Image description
কাস্টম হাউস আইসিডি কমলাপুর

কাস্টম হাউস আইসিডি কমলাপুরের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মঈনুল হোসেন। তিনি কাস্টমস কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে মিথ্যা ঘোষণায় আনা পণ্য খালাস করেন। ১০ বছর ধরে গড়া সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তিনি মিথ্যা ঘোষণায় আনা পণ্য কৌশলে বের করে নিয়ে আসেন।

আইসিডিতে কোনো ক্যাডার কর্মকর্তার পদায়ন হলে তার আস্থাভাজন বনে যান মঈনুল। আর কোনো কর্মকর্তা তার মিথ্যা ঘোষণায় আনা পণ্য আটকে দিলে সেই কর্মকর্তাকে বিদায় নিতে হয় অফিস থেকে।

অভিযোগ আছে, একসময়কার আনস্টাফিং কর্মকর্তা খাদিজা পারভীন সুমি মঈনুলের সিন্ডিকেটের অংশ। খাদিজা পারভীন সুমি যতদিন আনস্টাফিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন, মঈনুলের আমদানি করা পণ্যকে চ্যালেঞ্জ করা হয়নি। মঈনুল যা ঘোষণা দিয়েছেন, সেভাবেই পণ্য খালাস হয়েছে। সম্প্রতি সুমিকে অন্য একটি দপ্তরে বদলি করা হলেও তার দৌরাত্ম্য কমেনি একটুও। এখনো মঈনুল-সুমি সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি কাস্টম হাউস আইসিডি কমলাপুর।

সম্প্রতি মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি করা পণ্য আটকে মামলা দিয়েছিলেন এক সহকারী কমিশনার। সপ্তাহ পার না হতেই চেয়ার হারান আনস্টাফিংয়ের দায়িত্ব পাওয়া ওই কর্মকর্তা। অভিযোগ আছে, মঈনুলের হয়ে এ চাপ তৈরি করেন একসময় আনস্টাফিং কর্মকর্তা খাদিজা পারভীন সুমি।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে শিটের মিথ্যা ঘোষণায় শুল্ক ফাঁকি-সংক্রান্ত একটি চিঠি পাঠানোর পর সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কমে। পরে এনবিআর চেয়ারম্যানের নির্দেশনায় সঠিকভাবে শিটের চালান খালাস শুরু হয়। তবে সপ্তাহ না পেরোতেই আবার মঈনুল সব ম্যানেজ করে ফেলেন।

সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের বাসিন্দা মঈনুল প্রথমে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে কাস্টম সরকার (এজেন্টের প্রতিনিধি বা কর্মী, যিনি কাগজপত্রের কাজ করেন) হিসেবে কাজ শুরু করেন। একসময় অন্যের লাইসেন্স ভাড়া নিয়ে পণ্য খালাস শুরু করলেও দ্রুত মালিক বনে যান। তার উত্থান হয় ২০১৮ সালে কাস্টম হাউস আইসিডি কমলাপুরে শিট খালাসের কাজ দিয়ে। তখন থেকে একচেটিয়া শিটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কাজ করেন তিনি।

গত এক বছর তাকে সহযোগিতা করে গেছেন কাস্টম হাউসের উপকমিশনার খাদিজা পারভীন সুমি। এ জন্য নানা সুবিধা পেয়েছেন। পাশাপাশি পেয়েছেন কাস্টম হাউসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিং আনস্টাফিংয়ে (কনটেইনার থেকে পণ্য বা কার্গো খালাস দেখার দায়িত্ব)। ওখানে ছিলেন প্রায় ১১ মাস। এ সময়ে মঈনুল শিটের চালান যেমন ঘোষণা দিতেন, তেমনই খালাস হতো। খাদিজা পারভীন সুমিকে সাহায্য করতেন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা কামরুল ও শাহ আলম।

