Image description

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষার্থীদের আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুলতে শিক্ষা ব্যবস্থায় ফের বড় ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে রোবোটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর) ও রিনিউঅ্যাবল এনার্জি ল্যাব (নবায়নযোগ্য শক্তি গবেষণাগার) স্থাপন থেকে শুরু করে শ্রেণিকক্ষে ইন্টার্যাক্টিভ এডুকেশন প্যানেল, কেন্দ্রীয় লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, জাতীয় কনটেন্ট রিপোজিটরি (ডিজিটাল তথ্যভান্ডার) স্থাপনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ল্যাব ব্যবহারের জন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দেওয়া হবে উন্নত প্রশিক্ষণ।

শুধু তাই নয়, ৭ লাখেরও বেশি শিক্ষকদের হাতে উঠবে ট্যাব। দুই কোটি শিক্ষার্থীকে স্মার্ট আইডি কার্ড দেওয়ার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত মেধা যাচাইয়ে হবে নিয়মিত প্রতিযোগিতা। এর বাইরেও ২৪ ঘণ্টা শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রচার করার জন্য ‘জাতীয় শিক্ষা টিভি’ নামে একটি টিভি চ্যানেল চালুর উদ্যোগ নিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। এর জন্য ২৩ হাজার ৪০৫ কোটি টাকার তিনটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। মাউশি বলছে, সব উপজেলায়ই এসব প্রযুক্তিগত উদ্যোগের ফলে শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদ্যমান ডিজিটাল বৈষম্য যেমন হ্রাস পাবে, তেমনি শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে আধুনিক প্রযুক্তির সংস্পর্শে এসে উচ্চ আয়ের কর্মসংস্থান ও স্ব-উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশের সুযোগ পাবে। 

যদিও ডিজিটাল শিক্ষা নিশ্চিতের নামে গত এক দশকে একের পর এক প্রকল্প নিয়েও কাঙ্ক্ষিত সুফল মেলেনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে নেওয়া উদ্যোগগুলো সময়োপযোগী। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে বড় উদ্বেগের কারণ। এর আগে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষা সম্প্রসারণের নামে একাধিক প্রকল্প নেওয়া হলেও স্কুলে স্কুলে স্থাপন করা ডিজিটাল ল্যাবের অনেকগুলোই যথাযথভাবে ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি। ফলে নতুন প্রকল্পগুলো যেন শুধু অর্থ ব্যয়ের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি জনগণের কষ্টার্জিত টাকার অপচয় হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) নতুন প্রকল্প হিসেবে ২৩ হাজার ৪০৫ কোটি টাকার এই তিন প্রকল্পকে অন্তর্ভুক্তির জন্য সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে মাউশি। প্রকল্প তিনটি হলো—চার হাজার ৫০০ কোটি টাকার নির্বাচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রযুক্তি ল্যাব স্থাপন প্রকল্প, ১৮ হাজার ৫০৫

কোটি টাকার মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি ও স্মার্ট লার্নিং পরিবেশ স্থাপন প্রকল্প এবং ৪০০ কোটি টাকার বাংলাদেশ এডুকেশন টিভি: অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার জন্য জাতীয় সম্প্রচার প্ল্যাটফর্ম বা জাতীয় শিক্ষা টিভি প্রকল্প। একই সঙ্গে প্রকল্পগুলোর সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য ১২ কোটি ৭ লাখ টাকার আরও তিনটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি ও স্মার্ট লার্নিং পরিবেশ স্থাপন প্রকল্পটির সক্ষমতা যাচাইয়ে ৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রযুক্তি ল্যাব স্থাপনের সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য ৪ কোটি ২৯ লাখ টাকা এবং জাতীয় শিক্ষা টিভির সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য ব্যয় হবে ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। সব প্রকল্পের মেয়াদকাল ধরা হয়েছে পাঁচ বছর। তা বাস্তবায়ন করা হবে ২০২৭-এর জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। বিএনপি ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে যে ইশতেহার ঘোষণা করেছিল, সে আলোকে এসব প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রযুক্তি ল্যাবে যা থাকবে: মাউশির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের ‘বাজারমুখী শিক্ষা’ ও ‘দক্ষ যুবশক্তি গঠন’ রূপকল্পের সঙ্গে সংগতি রেখে দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে একটি আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন জনসম্পদ গড়ে তোলার জন্যই এ প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছে। ইশতেহারে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায় জোর দেওয়ার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে।

