দেশে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে হাম ও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে দুই লাখ ১৫ হাজার ২২৭ শিশু। এ সময় এই দুই রোগে প্রাণ গেছে এক হাজার ১০৩ শিশুর।
এর মধ্যে হামে মৃত্যু হয়েছে এক হাজার ৭৬ জনের, ডেঙ্গুতে মারা গেছে ২৭ শিশু। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের জন্য এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সংক্রামক রোগ হাম। প্রথম ঢেউ শেষে এরই মধ্যে এই রোগের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। তবে এই বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
একইসঙ্গে বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করেছে এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী চাপ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এপ্রিল থেকে চলতি সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়েছে দুই লাখ চার হাজার ৩০০ শিশু। বিপরীতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ১০ হাজারের বেশি শিশু।
সর্বশেষ গতকাল বুধবার হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১১ শিশুর।
নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ২৭০ জন। চলতি সেপ্টেম্বরে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ১০৩ শিশু এবং আক্রান্ত হয়েছে ২৬ হাজার ৯৯৭ জন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, হাম মহামারির প্রথম ঢেউ পুরোপুরি শান্ত হওয়ার আগেই দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে এবং সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে। এখন টিকা প্রয়োগই প্রধান সমাধান। সরকারি উদ্যোগে ব্যাপক টিকাদান নিশ্চিত করতে পারলেই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
তিনি বলেন, টিকার বয়সসীমা শুধু ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর না রেখে এখন ছয় মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী সব শিশু-কিশোরকে টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন। মহামারি পুরোপুরি থামাতে রোগতাত্ত্বিক সূত্র অনুযায়ী অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকা দিতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত ছিল ৪০ হাজার ৭০৮ জন, মৃত্যু ২৭৬ জনের। মে মাসে আক্রান্ত ৩৯ হাজার ২৭৭ জন এবং মৃত্যু ৩০৯ জনের। জুনে আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা কমে ৩৩ হাজার ৫৭ জন হলেও মৃত্যু ১৩৩ জনের। জুলাইয়ে আক্রান্ত ৩১ হাজার ৩২৭ জন এবং মৃত্যু ১১৯ জনের। আগস্টে আক্রান্ত ৩২ হাজার ৯৩৪ জন এবং মৃত্যু ১৩৬ শিশুর। অর্থাৎ সংক্রমণ কয়েক মাসে কমলেও মৃত্যুর ধারাবাহিকতা থামেনি। দেশে সরকার একের পর এক টিকাদান কর্মসূচি হাতে নিলেও হামে আক্রান্ত ও মৃত্যু না কমায় প্রশ্ন উঠেছে—টিকাদান কর্মসূচিতে এত দিনের সাফল্যের দাবি থাকলেও হাম নিয়ন্ত্রণে এমন বিপর্যয় কেন? গত কয়েক বছরে দেশে হাম প্রায় নিয়ন্ত্রিত ছিল। ২০২৫ সালে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল মাত্র ১৩২। ২০২৪ সালে ২৪৭, ২০২৩ সালে ২৮২ এবং ২০২২ সালে ৩১১ জন আক্রান্ত হয়।
হাম নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার ১০ কারণ : বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে হাম নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার পেছনে ১০টি কারণ পাওয়া যায়। এগুলো হলো—টিকাদানে বড় ঘাটতি, দুই ডোজ টিকার মধ্যে ইমিউনিটি গ্যাপ, শিশুর সংখ্যার হিসাবে গরমিল, টিকার সরবরাহ সংকট, আগাম সতর্কতার ঘাটতি, নিয়মিত টিকাদানে ভাটা, মাঠকর্মীদের অসন্তোষ, কাভারেজ যাচাইয়ে দুর্বল নজরদারি, টিকা নিয়েও আক্রান্তদের বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ঘাটতি এবং অপুষ্টি ও চিকিৎসায় বিলম্ব।
এর আগে হাম নিয়ন্ত্রণে সাফল্য ছিল ২০০৬, ২০১০ ও ২০১৪ সালে বিভিন্ন জাতীয় হাম টিকাদান কর্মসূচিতে। এ সময় প্রায় শতভাগ বা তার বেশি কাভারেজের দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২০-২১ সালের পর বড় ধরনের বিশেষ ক্যাম্পেইন হয়নি। এর মধ্যে নিয়মিত টিকাদানের কাভারেজও কমেছে। ফলে জনসংখ্যার একটি অংশের মধ্যে তৈরি হয়েছে ইমিউনিটি গ্যাপ।
