়া। লিটন গ্রুপের পৃষ্টপোষক শ্রমিক লীগের সাইফুল ইসলাম বাবু, যাত্রাবাড়ীর ফাহিম গ্রুপের মো. মুশফিকুর রহমান, ডেমরার তুহিন গ্যাং গ্রুপের বাঁশেরপুলের ইসমাইল ভূঁইয়া তুহিন ও শিমু বাহিনীর জিকু বক্স।
এ ছাড়া গেন্ডারিয়ার তাহমিদ গ্রুপের পৃষ্টপোষক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৪৫ নম্বর ওয়ার্ড সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম ও খিলগাঁওয়ের মাফিয়া আলিফ গ্রুপের মো. জিয়া ও এম জামান। এদিকে, রামপুরার আকিল গ্রুপের হোতা যুবলীগের মনির চৌধুরী, শাহজাহানপুরের আরিফ গ্রুপের মিতু ও জাহিদ। হাজারীবাগের পারভেজ ও সাব্বির গ্রুপের হোতা মো. মিঠু এবং আসিফ গ্রুপের মো. মহিদুল খান। এ ছাড়া পারফেক্ট গ্যাং স্টার গ্রুপের ফুরাদ হোসেন ও জীবন গ্রুপের হোতা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সারোয়ার হোসেন। লালবাগের রবিন গ্রুপের পৃষ্টপোশক নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের থানা সভাপতি মো. সুমন এবং চকবাজারের পাত্তি গ্রুপের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন মো. বিপ্লব।
সারা দেশেই আরও কঠোর হবে অভিযান : পুলিশ সদরদপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মো. সায়েদুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সারা দেশে কিশোর গ্যাং ও পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ঢাকা ছাড়া অন্য মহানগর ও জেলায় সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিচয়ধারী পৃষ্ঠপোষকদের তালিকা ধরে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন ঢাকায় ৪০০-৫০০ অপরাধী গ্রেপ্তার হচ্ছে। এদের মধ্যে কে কিশোর আর কে প্রাপ্তবয়স্ক তা দেখা হয় না। অপরাধ করলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।
সাবেক আইজিপি বাহারুল আলম বাংলাদেশ প্রতিদিন বলেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধরপাকড়ে অপরাধ কমানো সম্ভব না। আমাদের দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে মাত্র ৭-৮ শতাংশের বিচার হয়। কিশোর অপরাধীদের সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো হলেও সেই সংখ্যাও বেশি নয়। আইন অনুযায়ী কিশোর অপরাধী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিচার নিশ্চিত করতে পারলে অপরাধ কমে যাবে।