নাফ নদ পেরিয়ে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা আসছেই। সেই মাদক যাচ্ছে সারা দেশে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইয়াবা পাঠানোর রুটে এসেছে বড় পরিবর্তন। আগে কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত থেকে নানা কায়দায় মহাসড়ক দিয়ে মাদকটি রাজধানীতে আসত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাদক কারবারিদের কৌশল বুঝে ফেলায় কারবারিরাও পাল্টা কৌশল নিয়েছে, মাদক পাচারের রুটে পরিবর্তন এনেছে। মাদকের বাহকও পাল্টেছে, নতুন মুখ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যাদের নিয়োগ করা হয়েছে, তাদের বেশিরভাগই রোহিঙ্গা তরুণ। এতে চালান ধরতে হিমশিম খেতে হচ্ছে মাদক প্রতিরোধে দায়িত্বরত সংস্থাগুলোকে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনিসি) ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে টেকনাফ থেকে সারা দেশে ইয়াবা ছড়িয়ে দেওয়ার রুটে বড় ধরনের ভিন্নতা এসেছে। পাচারকারীরা এখন মহাসড়ক এবং মূল সড়কগুলো এড়িয়ে গ্রামীণ সড়ক দিয়ে ইয়াবা বহন করেছে। মাদক বহনে যুক্ত হয়েছে রেলপথ ও নৌপথ। অনেক চালান টেকনাফে স্থল সীমান্তে না এসে নাফ নদীতে নৌকায় হাতবদল হচ্ছে। এসব ইয়াবা চলে যাচ্ছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে। চাহিদা থাকলে ওই অঞ্চল থেকে ফের আসছে ঢাকায়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সূত্রগুলো বলছে, আগে মূলত টেকনাফ থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলাচলকারী দূরপাল্লার বাসে বা প্রাইভেটকারে ইয়াবা পাচার হতো। তবে সেই বাহন বাদ দিয়ে এখন বেশিরভাগ সময়ে মোটরসাইকেলে পাহাড়ি ও স্থানীয় সড়ক ধরে পাচার হচ্ছে। যাত্রীবাহী ট্রেনে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে এই ইয়াবা।
কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তকে ইয়াবা প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে সাম্প্রতিক কিছু অভিযানের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেখতে পায়, সীমান্ত পার হওয়ার পর এসব চালান আর নির্দিষ্ট কোনো একটি পথ ধরে যাচ্ছে না। পরিস্থিতি ও সুযোগ বুঝে কারবারিরা চালান ভাগ করে কখনো কক্সবাজারের দিকে, আবার কখনো বান্দরবানের পাহাড়ি ও স্থানীয় পথ ধরে দেশের ভেতরে পাঠিয়ে দিচ্ছে।
পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা কালবেলাকে জানিয়েছেন, সীমান্ত পেরিয়ে কক্সবাজার ও বান্দরবানে ঢোকার পর ইয়াবার চালান বিভিন্ন পাহাড়ি ও স্থানীয় সড়ক ধরে শুরুতে চট্টগ্রামের দিকে যায়। কক্সবাজার থেকে চকরিয়া হয়ে বাঁশখালী, আবার নাইক্ষ্যংছড়ি-বান্দরবান হয়ে চট্টগ্রামে ঢোকার একাধিক রুটও রয়েছে। চট্টগ্রামে পৌঁছানোর পর এসব চালান আবার ছড়িয়ে দেওয়া হয়। সড়কপথে ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায় পাঠানোর পাশাপাশি ফেনী-কুমিল্লা হয়ে ঢাকার দিকেও নেওয়া হচ্ছে ইয়াবার চালান। ফলে সীমান্ত থেকে কক্সবাজার ও বান্দরবান, সেখান থেকে চট্টগ্রাম এবং এরপর ফেনী-কুমিল্লা হয়ে রাজধানী পর্যন্ত তৈরি হয়েছে ইয়াবা পাচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থলরুট।
ডিএনসির চট্টগ্রাম কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক রামেশ্বর দাস কালবেলাকে বলেন, এসব স্থল রুটের কোনো একটি অংশে বাধা তৈরি হলে কারবারিরা অন্য সংযোগপথ ব্যবহার করতে পারে। সীমান্ত থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত পাহাড়ি ও স্থানীয় সড়ক, চট্টগ্রাম থেকে ফেনী-কুমিল্লা হয়ে ঢাকার মূল সড়ক এবং আশপাশের জেলাগুলোর আঞ্চলিক পথ মিলিয়ে ইয়াবা পাচারের তৈরি হয়েছে একাধিক রুট।
তিনি বলেন, স্থল রুটের বাইরে কক্সবাজার থেকে সরাসরি রেল ও নৌপথও ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে রুটগুলো চিহ্নিত হওয়ায় পাচারকারীরা এখন আর সহজে তা পাচার করতে পারবে না। এসব নতুন রুটে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
