Image description

রাজধানীর চারপাশের নদীগুলো বাঁচাতে দুই যুগের বেশি সময় ধরে চলছে নানা উদ্যোগ। দখল উচ্ছেদ, ড্রেজিং, তীর রক্ষা, ট্যানারি স্থানান্তর, সৌন্দর্যবর্ধন—নদী রক্ষায় বাদ যায়নি কিছুই।

ব্যয় হয়েছে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। কিন্তু নদীতে বর্জ্য পড়া বন্ধ হয়নি। বরং নতুন নতুন দূষণমুখের সন্ধান মিলছে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীতে ৪২৪টি বর্জ্য নির্গমনমুখ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৩৩০ টন তরল ও কঠিন বর্জ্য নদীতে পড়ছে।
 
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডাব্লিউটিএ) জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

নতুন জরিপে শুধু বুড়িগঙ্গা নদীর ৩০৭ দূষণমুখ চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব দূষণমুখ বন্ধে বর্তমান সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আজ বিশ্ব নদী দিবস পালিত হচ্ছে।

প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসের চতুর্থ রবিবার নদী দিবস পালিত হয়। দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য—‘নো ফরেস্টস, নো রিভারস, নো ওয়াটার, নো লাইফ’।

দিবসটি উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলো বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সকাল ১০টায় রাজধানীর পানি ভবনে ‘গঙ্গার অববাহিকায় অন্তর্ভুক্তিমূলক পানি ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক বিশেষ সেমিনার আয়োজন করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাজধানীর চারপাশের নদীগুলো দুষণ ও দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে।

প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে নদীতে বর্জ্য নির্গমনের উৎসমুখগুলো চিহ্নিত করা হয়। প্রথম জরিপে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীতে ৪২৪টি বর্জ্য নির্গমনমুখ শনাক্ত করে বিআইডাব্লিউটিএ। এসব উৎসমুখ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৩৩০ টন তরল ও কঠিন বর্জ্য নদীতে পড়ছে। সংস্থাটির সর্বশেষ জরিপে শুধু বুড়িগঙ্গায় শনাক্ত উৎসমুখের সংখ্যা ৩০৭।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান হাওলাদার কালের কণ্ঠকে বলেন, অভিযান, জরিমানা বা কারখানা বন্ধ করে তাৎক্ষণিকভাবে দূষণ কমানো সম্ভব হলেও দীর্ঘ মেয়াদে সুফল পেতে দূষণের উৎস চিহ্নিত করে তা বন্ধ করা দরকার।

বিআইডাব্লিউটিএর জরিপে দেখা গেছে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সরকারি সংস্থাগুলোও এই দূষণে জড়িত। ঢাকা ওয়াসার ৬৬টি ড্রেন বুড়িগঙ্গায় ৫৭টি ও তুরাগে ৯টি স্থানে বর্জ্য ফেলছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২১টি ড্রেনের মধ্যে ১৯টি বুড়িগঙ্গায় এবং দুটি শীতলক্ষ্যায় যুক্ত। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৬টির একটি বুড়িগঙ্গায় এবং ১৫টি তুরাগে গিয়ে পড়েছে।

বিআইডাব্লিউটিএর তথ্য অনুযায়ী, নদীতে পড়া বর্জ্যের প্রায় ৬০ শতাংশ শিল্পবর্জ্য। ঢাকার চারপাশে নদীর তীরে ছোট-বড় প্রায় সাত হাজার শিল্প-কারখানা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বড় একটি অংশে কার্যকর তরল বর্জ্য পরিশোধনাগার বা ইটিপি নেই। ফলে শিল্প-কারখানার রাসায়নিক, রং, ভারী ধাতু, তেল ও অন্যান্য বিষাক্ত তরল বর্জ্য খাল, ড্রেন হয়ে সরাসরি নদীতে যাচ্ছে।

এদিকে নৌবাহিনীর এক প্রতিবেদনে বুড়িগঙ্গাকে ‘অত্যন্ত সংকটাপন্ন’, তুরাগকে ‘সংকটাপন্ন’ এবং ধলেশ্বরীকে ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বুড়িগঙ্গা-তুরাগে দূষণের ৮০ শতাংশের জন্য শিল্প ও জৈব বর্জ্যকে দায়ী করা হয়েছে।

