Image description

আরিফ নিয়াজী নামের এক ব্যক্তিকে ২০১২ সালে রাজধানীর গুলশানে নিজ বাসা থেকে ভুয়া পরোয়ানায় গ্রেফতার করে আদালতে পাঠায় পুলিশ। এ নিয়ে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) জনস্বার্থে হাইকোর্টে রিট করে। শুনানি শেষে ২০১৩ সালের ৩০ জানুয়ারি হাইকোর্ট রুল জারি করেন। দীর্ঘদিন রিটটি হাইকোর্টের বিভিন্ন বেঞ্চে শুনানির জন্য তালিকায় ছিল। একটি বেঞ্চে তদন্ত প্রতিবেদনও দাখিল হয়। ১৪ সেপ্টেম্বর সেই রুল নিষ্পত্তি করে হয়রানি বন্ধে পুলিশ অফিসারকে সেন্ট্রাল ডেটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম থেকে গ্রেফতারি পরোয়ানার সত্যতা যাচাই করার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে পুলিশের আইজিকে এই মর্মে সার্কুলার জারি করতে বলেন আদালত। হাইকোর্টে রিটটি নিষ্পত্তি হতে ১৩ বছর লেগেছে। আইনজীবীরা বলেছেন, শুধু এ রিট নয়, এমন বহু রিট উচ্চ আদালতে দীর্ঘদিন অপেক্ষমাণ। এই রিটের রিটকারী জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ যুগান্তরকে বলেন, বেঞ্চ পরিবর্তন হওয়া, তদন্ত প্রতিবেদন চাওয়া, আদালতের ছুটি, করোনাকালীন-সবকিছু মিলিয়ে এ সময় পার হয়েছে। এখন রায় বাস্তবায়নের অপেক্ষায় আছি।

এদিকে উচ্চ আদালতে জনস্বার্থে করা রিটের রায় ও আদেশ মাঠপর্যায়ে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সংবিধানে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষায় রিট একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হলেও কার্যকারিতার ক্ষেত্রে প্রায়ই স্থবিরতা দেখা যায়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনাগ্রহ ও উদাসীনতায় অধিকাংশ রায় উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে। অন্যদিকে, কোনো কোনো আইনজীবী মনে করেন, অনেক রিটে রুল জারি না হওয়ার অন্যতম কারণ রিট করার পেছনে রিটকারীর প্রচার-পরিচিতি পাওয়ার বিষয় জড়িত থাকা। এছাড়া তথ্য গোপন ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে রিট করা হয়। এমন বেশ কয়েকজন আইনজীবী রয়েছেন, যাদের অপ্রাসঙ্গিক রিট করার কারণে জরিমানা গুনতে হয়েছে। এমন বহু নজিরও আছে হাইকোর্টে। সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে হাইকোর্টে ৭ লাখের মতো মামলা বিচারাধীন। এর উল্লেখযোগ্য অংশ উচ্চ আদালতে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকা ‘রিট’। এর মধ্যে গত ৬ মাসে ১১ হাজার ৮০৩টি রিট নিষ্পত্তি হয়েছে। সুপ্রিমকোর্টের গণসংযোগ কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে চলতি বছরে নতুন রিটের তুলনায় নিষ্পত্তির হার বেড়েছে। বিচারিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা গেলে এবং ব্যক্তিস্বার্থ বা ব্যক্তিগত বিরোধের রিট বন্ধ হলে মামলার চাপ আরও কমে আসবে। তবে আদালতের রায় ও আদেশ বাস্তবায়ন জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

অপেক্ষায় ১ লাখ ২৪ হাজার ৯৯৯টি রিট : সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে রিট হয়েছে ১৫ হাজার ২৫৭টি, ২০২০ সালে ১০ হাজার ৪৫৮টি এবং ২০২১ সালে ১৩ হাজার ৩৪০টি। ২০২৫ সালে বিচারাধীন ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার ৪১২টি। আর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন-ছয় মাসে ৮ হাজার ৮৪১টি রিট দায়ের হয়েছে। বর্তমানে বিচারাধীন ১ লাখ ২৪ হাজার ৯৯৯টি রিট।