মোটরসাইকেলে পাহাড়ি ও স্থানীয় পথে বড় চালান পাহাড়ি ও স্থানীয় সড়ককে শুধু ছোট চালান সরানোর পথ হিসেবে ব্যবহার করছে না কারবারিরা; এসব পথে মোটরসাইকেলে বড় চালানও পরিবহন করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযানের তথ্যেও এর প্রমাণ মিলেছে। গত জুলাইয়ে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে কক্সবাজার থেকে দুটি মোটরসাইকেলে করে চট্টগ্রাম নগরের দিকে যাওয়ার সময় ৯ হাজার ৮১০ পিস ইয়াবাসহ দুজনকে আটক করে র্যাব-৭। বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, বাঁশখালীর তৈলারদ্বীপ সেতু এলাকায় অস্থায়ী চেকপোস্ট বসিয়ে মোটরসাইকেল দুটিতে তল্লাশি চালানো হয়। এ সময় ৫০টি পলিজিপার প্যাকেটে রাখা ইয়াবাগুলো উদ্ধার করা হয়। দুটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়।
এর আগে বাঁশখালীতে একটি মোটরসাইকেলের ফুয়েল ট্যাংকের পাশে বিশেষ কৌশলে লুকানো ৭ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করে পুলিশ। একইভাবে রামুতেও মোটরসাইকেলের তেলের ট্যাংকির ভেতর বিশেষভাবে লুকানো ৪০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার হয়।
ডিএনসির কর্মকর্তারা বলছেন, এসব মোটরসাইকেল চালকের বড় অংশই কিশোর ও তরুণ। তাদের মধ্যে রোহিঙ্গা তরুণদের সংখ্যা বেশি। সীমান্তবর্তী এলাকার স্থানীয় ও পাহাড়ি পথ সম্পর্কে ধারণা এবং দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলে যাওয়ার সুযোগ থাকায় কারবারিরা এই শ্রেণির তরুণদের পাচার কাজে ব্যবহার করছে। মোটরসাইকেলের মাধ্যমে চালান বহনের ক্ষেত্রে চালকদের বয়স কম হওয়ায় সাধারণ যানবাহনের তুলনায় তাদের চলাচল অনেক সময় নজর এড়িয়ে যায়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, কারবারিদের কাছে মোটরসাইকেলের আরেকটি সুবিধা হলো, মূল সড়কে তল্লাশি বা নজরদারি থাকলে আশপাশের স্থানীয় সড়ক, গ্রামীণ পথ কিংবা পাহাড়ি সংযোগপথে ঢুকে পড়া যায়। কক্সবাজার ও বান্দরবান থেকে চট্টগ্রামের দিকে যাওয়ার পথে এমন একাধিক বিকল্প সংযোগপথ রয়েছে। ফলে একটি পথে বাধা থাকলেও কাছাকাছি অন্য পথ ধরে চালান সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে।
নৌ ও রেলপথেও ইয়াবার চালান স্থলপথের পাশাপাশি লঞ্চ ও মাছ ধরার ট্রলার ও পণ্যবাহী ছোট জাহাজেও ইয়াবার চালান যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকা থেকে লঞ্চ ও জাহাজে করে এসব চালান প্রথমে ভোলার দিকে নেওয়া হচ্ছে। পরে ভোলা থেকে বরিশালে নিয়ে সেখান থেকে সড়কপথে চাহিদা অনুযায়ী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হচ্ছে। কক্সবাজারের উপকূল থেকে ভোলা, এরপর বরিশাল হয়ে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে যাচ্ছে ইয়াবার চালান। সমুদ্র ও নৌপথে বিপুলসংখ্যক লঞ্চ ও জাহাজ চলাচল করায় প্রতিটি নৌযানে তল্লাশি চালানো সম্ভব হয় না। এ সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে কারবারিরা।
কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী যাত্রীবাহী ট্রেনও ইয়াবা পরিবহনে ব্যবহার করা হচ্ছে। গত বছরের মার্চে ঢাকার বিমানবন্দর রেলস্টেশনে কক্সবাজার এক্সপ্রেসের একটি বগি থেকে ৩৩ হাজার ৫০০ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ট্রেনে বিপুলসংখ্যক যাত্রী ও লাগেজ থাকায় সব যাত্রী ও ব্যাগে নিয়মিত তল্লাশি চালানো কঠিন। এ সুযোগে ইয়াবা বহন করছে কারবারিরা। ধরা এড়াতে ইয়াবা এক জায়গায় রেখে বাহক অন্য জায়গায় বসে থাকার ঘটনাও পাওয়া গেছে।
