Image description

বাংলাদেশে ছোট আকারে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বসাতে আগ্রহী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। দুই দেশই প্রাথমিকভাবে ৩০০ থেকে ১ হাজার মেগাওয়াটের স্মল মডিউলার রিঅ্যাক্টর (এসএমআর) বসাতে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আলাপ-আলোচনা করছে। এ নিয়ে এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ৫ বছর মেয়াদি একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জ্যাকব হেলবার্গ চুক্তিতে সই করেন। অন্যদিকে চীনের একটি প্রতিনিধিদল সম্ভাব্য স্থান হিসাবে জামালপুরের মাদারগঞ্জ পরিদর্শন করেছে। তবে এলাকাটি অত্যন্ত জনবসতিপূর্ণ হওয়ায় সেটি এসএমআরের জন্য উপযুক্ত নয় বলে জানায় পিডিবি।

এ বিষয়ে পিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম শনিবার যুগান্তরকে বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত এসএমআর প্রযুক্তিতে ৯০০ থেকে ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র বসাতে সরকার আগ্রহী। কিন্তু এসএমআর বা ছোট পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্পর্শকাতর। যেখানে-সেখানে বসানো যাবে না। সব প্রযুক্তি গ্রহণও করা যাবে না। তাই দেখে শুনে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

দেশের রূপপুরে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বসানো হয়েছে। রাশিয়ার রোসাটম প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে এই কেন্দ্র বসিয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর কথা ছিল। কিন্তু এখনো রূপপুর থেকে নানা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়নি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এখনো অনেকটা সাশ্রয়ী পরমাণু প্রযুক্তির বিদ্যুৎ। কিন্তু সমস্যা হলো, নিরাপত্তা। বিশেষ করে, অতি ঘনবসতিপূর্ণ দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বসানো সহজ নয়। তবে দেশে ব্যাপক বিদ্যুতের চাহিদা দেখে সম্প্রতি সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এসএমআর বসানোর ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা চালাতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে বিশ্বে এসএমআর এখন একটি ভালো প্রযুক্তি।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকে যা আছে : প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব আনোয়ার হোসেন গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে যান। সেখানে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সই করেন তারা। পাঁচ পাতার ওই স্মারকে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নিয়ম মেনে কেবল শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উন্নয়নে এই চুক্তি করা হচ্ছে। ১৯৮১ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির ধারাবাহিকতায় এই সমঝোতা। চুক্তির আওতায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ, প্রযুক্তি, জনবল প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তাসহ সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশকে সহায়তা দেবে যুক্তরাষ্ট্র।

স্মারকে বলা হয়, দুদেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের কৌশল, নিরাপত্তা ও যৌথ রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরালো করা হবে। বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ, প্রযুক্তি, জনবলকে প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন কর্মসূচিতে সহায়তা দেবে যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া বাংলাদেশে পরমাণু শক্তি উন্নয়ন, নিরাপত্তাসহ সব বিষয়ে সহযোগিতা করা হবে। এই সমঝোতায় কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক বা স্থানীয় আইনের বাধ্যবাধকতা থাকবে না। কোনো জিজ্ঞাসা থাকলে দুপক্ষ নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে সমাধান করে নেবে। সমঝোতার মেয়াদ থাকবে ৫ বছর। এরপর কোনো পক্ষ বাতিল না করলে আরও ৫ বছরের মেয়াদ থাকতে পারে।

এর আগে ২৬ আগস্ট ওয়াশিংটনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রীর বৈঠক হয়। সেখানেও পারমাণবিক প্রযুক্তি ও জ্বালানি খাতে যৌথভাবে কাজের আগ্রহ প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্র।

সংশ্লিষ্টরা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের জিই এবং ভারনোভা হিটাচি কোম্পানি যৌথভাবে কানাডার অন্টারিওতে ৩০০ মেগাওয়াটের একটি এসএমআর বসাচ্ছে। বাংলাদেশ ওই জিই-র মাধ্যমেই এসএমআর বসাতে আগ্রহী।

চীনের আগ্রহ : বাংলাদেশে এসএমআর বসাতে আগ্রহ দেখিয়েছে চীনের চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিএনইই) এবং স্টেট নিউক্লিয়ার পাওয়ার টেকনোলজি করপোরেশন লিমিটেড। গত সপ্তাহে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং পিডিবির কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে চীনের প্রতিনিধিদল। পরদিন পিডিবির একটি দলসহ তারা জামালপুরের মাদারগঞ্জে স্থান পরিদর্শনে যায়। তবে এলাকাটি অত্যন্ত জনবসতিপূর্ণ হওয়ায় সেটি এসএমআরের জন্য উপযুক্ত নয় বলে জানায় পিডিবি। বিকল্প হিসাবে তাদের পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী এলাকা পরিদর্শনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বৈঠকে পিডিবি সিএনইই-র কাছে জানতে চায়, চীন বা অন্য কোনো দেশে তাদের এসএমআর বসানোর অভিজ্ঞতা আছে কিনা। এর কোনো সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। সিএনইই জানায়, তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান স্টেট নিউক্লিয়ার পাওয়ার টেকনোলজি এসএমআর প্রযুক্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম এবং প্রথমটি তারা বাংলাদেশেই বসাতে চায়। জবাবে পিডিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পূর্ব-অভিজ্ঞতা না থাকলে বাংলাদেশকে ‘গিনিপিগ’ হিসাবে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। বাংলাদেশ সর্বাধুনিক চতুর্থ প্রজন্মের এসএমআর বসানোর পক্ষে। আইএইএর তথ্য অনুযায়ী, ভূমিতে পানিভিত্তিক এসএমআর বসানো যায়; তবে চতুর্থ প্রজন্মের প্রযুক্তি ব্যবহার করলে অনেক কম পানিতেই কেন্দ্র স্থাপন সম্ভব।

সিএনইই বাংলাদেশে বিনা দরপত্রে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) বসাতেও আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট ও দেশীয় সামিটের টার্মিনালের চেয়ে প্রতিদিনের চার্জ দ্বিগুণ দাবি করায় তাদের এই প্রস্তাব নিয়ে খোদ পেট্রোবাংলাতেই প্রশ্ন উঠেছে।