তার জন্য ৫ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রোবোটিক্স, এআই, ভিআর এবং রিনিউঅ্যাবল এনার্জি ল্যাব স্থাপন করা হবে। ল্যাব ব্যবহারের ওপর শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন ও অফলাইনে থাকবে বিশেষ প্রশিক্ষণের সুযোগ। শিক্ষার্থীদের নানা উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ডেও সহায়তা করা হবে এ প্রকল্পের মাধ্যমে। যেসব শিক্ষার্থী নতুন নতুন আইডিয়া ও প্রজেক্ট তৈরি করবেন তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় মেন্টরশিপ এবং কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হবে। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের মেধা যাচাইয়ের জন্য নিয়মিত অলিম্পিয়াড, হ্যাকাথন ও মেলা আয়োজন ও বিজয়ীদের পৃষ্ঠপোষকতা করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র জানায়, এ প্রকল্পের জন্য দেশের ৬৪ জেলার প্রতিটি উপজেলায় ১০টি করে ৫ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হবে। এর মধ্যে ৮টি বিদ্যালয় ও দুটি কলেজ।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চার হাজার ৫০০ কোটি টাকার এ প্রকল্পের বেতন- ভাতার পেছনে ব্যয় হবে ৬০ কোটি টাকা, প্রযুক্তিগত হার্ডওয়্যার ও কিট সরবরাহে ব্যয় হবে ২ হাজার কোটি টাকা, ৫ হাজার ল্যাব অবকাঠামো ও সিভিল কাজে ব্যয় হবে ৭৫০ কোটি টাকা, এসব ল্যাবের জন্য সোলার প্যানেল সিস্টেম এবং অনলাইন ইউপিএসের জন্য ব্যয় হবে ৫০০ কোটি টাকা, সফটওয়্যার ও ল্যাব ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের জন্য ব্যয় হবে ২৫০ কোটি টাকা, ২ লাখ শিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য ব্যয় হবে ১৭৫ কোটি টাকা, ২০টি প্রতিযোগিতা আয়োজনের জন্য ব্যয় হবে ২০০ কোটি টাকা, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিংয়ের পেছনে ব্যয় হবে ৮০ কোটি টাকা এবং কন্টিজেন্সির জন্য ব্যয় হবে আরও ৪০ কোটি টাকা।

মাউশির পরিকল্পনা শাখার একাধিক কর্মকর্তা জানান. এ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতিটি উপজেলায় ল্যাব স্থাপনের ফলে শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদ্যমান ডিজিটাল বৈষম্য যেমন হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে আধুনিক প্রযুক্তির সংস্পর্শে এসে উচ্চ আয়ের কর্মসংস্থান ও

স্ব-উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশের সুযোগ পাবে। ইশতেহারে উল্লিখিত পরিবেশ ও জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ল্যাবগুলোতে সোলার প্যানেল সিস্টেম এবং জিআইএস প্রযুক্তির ব্যবহার শিক্ষার্থীদের জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কারিগরিভাবে সক্ষম করে তুলবে।

যেভাবে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি ও স্মার্ট লার্নিং পরিবেশ স্থাপন করা হবে: মাউশি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিএনপির ২০২৬ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে জিডিপির ৫ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াইফাই নিশ্চিত করা এবং কারিগরি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রধান হাতিয়ার মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি ও স্মার্ট লার্নিং পরিবেশ স্থাপন প্রকল্প। এই প্রকল্প মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ডিজিটাল বৈষম্য নিরসন করে শহর ও গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সমান সুযোগ প্রদান করবে।

এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের ১০ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১ লাখ শ্রেণিকক্ষে ইন্টার্যাক্টিভ এডুকেশন প্যানেল স্থাপন করা হবে। এসব প্রতিষ্ঠানে ১০০ এমবিপিএস ব্রডব্যান্ড সংযোগ নিশ্চিত ও ক্যাম্পাস এরিয়া নেটওয়ার্ক (সিএএন) স্থাপন করা হবে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য চালু করা হবে ইউনিফায়েড এডু আইডি ও স্মার্টকার্ড। কেন্দ্রীয় লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ও জাতীয় কন্টেন্ট রিপোজিটরিও তৈরি করা হবে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। এ ছাড়া সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ওফাইফাই সংযোগ এবং ডিজিটাল লার্নিং পিরেবশ স্থাপন করার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় মনিটরিং ও ডাটা অ্যানালিটিক্স সিস্টেম স্থাপন করা হবে। ৭ লাখেরও বেশি শিক্ষককে আধুনিক ট্যাবলেট-কম্পিউটার প্রদানের পাশাপাশি তাদের ডিজিটাল পেডাগজি ও ইন্টার্যাক্টিভ ক্লাস পরিচালনায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