পাচারের নতুন রুট ঠেকাতে ১১ স্থায়ী তল্লাশি চৌকির প্রস্তাব পুলিশের: মিয়ানমার সীমান্ত পেরিয়ে ইয়াবা ঢোকার পর সেটি যেন পাহাড়ি পথ, পুরোনো সড়ক কিংবা বিকল্প যোগাযোগপথ ব্যবহার করে দেশের ভেতরে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সে জন্য সীমান্ত থেকে শহর পর্যন্ত নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ। কক্সবাজার ও বান্দরবানের গুরুত্বপূর্ণ ১১টি স্থানে স্থায়ী তল্লাশি চৌকি বসানোর প্রস্তাব করেছে চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশ। সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো ওই প্রস্তাবে এসব চৌকিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর (এআই) মুখ শনাক্তকারী ক্যামেরা, সিসিটিভি ক্যামেরা, মাদক শনাক্তকারী ডগ স্কোয়াড এবং গাড়ি ও লাগেজ স্ক্যানার রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তল্লাশি চৌকি পরিচালনার জন্য ৩২১ জন পুলিশ সদস্য এবং যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোর জন্য প্রায় ১৩ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে নাফ নদ, সমুদ্রপথ ও সীমান্ত-সংলগ্ন বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে ইয়াবা প্রবেশ করে। এরপর কক্সবাজারের উখিয়া, টেকনাফ ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িকে গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এ ছাড়া পুলিশের প্রস্তাবে মূল সড়কের সঙ্গে পাহাড়ি ও পুরোনো সড়কগুলোর সংযোগস্থলকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কক্সবাজারের রামু, সদর, উখিয়া ও চকরিয়ার সাতটি এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির চারটি স্থানকে তল্লাশি চৌকির জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। এসব স্থানের মধ্যে রয়েছে রামুর রাংকুট বৌদ্ধবিহার ও পনেরো ছড়া ফরেস্ট অফিস, কক্সবাজারের ভাঙ্গার মোড়, চৌফলদণ্ডী লোহার সেতু ও রেলস্টেশন, উখিয়ার কোর্ট বাজার সড়ক এবং চকরিয়ার হারবাং সড়ক। নাইক্ষ্যংছড়িতে প্রস্তাব করা হয়েছে বেইলি সেতু, সোনাইছড়ি চৌরাস্তার মোড়, বাইশারী পেটান আলীপাড়া মোড় এবং রামুর গর্জনিয়ার ডাকবাংলো মোড়।
পুলিশের প্রস্তাবে পুরোনো সড়কগুলোকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। উখিয়ার পনেরো ছড়া ফরেস্ট অফিস-কাটিয়ার মাথা এলাকাকে টেকনাফ ও উখিয়া থেকে পুরোনো সড়ক ব্যবহার করে কক্সবাজারে মাদক আনার সম্ভাব্য রুট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে ৩৩ সদস্যের একটি তল্লাশি চৌকি বসানোর প্রস্তাব রয়েছে। একইভাবে রামুর রাংকুট বৌদ্ধবিহার এলাকায় মরিচ্যা চেকপোস্ট থেকে বিভক্ত সড়ক এবং পার্বত্য এলাকা থেকে আসা মাদক ঠেকানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। গর্জনিয়ার ডাকবাংলো মোড়কেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়েছে, কারণ এটি বনাঞ্চলঘেরা দুর্গম পাহাড়ি এলাকার চার রাস্তার সংযোগস্থল।
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িকেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে পুলিশ। সীমান্ত-সংলগ্ন পাহাড়ি ছোট রাস্তা দিয়ে মাদক আসার আশঙ্কায় বেইলি সেতু, সোনাইছড়ি ইউনিয়নের চৌরাস্তার মোড় ও বাইশারী পেটান আলীপাড়া মোড়ে স্থায়ী তল্লাশি চৌকি বসানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রতিটি চৌকিতে ৩৩ জন করে পুলিশ সদস্য রাখার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে বাইশারী পেটান আলীপাড়া মোড় নাইক্ষ্যংছড়ি থানা থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে। পাহাড়ি এ সংযোগস্থল এবং সোনাইছড়ির চার রাস্তার মোড়কে ব্যবহার করে মাদক পরিবহনের পথ বন্ধ করতে চায় পুলিশ।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. নাজিমুল হক কালবেলাকে বলেন, ইয়াবা পাচারের নতুন রুটগুলো চিহ্নিত করে সেখানে তল্লাশি চৌকি বসাতে পুলিশ সদর দপ্তরে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। নতুন স্পটগুলোয় স্থায়ী চেকপোস্ট বসানো হলে পাচার অনেকটাই ঠেকানো সম্ভব হবে। তবে মাদক ঠেকাতে পুলিশসহ অন্যান্য সংস্থা এখনো বসে নেই।