আদেশ বাস্তবায়নে কর্তৃপক্ষের তৎপরতা সন্তোষজনক নয় : রায় বাস্তবায়নের বিষয়ে মনজিল মোরসেদ বলেন, জনস্বার্থে মামলার রায় বাস্তবায়ন এখনো চলমান। অবৈধ ইটভাটা বন্ধ বা উচ্ছেদ নিয়ে উচ্চ আদালত কয়েক দফা নির্দেশনা দেন। কিন্তু আদেশ বাস্তবায়নে কর্তৃপক্ষের তৎপরতা সন্তোষজনক নয়। অবৈধ ইটভাটা এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এ বিষয়ে আমরা আদালতে সম্পূরক আবেদন করব। রায় বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগে রায় বা আদেশ বাস্তবায়ন না হলে বিষয়টি আদালতের নজরে আনা হতো। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তলব করে আদালত রায় বাস্তবায়নে সময়সীমা বেঁধে দিতেন।

উপেক্ষিত আদালতের নির্দেশ : এইচআরপিবি, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), চিলড্রেন চ্যারিটি ফাউন্ডেশন ছাড়াও বিক্ষিপ্তভাবে কিছু সংগঠন জনস্বার্থে রিট করছে। উল্লেখযোগ্য রিটগুলো হলো-ঢাকায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, জিরো পয়েন্ট থেকে সদরঘাট পর্যন্ত রাস্তায় অবৈধ দখল বন্ধ করে বিচারক ও আইনজীবীসহ বিচারপ্রার্থী মানুষের যাতায়াত সহজ করা, পাহাড় কাটা, জলাশয় ভরাট রোধ, কক্সবাজার ও কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত অবৈধ দখলমুক্ত করা, নদী-খাল উদ্ধার, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রক্ষা, বুড়িগঙ্গাসহ দেশের বৃহত্তর চার নদী রক্ষা, লালবাগ কেল্লাসহ ঐতিহ্যবাহী প্রত্নতত্ত্ব স্থাপনা সংরক্ষণ, অবৈধ ইটভাটা ধ্বংস ও অর্থ পাচারকারীদের তালিকা চেয়ে নির্দেশনা এবং সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলবিষয়ক।

রায় বাস্তবায়ন হয়নি : ঢাকার পার্শ্ববর্তী বিপন্ন চার নদী বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা রক্ষায় সীমানা চিহ্নিত করে পিলার স্থাপন, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, নদী খনন ও পলি অপসারণ এবং নদীর তীরে গাছ লাগানোর নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। ২০০৯ সালে ওই রায়ের পর এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। শব্দদূষণ রোধে করা এক রিটের রায়ে সারা দেশে গাড়িতে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার বন্ধের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। কিন্তু তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। যানজট ও ধুলাবালির এই ঢাকা শহরে গৃহস্থালির বর্জ্য অপসারণ ও পরিবহণের সময় পথচারীরা দুর্ভোগে পড়েন। তাই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট নির্দেশনা দেন। কিন্তু ঢাকার দুই সিটি তা এখনো বাস্তবায়ন করতে পারেনি।

নির্বাহী ও বিচারিক সব কর্তৃপক্ষকে আপিল বিভাগের সতর্ক : সর্বোচ্চ আদালতের উভয় বিভাগের রায় ও আদেশের পুরোপুরি বাস্তবায়ন নিশ্চিতে ভবিষ্যতে নির্বাহী ও বিচারিক এবং সব কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকতে হবে বলে এক রায়ে উল্লেখ করেন আপিল বিভাগ। ২০২৪ সালের ২৩ এপ্রিল এক পূর্ণাঙ্গ রায়ে আপিল বিভাগ বলেছেন, ‘আমরা দৃঢ়ভাবে সতর্ক করে দিচ্ছি যে, ভবিষ্যতে শুধু বর্তমান অবমাননার-বিবাদীরা (সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব ও কারা মহাপরিদর্শক) নয়, নির্বাহী ও বিচারিক এবং প্রজাতন্ত্রের সব কর্তৃপক্ষকে সুপ্রিমকোর্টের উভয় বিভাগের রায় বা আদেশের পুরোপুরি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে সতর্ক থাকতে হবে।’

ইউনুছ আলী আকন্দকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা : সরকার ঘোষিত ‘লকডাউনের’ বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট করার পর শুনানিতে অংশ না নেওয়ায় সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেন হাইকোর্ট। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ইউনুছ আলী আকন্দ শনিবার যুগান্তরকে জানান, তিনি ২০১২ সাল থেকে এ পর্যন্ত জনস্বার্থে তিন শতাধিক রিট করেন। বেশির ভাগ রিট ‘নট প্লেস’ (উত্থাপিত হয়নি) হয়েছে। কিছু রিট দায়েরের পর এখনো আপিল ও হাইকোর্টে শুনানির জন্য পেন্ডিং রয়েছে।