১৩ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি ও স্মার্ট লার্নিং পরিবেশ স্থাপনের এই প্রকল্পে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও সম্মানিতে ব্যয় হবে ৬০ কোটি টাকা, প্রশাসনিক ব্যয় হবে ১২০ কোটি টাকা, ১ লাখ শ্রেণিকক্ষে এডুকেশন প্যানেল স্থাপনে ব্যয় হবে ৫ হাজার কোটি টাকা, ৭ লাখ শিক্ষককে ট্যাব দিতে ব্যয় হবে দুই হাজার ৮০০ কোটি টাকা এবং তাদের প্রশিক্ষণে ব্যয় হবে দুই হাজার ১০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে ব্যয় হবে ১৭৫ কোটি টাকা, ২ কোটি শিক্ষার্থীর এডুকেশন আইডি, সার্ভার ও স্মার্টকার্ডে ব্যয় হবে ৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতি শিক্ষকের ট্যাবের পেছনে ব্যয় হবে ৪০ হাজার আর শিক্ষার্থীদের কার্ডের পেছনে ব্যয় হবে ৩ হাজার টাকা।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এআই ও কোডিং শিক্ষার যে বৈশ্বিক চাহিদা, তা পূরণে স্মার্ট ক্লাসরুম ও আইসিটি ল্যাব অপরিহার্য। এ ছাড়া ইশতেহারে উল্লিখিত ‘আনন্দদায়ক শিক্ষা’ ও ‘বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অন্তর্ভুক্তিকরণ’ নীতি বাস্তবায়নে অডিও-ভিজ্যুয়াল ও ইন্টারঅ্যাক্টিভ প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আসছে ২৪ ঘণ্টার শিক্ষা টিভিও: দেশে বর্তমানে স্থায়ী বা বিশেষায়িত কোনো জাতীয় শিক্ষা চ্যানেল না থাকায় শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ আধুনিক অডিও-ভিজ্যুয়াল শিক্ষা উপকরণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে মাউশি। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত মানসম্মত ও প্রয়োজনীয় শিক্ষামূলক কনটেন্টের ঘাটতিও রয়েছে। ফলে শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ ও শেখার সুযোগের ক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য কমিয়ে সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষাভিত্তিক একটি টেলিভিশন চ্যানেল চালুর পরিকল্পনা করেছে সরকার। প্রস্তাবিত চ্যানেলটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘বাংলাদেশ এডুকেশন টিভি’। এর জন্য ৪০০ কোটি টাকার বাংলাদেশ এডুকেশন টিভি: অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার জন্য জাতীয় সম্প্রচার প্ল্যাটফর্ম নামে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পের সারসংক্ষেপ বিশ্লেষণে জানা গেছে, প্রকল্পে সবচেয়ে বেশি খরচ হবে ডিজিটাল ব্রডকাস্টিং স্টুডিও স্থাপনে। অডিও-ভিজ্যুয়াল সম্প্রচার নিশ্চিত করতে একটি ডিজিটাল ব্রডকাস্টিং স্টুডিও স্থাপনে খরচ ধরা হয়েছে ৭৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া থোক বরাদ্দ হিসেবে সার্ভার ও আইটি অবকাঠামো নির্মাণে ধরা হয়েছে ৫০ কোটি টাকা, স্যাটেলাইট ডাউনলিংক ফি বাবদ ৩৫ কোটি টাকা এবং স্পেকট্রাম ফি, আপলিংক চার্জ ও ট্রান্সপন্ডার লিজ ফি বাবদ ২২০ কোটি টাকা। এ ছাড়া, মোবাইল অ্যাপ ও ওটিটি প্ল্যাটফর্ম উন্নয়নে ৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। শিক্ষকদের মিডিয়া লিটারেসি ও প্রোগ্রাম ম্যানেজমেন্ট প্রশিক্ষণে ১৫ কোটি এবং প্রকৌশলী ও টেকনিশিয়ানদের দক্ষতার জন্য ১০ কোটি টাকা। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও সম্মানি বাবদ ২৫ কোটি টাকা এবং প্রশাসনিক ব্যয় হিসেবে থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩০ কোটি টাকা।

এসব প্রকল্পে আগেও খুব একটা সুফল আসেনি: বিগত এক দশকে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ডিজিটাল করতে নানা উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে একের পর এক প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও কোনোটির সুফল মেলেনি ঠিকমতো। অন্তত ১২ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের কোনো সুফল পাওয়ার নজির নেই। এর মধ্যে ১ হাজার ২৩৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা ব্যয়ে শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন প্রকল্পের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায় বাস্তবায়ন হয়। বর্তমানে অধিকাংশ ল্যাবেই ঝুলছে তালা। নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার সরঞ্জাম।

