Image description

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার অজুহাতে নিত্যপণ্যের বাজারে যেন ‘আগুন’। প্রায় সব পণ্যের দাম লাগামহীন। যে যেভাবে পারছেন দাম বাড়াচ্ছেন। স্বেচ্ছাচার অবস্থা। বাজারে এক ধরনের ‘লুটপাট’ চলছে বললেও ভুল বলা হবে না। যুগান্তরের কাছে এমন সব ক্ষোভের কথা জানিয়েছেন রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে আসা ক্রেতাদের অনেকে। তারা বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে পরিবহণ ব্যয় যতটা বেড়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি হারে বাড়ানো হচ্ছে পণ্যের দাম। বাড়তি খরচের এমন বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে ভোক্তার ঘাড়ে। অথচ যথাযথভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণের সব দায় ও দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির চার দিন পার হলেও বাজার এখনো নিয়ন্ত্রণহীন। বাস্তবে তদারকি সংস্থার কোনো প্রতিফলন নেই।

প্রসঙ্গত, গত ২০ সেপ্টেম্বর ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়, যা কার্যকর করা হয় ২১ সেপ্টেম্বর থেকে। এর আগে গত ১৯ এপ্রিল ও পহেলা জুন তেলের দাম বাড়ানো হয়। কিন্তু প্রতিবারই জ্বালানি তেলের দাম যে হারে বেড়েছে, তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি বাড়ে বাজারদর। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আজ (শুক্রবার) ছুটির দিন সপ্তাহের বাজার করবেন অনেকে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সাপ্তাহিক বাজার করতে এসে নির্ঘাত অনেকে ক্ষুব্ধ হবেন। যার দায় পড়বে সরকারের ওপর। ফলে সরকারের উচিত হবে, কোনো মধ্যস্বত্বভোগী যেন সরকারের উপায়হীন এসব সিদ্ধান্তকে পুঁজি করে এভাবে ভোক্তার পকেট কাটতে না পারে। সেজন্য পর্যাপ্ত জনবল বাড়িয়ে সমন্বিতভাবে বাজার মনিটরিং আরও কার্যকর করতে হবে।

বৃহস্পতিবার সরেজমিন রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি পণ্যে বেশি দাম হাঁকা হচ্ছে। যার সঙ্গে পাইকারি বাজার থেকে অনেক তফাত। কেস স্টাডি হিসাবে কয়েকটি পণ্যের উদাহরণ তুলে ধরা হলো।

চালের দাম কেজিতে বাড়ল ৩ টাকা : বৃহস্পতিবার দুপুরে কাওরান বাজারে আল্লাহর দান রাইস এজেন্সির মালিক ও পাইকারি আড়তদার সিদ্দিকুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, তেলের দাম বাড়ার পর বগুড়া থেকে একটি ট্রাক কাওরান বাজারে আনতে ১৬ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে, যা আগে ১৪ হাজার টাকা ছিল। প্রতি ট্রাকে ৩০০ বস্তা (৫০ কেজির বস্তা) চাল আনা যায়। ট্রাকপ্রতি ২ হাজার টাকা বাড়ায় ৫০ কেজির বস্তায় দাম বেড়েছে ১০ টাকা। কিন্তু খুচরা বিক্রেতারা এ অজুহাত কাজে লাগিয়ে মোটা চালের দাম কেজিতে ৩ টাকা বাড়িয়ে বিক্রি করছেন। কিন্তু সেখানে কোনো অভিযান নেই। কোনো সংস্থা তাদের কিছু বলছে না।