অক্সিজেন নেমেছে বিপজ্জনক মাত্রায় : নদীর পানির দূষণের সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র পাওয়া যায় দ্রবীভূত অক্সিজেন বা ডিওতে। জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য পরিবেশগতভাবে গ্রহণযোগ্য ডিও সাধারণত পাঁচ মিলিগ্রাম ওপরে থাকা প্রয়োজন। কিন্তু
নৌবাহিনীর প্রতিবেদনে বুড়িগঙ্গায় দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা গড়ে ১.৭ থেকে ২.৬৮ মিলিগ্রাম।

এ বিষয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকোয়াকালচার বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী কালের কণ্ঠকে জানান, বুড়িগঙ্গার পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পাশাপাশি ক্যাডমিয়াম ও পারদের মতো ভারী ধাতু পাওয়া গেছে। মাছ বেঁচে থাকার মতো পরিবেশও অনেক জায়গায় নেই। উদ্ভিদসহ বহু জলজ প্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে এবং অস্তিত্ব সংকটে আছে।

এবার উৎসমুখ বন্ধে জোর : নতুন সরকার আসার পর নদী দূষণ বন্ধে বর্জ্যের উৎসমুখ বন্ধ করার বিষয়টি মূল লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ৬ আগস্ট ঢাকার চারপাশের নদীর পানি ও পরিবেশ উন্নয়ন নিয়ে বৈঠকের পর সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রথম ধাপে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের ৩৮ কিলোমিটার নৌপথকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নদীর তীর ও আশপাশের সব দূষণমুখ চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে সেগুলো বন্ধ করা হবে। নৌবাহিনী, পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এ কাজে যুক্ত রয়েছে। শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমইএসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানে ইটিপি নেই, তাদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ইটিপি স্থাপনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

নদী কমিশন সূত্র জানায়, ঢাকার চারপাশের নদী দখল ও দূষণ রোধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে ৩৭ সদস্যের কেন্দ্রীয় সেল গঠন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে গঠিত এই সেলে পরিবেশ, নৌপরিবহন, স্থানীয় সরকার, পানি উন্নয়ন বোর্ড, রাজউক, বিআইডাব্লিউটিএ, ঢাকা ওয়াসা, পুলিশ, কোস্ট গার্ড, নদী রক্ষা কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিরা রয়েছেন। সেলের অধীনে তিনটি উপকমিটি কাজ করবে। এর একটি শিল্পবর্জ্যসহ বিভিন্ন উৎস থেকে নদীতে বর্জ্য প্রবেশ বন্ধ, খাল ও ড্রেন থেকে বর্জ্য অপসারণ, নদীর তলদেশের কঠিন বর্জ্য সরানো এবং পানিপ্রবাহ বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করবে।

এ বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, নদীগুলোকে দূষণমুক্ত করতে প্রথমে দূষণের উৎসগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে। এসব উৎস বন্ধে শুধু নদী পরিষ্কার করলেই হবে না, নদীতে যাতে নতুন করে দূষিত বর্জ্য প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়েও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

বর্জ্যের বিনিময়ে বাজার চালু : বুড়িগঙ্গার দূষণ রোধে এবং সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে এবার ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে ডিএসসিসি ও বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন। বুড়িগঙ্গায় শুরু হয়েছে ‘বর্জ্যের বিনিময়ে ভাসমান বাজার’ কার্যক্রম। এর মাধ্যমে নদী থেকে ক্ষতিকর বর্জ্য কুড়িয়ে জমা দিলেই মিলবে চাল, ডাল, তেল, লবণসহ নিত্যপণ্য।

গত ১৯ সেপ্টেম্বর রাজধানীর সোয়ারীঘাট লঞ্চঘাটে এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম। তিনি বলেন, ‘অবৈধ দখল ও যত্রতত্র বর্জ্য ফেলার কারণে বুড়িগঙ্গার অস্তিত্ব আজ বিপন্ন। এই নদীকে বাঁচাতে না পারলে আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, শুধু নদী পরিষ্কার করলে হবে না; রাজধানীর খালগুলো পুনরুদ্ধার করে সেগুলোকে নদীর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে এবং পয়োবর্জ্য শোধনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।