সরকারের একের পর এক কর্মসূচি : চলতি বছরের মার্চে হাম সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ার পর উচ্চঝুঁকির ৩০টি উপজেলায় জরুরি টিকাদান শুরু করে সরকার। পরে ২০ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত সারা দেশে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের গণটিকা দেওয়া হয়। লক্ষ্য ছিল এক কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার শিশু। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে টিকা দেওয়া হয়েছে প্রায় এক কোটি ৯৬ লাখ ৬১ হাজারের বেশি শিশুকে—অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি। কিন্তু এই হিসাবের সঙ্গে অন্য একটি সরকারি কর্মসূচির তথ্যের বড় পার্থক্য দেখা যায়। একই বয়সী শিশুদের গত জুনে ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানোর কর্মসূচিতে অংশ নেয় প্রায় দুই কোটি ৪০ লাখ শিশু। ফলে টিকাদানের হিসাবের সঙ্গে মাঠের শিশুর সংখ্যার এত বড় ব্যবধান কেন—সে প্রশ্ন উঠেছে।
সর্বশেষ ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। এ সময় সরকার ৩৪ লাখ শিশুকে হামের টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি ১২ থেকে ১৮ জন পর্যন্ত সংক্রমিত করতে পারে। সংক্রমণের শৃঙ্খল ভাঙতে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে দুই ডোজ টিকার আওতায় আনা জরুরি। বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, কাগজে টিকা দেওয়ার হিসাব আর বাস্তবে সুরক্ষিত শিশুর সংখ্যা এক নয়।
মৃতদের ৯১% টিকাবঞ্চিত : ইপিআইয়ের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, নিশ্চিত হামে আক্রান্ত শিশুদের ৮০ শতাংশ এবং মৃতদের ৯১.৪ শতাংশ কোনো এমআর টিকা নেয়নি। বয়সভিত্তিক তথ্যেও উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে। ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে আক্রান্তের হার ১০ শতাংশ হলেও মৃত্যুর হার ২০ শতাংশ। ছয় থেকে ৯ মাস বয়সীদের আক্রান্তের হার ১৮ শতাংশ, কিন্তু মৃত্যুর হার সর্বোচ্চ ৩১ শতাংশ। ৯ থেকে ১২ মাস বয়সীদের আক্রান্তের হার ১২ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার ২৫ শতাংশ। এক থেকে পাঁচ বছর বয়সীদের মধ্যে আক্রান্তের হার সর্বোচ্চ ২৮ শতাংশ; মৃত্যুর হার ১৮ শতাংশ।
ইপিআইয়ের উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ সাব্বির হায়দার বলেন, ছয় মাসের কম বয়সী শিশুরা সাধারণত মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এখন টিকা নেওয়ার বয়স হওয়ার আগেই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, অনেক শিশুর ক্ষেত্রে মাতৃ-অ্যান্টিবডিও পর্যাপ্ত সুরক্ষা দিতে পারছে না।
তাঁর মতে, করোনাকালের টিকাদান ব্যাহত হওয়ার প্রভাবও এখন দেখা যাচ্ছে। ২০২০-২২ সালের লকডাউনে টিকা থেকে বাদ পড়া কিশোরী-তরুণীদের অনেকে এখন মা হচ্ছেন। ফলে মাতৃ-অ্যান্টিবডির সুরক্ষা না পাওয়া নবজাতকের ঝুঁকিও বাড়ছে।
আক্রান্ত ও মৃত্যুতে কোন জেলা এগিয়ে : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্তের সংখ্যায় শীর্ষে থাকা ঢাকা জেলায় আক্রান্ত হয়েছে ৬৪ হাজার ২৬৪ শিশু। এরপর বরিশালে সাত হাজার ৮৯১, সিলেটে সাত হাজার ৬৩৮, কক্সবাজারে ছয় হাজার ৯১৯, নোয়াখালীতে সাত হাজার ১৫৬, পটুয়াখালীতে পাঁচ হাজার ৬৭৩, ময়মনসিংহে পাঁচ হাজার ৫০২, কুমিল্লায় চার হাজার ৭৮০ এবং চট্টগ্রামে ৯ হাজার ১৮৩ শিশু আক্রান্ত হয়েছে। ফরিদপুরে আক্রান্ত হয়েছে ছয় হাজার ছয়জন। মৃত্যুও সবচেয়ে বেশি ঢাকা জেলায়। এ জেলায় মৃত্যু ৪৫১ জনের। এরপর ময়মনসিংহে ৭১, সিলেটে ৬৮, সুনামগঞ্জে ৬৭, বরিশালে ৫৯, রাজশাহীতে ৫৮, চট্টগ্রামে ২৫, বগুড়ায় ২৩, খুলনায় ২৩ এবং ফরিদপুরে ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ১৩% শিশু : দেশে হামের পাশাপাশি ডেঙ্গু নতুন চাপ তৈরি করছে। গত মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরো ছয়জনের মৃত্যু এবং এক হাজার ৮৬৮ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
চলতি বছর বুধবার পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট ৬৭ হাজার ৩৬৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছে ৬২ হাজার ১১৭ জন। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন পাঁচ হাজার ৪৯ জন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যু হয়েছে ২০১ জনের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৫ বছরের কম বয়সে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ১০ হাজার ৯২৭ জন, যা মোট আক্রান্তের ১৬.২২ শতাংশ। এই বয়সে মৃত্যু হয়েছে ২৭ শিশুর, যা মোট মৃত্যুর ১৩ শতাংশ।