বেগুন বেড়েছে ২০ টাকা : বুধবার রাত পৌনে ১টার দিকে যশোরে সাতমাইল বারিনগর বাজার থেকে রাজধানীর পাইকারি আড়ত কাওরান বাজারে ট্রাকে করে ৬৫ মন বা ২ হাজার ৪০০ কেজি বেগুন নিয়ে এসেছেন সবজি ব্যাপারী মো. ইকবাল করিম ভূঁইয়া। যশোরে কৃষক পর্যায় থেকে প্রতিকেজি বেগুন সর্বোচ্চ ৭০ টাকা দিয়ে কিনেছেন এই ব্যাপারী। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির আগে একটি মাঝারি আকারের ট্রাক ভাড়া ছিল ১৮ হাজার টাকা। তেলের দাম বাড়ার পর ট্রাকপ্রতি ৩ হাজার টাকা ভাড়া বেড়েছে। বুধবার গুনতে হয়েছে ২১ হাজার টাকা, যা পণ্যের দামে যোগ হয়েছে। কেজি হিসাবে প্রতিকেজি বেগুনে বাড়তি ১ টাকা ২৫ পয়সা মূল্য বেড়েছে। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাজধানীর কাওরান বাজারের পাইকারি আড়ত হয়ে এই বেগুন খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হয়েছে কেজিপ্রতি ১২০ টাকায়, যা তেলের মূল্যবৃদ্ধির আগে ১০০ টাকা ছিল। সেক্ষেত্রে কেজিতে ১ টাকা ২৫ পয়সা বাড়লেও তেলের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে খুচরায় কেজিতে ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে।

গরিবের পাঙাশ মাছেও থাবা : বৃহস্পতিবার রাতে যাত্রাবাড়ী মাছের আড়তে কুমিল্লা থেকে ট্রাকে করে ৪৭ মন পাঙাশ মাছ নিয়ে আসেন ব্যাপারী মো. শাকিল। তিনি যুগান্তরকে বলেন, তেলের দাম বাড়ার পর ট্রাকপ্রতি ১৮ হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে, যা আগে ১৬ হাজার টাকা ছিল। সেক্ষেত্রে বাড়তি ভাড়া গুনতে গিয়ে কেজিপ্রতি পাঙাশে প্রায় ২ টাকা দাম বেড়েছে। কিন্তু খুচরা বাজারে বেড়েছে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত। তিনি বলেন, খুচরা বিক্রেতারা তেলের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে এভাবে ক্রেতার পকেট কাটছে। কিন্তু সব দোষ হচ্ছে ব্যাপারীদের।

বাজার তদারকির হালচাল : বাজারে পণ্যমূল্য সহনীয় ও যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে কাজ করছে সরকারের পাঁচটি সংস্থা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেল, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, খাদ্য অধিপ্তরের তদারকি সেল, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর এবং সিটি করপোরেশন। এসব সংস্থাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মাঠ প্রশাসন সহায়তা দিয়ে থাকে। সংস্থাগুলোর দাবি-শুধু জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর নয়, বছরের পুরোটা সময় বিভিন্ন আঙ্গিকে তারা রাজধানীসহ সারা দেশে বাজার তদারকি চলমান রেখেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রব্যমূল্যসংক্রান্ত টাস্কফোর্সের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেল প্রতিদিন রাজধানীর মহানগরীতে তাদের দুটি টিম দিয়ে অভিযান পরিচালনা করে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর এই চার দিনে তারা তাদের অভিযান আরও কঠোরভাবে পরিচালনা করছেন।

পাশাপাশি কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এম এম আরিফ পাশা যুগান্তরকে জানান, সপ্তাহের প্রতিদিন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বাজারে তদারকি করা হচ্ছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর বাজারে পণ্যের দাম বাড়ায় তদারকি আরও জোরদার করা হয়েছে।