একইভাবে ব্যানবেইসের ৩৫৩ কোটি ২১ লাখ ৪২ হাজার টাকার ‘এস্টাবলিশমেন্ট অব ইন্টিগ্রেটেড এডুকেশনাল ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম-আইইআইএমএস’ শীর্ষক প্রকল্পের মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের এক কোটি ৬০ লাখ শিক্ষার্থীকে ‘ইউনিক আইডি’ দেওয়ার ছিল। এই প্রকল্পেও হয় সীমাহীন লুটপাট। ইউনিক আইডি দেওয়ার জন্য ১০৮ কোটি টাকা ব্যয় হলেও একজন শিক্ষার্থীই হাতে পায়নি আইডি কার্ড। উল্টো ইউনিক আইডির জন্য দেওয়া তথ্য এখন শিক্ষার্থীদের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ ইউনিক আইডির সফটওয়্যার ব্লক করে রাখায় অনেক শিক্ষার্থী তাদের এনআইডি কার্ড ও সার্টিফিকেট সংশোধন করতে পারছেন না। মাউশির প্রস্তাবিত এক প্রকল্পেও নতুন করে আইডি কার্ড তৈরির কথা বলা হয়েছে। সেখানে একজন শিক্ষার্থীর কার্ডের পেছনে খরচ হবে তিন হাজার টাকা।

একইভাবে ২ হাজার ৫১১ কোটি টাকার সরকারি কলেজসমূহে বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ প্রকল্প, সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে নির্বাচিত বেসরকারি কলেজসমূহের উন্নয়ন প্রকল্প এবং এক হাজার ৩৫৩ কোটি টাকা আইসিটির মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার প্রচলন প্রকল্পেরও সুফল খুব একটা নেই। কোনো কোনো প্রকল্পের মেয়াদ বারবার বাড়লেও কাজ এখনো শেষ হয়নি। তবে লুটপাট করতে অবকাঠামো তৈরির আগে কেনাকাটা শেষ হয়ে গেছে। ফলে প্রযুক্তি শিক্ষার নতুন এসব প্রকল্প কতটা সুফল হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ কালবেলাকে বলেন, ‘প্রযুক্তিবিষয়ক প্রকল্পের দরকার আছে। তবে আগে শেখ রাসেল ল্যাবসহ নানা প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল; কিন্তু সুফল আসেনি। মূলত পরিকল্পনা, বাস্তবায়নে ত্রুটি ছিল। উপযুক্ত লোককে প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। সেগুলো পর্যালোচনা করে আগের ত্রুটি, দুর্বলতাগুলো দূর করে নতুন করে যদি ভালোভাবে কিছু করা যায় সেটা ভালো। আগের অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি যাতে না হয় সেদিকে খেলায় রাখতে হবে।’

মাউশির সাবেক মহাপরিচালক ড. মুহাম্মদ আজাদ খান কালবেলাকে বলেন, ‘আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অবকাঠামো নেই, শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নেই। এসব নিশ্চিত না করে আইসিটি কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর কোনো প্রকল্পের সুফল মিলবে না। এজন্য আগেও সব প্রকল্পও ব্যর্থ হয়েছে। কারণ আইসিটির প্রকল্পগুলো মূলত ক্রয়ভিত্তিক প্রকল্প। কেনাকাটার পাশাপাশি একসঙ্গে যদি প্রশিক্ষণ দেওয়ার চিন্তা করা তাহলে এসব প্রকল্পও আগের মতো মাঠে মারা যাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘পাঁচ বছরের প্রকল্পে সরকারকে প্রথম দুই বছর প্রশিক্ষণ, তৃতীয় বছরের প্রকল্প শুরু করবে আর চতুর্থ বছরে প্রকল্পকে রান করাবে। তা হলে অযথা টাকা খরচ হবে, জাতীয় অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হবে। শিক্ষায় কোনো আউটপুট আসবে না।’

মাউশির পরিকল্পনা উইংয়ের পরিচালক অধ্যাপক ড. মীর জাহীদা নাজনীন কালবেলাকে বলেন, ‘প্রকল্পগুলো বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনে ‘সবুজ তালিকায়’ অন্তর্ভুক্তির অপেক্ষায় আছে। সবুজ তালিকায় অনুমোদিত হওয়ার পর এর সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হবে।’