মঈনুল দুটি সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্সে কাজ করেন। একটি লাইসেন্স পারভীন ট্রেডার্সের নামে, অন্যটি মা অ্যাসোসিয়েটের নামে। সবচেয়ে বেশি শিটের কাজ করেন পারভীন ট্রেডার্সের নামে। খাদিজা পারভীন সুমি ১১ মাস আনস্টাফিংয়ে থাকাকালীন পারভীন ট্রেডার্সের প্রায় ৫১ হাজার টন শিটের চালান খালাস করেন। যার মধ্যে ৪৭ হাজার টন পণ্য ছিল কম শুল্কের। অর্থাৎ অল্প কিছু সিআর শিট বাদে প্রায় সবই ছিল এইচআর শিট। প্রতি টন সিআর শিটের শুল্ক হচ্ছে ২৮ হাজার টাকা। আর এইচআর শিটের টনপ্রতি শুল্ক হচ্ছে প্রায় ৩৮ হাজার টাকা। জিপি শিটের টনপ্রতি শুল্ক কর হচ্ছে ৫৫ হাজার টাকা। এ দীর্ঘ সময়ে অর্থাৎ প্রায় ১১ মাসে উপকমিশনার সুমি এবং তার তদারককারী কর্মকর্তা মামলা তো দূরের কথা, মঈনুলের কনসাইনমেন্ট খুলেও দেখেননি। মঈনুলে ঘোষণা অনুযায়ী খালাস হয়েছে।

সুমিকে সরানোর আগে কমলাপুরে শিটের চালান খালাসে শুল্ক ফাঁকি হচ্ছে এবং কর্মকর্তাদের আর্থিক সুবিধার অভিযোগ ওঠে। এ সময়ে শিটের প্রতি কনটেইনারে শুল্ক ফাঁকি হচ্ছে বলে এনবিআরের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইসি থেকে কাস্টম হাউসকে চিঠিও দেয়। এরপর আরও প্রায় এক মাস আনস্টাফিংয়ে থাকেন খাদিজা পারভীন সুমি।

দুই মাস আগে আনস্টাফিং থেকে সুমিকে সরিয়ে ৪০ ব্যাচের সহকারী কমিশনার আসিফ আহমেদ অনিককে পদায়ন করা হয়। এতে শিট আমদানির ভেতরের কিছু রহস্য বের হতে থাকে। নতুন সহকারী কমিশনার সঠিক ঘোষণার ওপর জোর দেন। তিনি মঈনুলের পারভীন ট্রেডার্সের উচ্চ শুল্কের পণ্য বেশি দেখতে পান। এ সময়ে পারভীন ট্রেডার্স কম শুল্কের এইচআর এবং সিআর শিট খালাস করেছে ২ হাজার ২৩৩ টন। আর এ সময়ে উচ্চ শুল্কের জিপি শিটের চালান খালাস করেছে ১০ হাজার ১৬২ টন। এরই মধ্যে মিথ্যা ঘোষণা দেওয়ায় মঈনুলের ৭টি চালান আটকে দেন। মিথ্যা ঘোষণার প্রমাণও মিলে। এ বিল অব এন্ট্রি নাম্বারগুলো হলো সি-১১৫৫৫, সি-১১৫৪৮, সি-১১৫৫২, সি-১১৫৫৭, সি-১১৫৪৭, সি-১১৫৫৩, সি-১১৫৫৪। আর এ সাতটি বিল অব এন্ট্রিতে মিথ্যা ঘোষণার দায়ে প্রায় ৭৫ লাখ টাকা জরিমানা করেন কমিশনার।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মঈনুল বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, কাজ করতে করতে কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। তবে শুল্ক ফাঁকি দেননি। সম্প্রতি হওয়া মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, মামলা সবার নামেই হয়। তবে উপকমিশনার খাদিজা পারভীন সুমির সময়ে এক বছরে শুধু কম শুল্কের শিট খালাস করেছেন, পণ্য দেখা পর্যন্ত হয়নি, এখন কেন মামলা হচ্ছে? জানতে চাইলে তিনি বলেন, তখন শুধু সিআর ও এইচআর শিট আমদানি করেছি।

সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খাদিজা পারভীন সুমি আনস্টাফিংয়ের দায়িত্বে থাকাকালীন উচ্চ শুল্কের পণ্যকে কম শুল্কের ঘোষণা দিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হতো। এর মধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশ ‘কাস্টম ডিউটি শিট’ গোপন বা ঘোষণা না করেই পণ্য ছাড় করা হতো।

মঈনুলের অবাধে পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে ব্যাঘাত ঘটে নতুন কমিশনার যোগদানের পর। নতুন কমিশনার কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়া ‘সেকেন্ড অ্যাডভাইসমেন্ট’ হিসেবে শিটের চালান অবাধে খালাস করতে রাজি ছিলেন না। পরবর্তী সময়ে মাস দেড়েক পর, সঠিক ঘোষণা দেওয়ার শর্তে এনবিআরের নির্দেশনায় তিনি এসব চালান খালাসের অনুমতি দেন।

একই সঙ্গে উপকমিশনার খাদিজা পারভীন সুমিকে সরিয়ে আনস্টাফিংয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় সহকারী কমিশনার আসিফ আহমেদ অনিককে। এতে সঠিক ঘোষণায় শিটের চালান খালাস প্রক্রিয়া শুরু হয় কাস্টম হাউসে।

জানা গেছে, অতীতে খাদিজা পারভীন সুমি দায়িত্বে থাকাকালীন খালাস হওয়া চালানের প্রায় ৯০ শতাংশই যেত কম শুল্কের (ডিউটি) শিট হিসেবে। তবে পরে সেই চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো হয়ে যায়; এখন ৮০ শতাংশই বেশি শুল্কের শিট হিসেবে খালাস হচ্ছে। এর ফলে শুল্ক ফাঁকির প্রবণতা যেমন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, তেমনি সরকারের রাজস্ব আদায়ও বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এ অবস্থায় আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠেন মঈনুল-সুমি সিন্ডিকেট। এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই কমিশনারকে বিভিন্ন মাধ্যমে চাপ প্রয়োগ করে সহকারী কমিশনারকে সরিয়ে দেওয়ার আদেশ করিয়ে নেন তারা। মঈনুলের মা অ্যাসোসিয়েটের গাড়ির গ্রুপ দেখা এবং সহযোগিতাকারী ৪১ ব্যাচের আরেক নারী কর্মকর্তা সামিয়া তাইছিরকে আনস্টাফিংয়ের দায়িত্বে নিয়ে আসে সিন্ডিকেট।

বদলি, তথ্য গোপন করে পণ্য খালাস—এগুলো কমলাপুর কাস্টম হাউসে ওপেন সিক্রেট বিষয়। সম্প্রতি শিট-সংক্রান্ত বিষয়ে নাক গলানোর কারণে সিআইসির এক উপপরিচালককে কুমিল্লায় বদলি করে দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে। এর আগে এক কমিশনার বদলি হওয়ার পরদিন সরকারি ছুটির দিনে দুই ঘণ্টায় ৮২০ টন শিট মিথ্যা ঘোষণায় খালাসের অভিযোগও রয়েছে। এ নিয়ে পরবর্তী সময়ে দুদক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং মঈনুলের বিরুদ্ধে তদন্তও শুরু করে। বিষয়টিও ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন মঈনুল। এ ছাড়া তার শুল্ক ফাঁকি নির্বিঘ্ন করতে কাস্টমসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে কাজে লাগান। কাস্টম হাউস সূত্র জানায়, কাস্টম হাউস আইসিডি কমলাপুর বছরের পর বছর ধরে আধিপত্য বিস্তার করছেন মঈনুল। কর্মকর্তাদের গাড়ি ভাড়ার খরচ মেটানো থেকে শুরু করে কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে বছরের পর পর শুল্ক ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছেন।