এদিকে সম্প্রতি রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সাংবাদিকদের বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ ও মূল্য স্থিতিশীল রাখতে বাজার নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে নজরদারি ও মনিটরিং কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে। আমদানিকারকদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করে পণ্যের মজুত, আমদানি ও সরবরাহ পরিস্থিতিও পর্যালোচনা করা হবে। ক্রেতাকে ঠকালেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ প্রসঙ্গে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, এই তদারকি চলমান থাকলেও বাজারে পণ্যের দাম কমছে না। কারণ একাধিক সংস্থা নানাভাবে বাজার তদারকি করলেও তাদের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। তাই বিভিন্ন অজুহাত কাজে লাগিয়ে অসাধু চক্র কারসাজির ছক তৈরি করছে। সিন্ডিকেট করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে পকেট কাটা যাচ্ছে ভোক্তার।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শক্তভাবে বাজারের লাগাম টানতে তেমন কোনো মনিটরিং ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। কারণ দেখা গেছে ঢাকায় বাস করা ২ কোটি মানুষের জন্য ভোক্তা অধিদপ্তরের মাত্র ৬টি টিম কাজ করছে। এই অল্পসংখ্যক কর্মকর্তা দিয়ে ভোক্তার অধিকার সংরক্ষণ করা কখনোই সম্ভব নয়। তাই ভোক্তাকে স্বস্তিতে রাখতে সরকারকে ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজাতে হবে।

উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস)’ সাবেক মহাপরিচালক ড. এম কে মুজেরী যুগান্তরকে বলেন, এমনিতে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের জীবন বিধ্বস্ত; অনেকের আয় নেই। বেকারত্ব বাড়ছে। আবার আয় বাড়ছে না বেশির ভাগ মানুষের। এ অবস্থায় নতুন করে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধাক্কা লেগেছে। বাজারে যেহারে দাম বাড়ার কথা তার চেয়েও বেশি দামে ক্রেতার পণ্য কিনতে হচ্ছে। সরকারের একাধিক সংস্থা বাজার তদারকি করলেও তাদের কাছে কোনো গবেষণাও নেই। তাই ভোক্তারা সরকারের বাজার মনিটরিংয়ে কোনো সুফল পাচ্ছেন না।

বৃহস্পতিবার জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ২০ সেপ্টেম্বর জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৪ দিনে অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সারা দেশে ১৬৩টি টিম, ৩১১টি প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম পাওয়ায় ৩৩ লাখ ৭৮ হাজার টাকা জরিমানা করে। অধিদপ্তর সূত্র আরও জানায়, অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা সরাসরি রাজধানীসহ সারা দেশে অভিযান পরিচালনা করছেন। এর মধ্যে রাজধানীতে অধিদপ্তরের ৬টি টিম কাজ করছে। পাশাপাশি অধিদপ্তরের টিমের সঙ্গে খাদ্য অধিদপ্তর, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেলের কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা যুক্ত থেকে তদারকি করছেন।

পণ্যের বাজারদর : বৃহস্পতিবার রাজধানীর একাধিক খুচরা বাজারে প্রতিকেজি কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকা, যা এক সপ্তাহ আগে ১০০ টাকা ছিল। প্রতিকেজি টমেটো ১০০ টাকা কেজিদরে বিক্রি হচ্ছে, যা আগের দাম ছিল ৮০-৯০ টাকা। করলা কেজিপ্রতি ৬০-৭০ টাকা, যা আগে কেজিপ্রতি ৫ টাকা কম ছিল। প্রতিকেজি পটোলের দাম ৫০ থেকে বেড়ে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খুচরা পর্যায়ে প্রতি ডজন (১২ পিস) ফার্মের ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৬৫ টাকায়, যা আগে ১৫০ টাকা ছিল। বড় দানার মসুর ডাল প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে ৯৫-১০০ টাকা। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির আগে ৯০-১০০ টাকা ছিল। প্রতিকেজি খোলা আটা ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ৪৮ টাকা ছিল। পাশাপাশি প্রতিকেজি খোলা ময়দা বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা, যা আগে ৬৫ টাকা ছিল। খোলা পাম অয়েল বিক্রি হচ্ছে লিটারপ্রতি ১৭০ টাকা, যা আগের দিনও ১৬৬ টাকা ছিল। আর বাজারে কম দামের মাছ তেলাপিয়ার কেজিও ২৫০-২৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ২৪০-২৬০ টাকা ছিল।