Image description

পর্যটন অর্থনীতিতে দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের অপার সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই চূড়ান্ত হচ্ছে ‘সমন্বিত জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনা।’ ইতিমধ্যে দেড় হাজার পর্যটন আকর্ষণকে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেসব স্পট ঘিরে দেশীয় পর্যটন অর্থনীতির বড় স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা হবে। এজন্য জিডিপিতে পর্যটন খাতের বর্তমান অবদান ২-৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬-৭ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পর্যটন খাতে তথ্য-উপাত্তের ঘাটতি নির্ধারণে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) আওতায় ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট তৈরির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পর্যটন নিশ্চিত করতে জাতীয় পর্যটন নীতিমালা ২০২৬ প্রণয়নের কাজও চলমান রয়েছে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত সম্প্রতি জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, প্রায় ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন কেন্দ্র চিহ্নিত করে সমন্বিত পর্যটন মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। এসব পর্যটন আকর্ষণের ধরন, অবস্থান, সম্ভাবনা, অবকাঠামো, বিনিয়োগের সুযোগ ও উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে। মহাপরিকল্পনা প্রণয়নে যুক্ত প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে, প্রায় দেড় হাজার পর্যটন স্পটকে আটটি অঞ্চলে  ভাগ করে পর্যটন গুচ্ছ, বিভিন্ন ধরনের পর্যটন পণ্য ও বিনিয়োগ প্রকল্পের প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। ১৪টি পর্যটনভিত্তিক বিষয়ের অধীনে ২০০টিরও বেশি প্রকল্প, সেই সঙ্গে পাঁচটি বিশেষ গুরুত্বের প্রকল্প চিহ্নিত করা হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘সমন্বিত জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনা’র লক্ষ্য শুধু কোনো পর্যটনকেন্দ্রে রাস্তা বা স্থাপনা তৈরি নয়, একটি অঞ্চলের বিভিন্ন আকর্ষণকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে পর্যটকের জন্য পূর্ণাঙ্গ ভ্রমণপথ তৈরি করা। ভিন্ন ভিন্ন পর্যটন সম্পদকে বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে আনা হবে। পর্যটনমন্ত্রীর ভাষ্যমতে, সুন্দরবন, কক্সবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় ও হ্রদ, সিলেটের চা-বাগান, নদী-জলাভূমি এবং প্রত্নতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পর্যটন সম্ভাবনাকে মহাপরিকল্পনার নেটওয়ার্কে যুক্ত করা হবে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন সচিব ফাহমিদা আখতার জানিয়েছেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই ‘সমন্বিত জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনা’ হালনাগাদের কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব। এর আলোকেই স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রমের মাধ্যমে পর্যটন খাতের উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘জিডিপিতে পর্যটন খাতের বর্তমান ২ থেকে ৩ শতাংশ অবদান বাড়িয়ে ৬ থেকে ৭ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।’

পর্যটন খাতের প্রকৃত অবদান ও সম্ভাবনা নিরূপণে স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট তৈরির কাজ চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান, দেশি-বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা, ইনবাউন্ড ও আউটবাউন্ড পর্যটন, পর্যটকদের পছন্দের গন্তব্যসহ খাতটির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে।’

 বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের (বিটিবি) উদ্যোগে গত ২০১৯ সালে পর্যটন খাতের মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু হলেও চূড়ান্ত ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছিল দীর্ঘসূত্রতা। কোভিড-১৯ মহামারি, প্রশাসনিক জটিলতা আর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের প্রভাবে কার্যক্রম থমকে যায়। গেল বছরে মহাপরিকল্পনাটি পুনর্মূল্যায়নের জন্য পর্যটন বোর্ডে ফেরত পাঠানোর ঘটনাও ঘটেছিল। স্থবির হয়ে যাওয়া দীর্ঘ সেই প্রক্রিয়ায় নতুন গতি সঞ্চার করেছে নতুন সরকার।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের (বিটিবি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, চলতি বছরের মধ্যেই মহাপরিকল্পনাটি চূড়ান্ত হবে। সরকার হচ্ছে একটি পরিবার। এই পরিবারে পর্যটন মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়েই সমন্বিতভাবে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা হবে। পাশাপাশি জাতীয় পর্যটন নীতিমালা প্রণয়নের কাজও শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বিদেশি কূটনীতিকদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রভাবশালী ব্লগার, ইনফ্লুয়েন্সার ও সাংবাদিকদের যুক্ত করে বাংলাদেশকে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। দেশের পর্যটন সম্পদ ও ভাবমূর্তি তুলে ধরতে বিদেশে আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলা ও বিভিন্ন আয়োজনে অংশ নেওয়া হচ্ছে।