মঈনুলের ব্যাপারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইসি চিঠি দিয়েছিল কাস্টম কর্তৃপক্ষকে। শুল্ক ফাঁকির বিষয়ে কাস্টম হাউসে শিট-সংক্রান্ত প্রতিবেদনও দেওয়া হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা তো নেওয়া হয়নি; উল্টো আরও প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। একাধিক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন মঈনুলের তোড়জোড় ও প্রভাবের কারণেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কারণ, মঈনুলই এই কাস্টম হাউসের মূল পরিচালনকারী।

কাস্টম হাউসের আনস্টাফিংয়ের সাবেক উপকমিশনার সুমি দায়িত্বে থাকাকালীন সন্ধ্যার আগেই বাসায় চলে যেতেন। আর মঈনুলের বেশিরভাগ পণ্য চালান তার নির্দেশনায় সন্ধ্যার পর কাস্টম হাউস দিয়ে বের হতো। যাতে পরে কোনো বিতর্ক উঠলেও বলতে পারেন তিনি ছিলেন না। আর ওই সময়টায় তার হয়ে কাজ করতেন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা কামরুল ও শাহ আলম। এভাবে মাসের পর মাস নিজের ঘোষণামতো পণ্য চালান খালাস করে নেন সিঅ্যান্ডএফ মইনুল।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাস্টম হাউস আইসিডি কমলাপুরের কমিশনার কাজী মুহম্মদ জিয়াউদ্দীন কালবেলাকে বলেন, আমি কাস্টম হাউসে যোগ দেওয়ার পর থেকে রাজস্ব ফাঁকির বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। যেসব প্রতিষ্ঠান অনিয়মের চেষ্টা করেছে, তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নিয়েছি। এ ছাড়া আমাদের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। পরিবেশ ঠিক রেখে কাস্টম হাউস পরিচালনার চেষ্টা করছি বলেও জানান এই কর্মকর্তা।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, মঈনুল জোরে ও স্বামী অ্যাডমিন ক্যাডার কর্মকর্তার প্রভাবে সুমি আনস্টাফিং বিভাগ ছাড়লেও শিটের অ্যাসেসমেন্ট গ্রুপ দেখভালের দায়িত্ব এখনো তার হাতেই। জানা গেছে সুমির স্বামী ৩০ ব্যাচের অ্যাডমিন কর্মকর্তা।

কাস্টম হাউস থেকে শুরু করে ভ্যাট কমিশনারেট সব জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে পদায়ন নিতে পটু খাদিজা পারভীন সুমি। এর আগে ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট কমিশনারেটে যোগ দিয়েই বাগিয়ে নেন লালবাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ ডিভিশন। এখনো লালবাগ ডিভিশনে তার দেওয়া সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা ধরনের সমালোচনা রয়েছে। নিজেকে অনেকের চেয়ে আলাদা দাবি করা এই কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে সুবিধা নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া কমলাপুর কাস্টম হাউসে তার হয়ে আনস্টাফিংয়ের দুই সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা কাজ করতেন বলে নিশ্চিত করেছে কাস্টম হাউস সূত্র।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাস্টম হাউস আইসিডি কমলাপুরের উপকমিশনার খাদিজা পারভীন সুমি বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি কালবেলার কাছে দাবি করে বলেন, আমি আনস্টাফিংয়ে থাকাকালীন সময়ে কোনো ধরনের শুল্ক ফাঁকি হয়নি। সবসময় নিরিবিলি কাজ করার চেষ্টা করেছি। এ ছাড়া সবসময় কম গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে কাজ করার চেষ্টা করেছি। আমি সাধারণত ৫টার মধ্যে অফিস ত্যাগ করেছি বলেও জানান তিনি। সন্ধ্যার পর তার টিমের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা কামরুল ও শাহ আলমের যোগসাজশে শুল্ক ফাঁকির বিষয়টি জানতে চাইলে সুমি বলেন, উপকমিশনার তো আর সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাদের দায় নিতে পারেন না বলেও জানান তিনি।