পর্যটনসংশ্লিষ্ট কর্মীদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বিমানবন্দরে বিদেশি পর্যটকদের সঙ্গে প্রথম যোগাযোগকারী ইমিগ্রেশন পুলিশের সদস্যদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের আতিথেয়তার ঐতিহ্য পর্যটকদের কাছে বাস্তবে তুলে ধরাই এসব উদ্যোগের লক্ষ্য বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামান বলেন, ‘দেশের চিহ্নিত পর্যটন সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগিয়ে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকার প্রাক্কলিত ব্যয়ে ৬০টি উন্নয়ন প্রকল্প অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়নের জন্য বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। দেশের পর্যটন খাতকে আধুনিক, টেকসই ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে এবং এর সামগ্রিক বিকাশ ঘটাতে এই প্রকল্পগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’

পর্যটনখাতের কর্মকর্তারা বলছেন, পর্যটন মহাপরিকল্পনার বড় প্রশ্ন হচ্ছে পরিবেশ। পর্যটনকেন্দ্র উন্নয়নের নামে অতিরিক্ত স্থাপনা, অপরিকল্পিত হোটেল, বর্জ্য, যানজট এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি অভিযোগ উঠে আসে। যে কারণে সরকার এবার পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পর্যটনের ওপর জোর দিচ্ছে। এক্ষেত্রে ‘স্থানীয় জনগোষ্ঠীভিত্তিক পর্যটন’ মডেল নিয়ে কাজ করছে সরকার। ফলে পর্যটনকেন্দ্রের অর্থনৈতিক সুবিধা শুধু বাইরের বিনিয়োগকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না স্থানীয় মানুষ আবাসন, খাবার, নৌযান, পরিবহন, গাইড, কারুশিল্প, কৃষিপণ্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেও আয় করতে পারবেন। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকায় পর্যটনকে স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করে ঢাকার বাইরে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাই সরকারের লক্ষ্য।

বিটিবির তথ্যমতে, ২০৪১ সাল পর্যন্ত পর্যটনের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিদেশি পর্যটক নিয়ে আসার লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৫০ লাখ ৫০ হাজার। কর্মসংস্থানের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ২ কোটি ২০ লাখ মানুষের। এর মধ্যে ২০৩০ সাল অবধি ধরা হয়েছে ৭২ লাখ ৮৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান। তাছাড়া মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে পাঁচটি প্রকল্পের মধ্যে যে ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন সম্পদ চিহ্নিত হয়েছে, বিভাগভিত্তিক আঞ্চলিক এই পরিকল্পনায় কর্মসংস্থান মূল লক্ষ্য ধরা হয়েছে। মহাপরিকল্পনার অধীনে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। তবে পরিবেশবান্ধব হিসেবে কক্সবাজারের পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় পরিবেশের ওপর চাপ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, মহাপরিকল্পনায় তা সবচেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে।

অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব)-এর সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম আরেফ বলেন, ‘পর্যটন খাতের উন্নয়ন কেবল উন্নত রাস্তাঘাট বা তারকা চিহ্নিত হোটেল তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি বহুমাত্রিক সেবাব্যবস্থা। অবকাঠামো ঘাটতির পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তা,পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং আধুনিক পর্যটন তথ্যের অপ্রতুলতা আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে অন-অ্যারাইভাল ও সহজ ভিসা সুবিধা এবং কার্যকর বৈশ্বিক বিপণন প্রচারণার কোনো বিকল্প নেই।

তার মতে, সরকারি আগ্রহ,  নীতি সহায়তা,  অবকাঠামোগত ও সেবামূলক সব উপাদান যখন একসঙ্গে কাজ করবে, তখনই বাংলাদেশ বৈশ্বিক পর্যটন মানচিত্রে শক্ত অবস্থান তৈরি করবে।