Image description
সেচ, চাষ, মাড়াই ও পরিবহণে বাড়তি খরচ । ফসলের ন্যায্য দাম না মিললে লোকসানে পড়তে হবে ।

ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বেড়ে ১৩৫ টাকা হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সেচ, জমি প্রস্তুত, ধান মাড়াই, কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার ও ফসল পরিবহণ-কৃষির প্রায় প্রতিটি ধাপেই বাড়তি খরচের আশঙ্কা করছেন তারা। কোথাও আমন ধানের জমিতে সেচের প্রয়োজন না থাকায় এখনো প্রভাব পড়েনি, আবার কোথাও ডিজেলনির্ভর সেচব্যবস্থার কারণে উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে চর অঞ্চলের কৃষকদের দুশ্চিন্তা বেশি। তাদের আশঙ্কা, বাড়তি খরচের বিপরীতে ফসলের ন্যায্য দাম না মিললে লোকসানে পড়তে হবে। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

বড়াইগ্রাম (নাটোর) : উপজেলায় চলতি আমন মৌসুমে শুধু রোপা আমন চাষেই কৃষকদের প্রায় ২০ কোটি ৪৬ লাখ টাকা অতিরিক্ত খরচ গুনতে হবে। উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে ১৭ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষ হয়েছে। এসব জমিতে গভীর ও অগভীর মিলিয়ে ৩৬১টি বিদ্যুৎচালিত এবং ৪ হাজার ৮০৩টি ডিজেলচালিত সেচপাম্প রয়েছে।

কৃষকরা জানান, চলতি মৌসুমে প্রতি বিঘায় গড়ে ৪০ লিটার ডিজেল লাগতে পারে। লিটারে ২০ টাকা দাম বাড়ায় শুধু সেচেই বিঘাপ্রতি অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে প্রায় ৮০০ টাকা। এর সঙ্গে সারের বাড়তি দাম যোগ হচ্ছে। সরকারি ভাবে দাম না বাড়লেও কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে ডিলাররা কেজিপ্রতি ইউরিয়ায় ১০-১১ টাকা, টিএসপিতে ৬ টাকা এবং পটাশে ৪ টাকা বেশি নিচ্ছেন বলে কৃষকদের অভিযোগ। এতে বিঘাপ্রতি সার ও সেচে বাড়তি খরচ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকা।

বাজিতপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, আট বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছি। জমিতে সেচ দিতে হচ্ছে। হঠাৎ ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বেড়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত সেচ খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছি। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সজীব আল মারুফ বলেন, বৃষ্টির পর রোদ হওয়ায় পানি দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। ফলে সেচের প্রয়োজন হতে পারে। উৎপাদন খরচ অনুযায়ী ন্যায্য দাম না পেলে কৃষকরা ধান চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন।

রাঙামাটি : জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পাহাড়ি কৃষিতেও পড়ছে। বাঘাইছড়ির আমন চাষি সুনীল চাকমা জানান, ধান কাটা ও মাড়াইয়ের সময় ট্রাক্টর ও মাড়াই মেশিনের ভাড়া আগের চেয়ে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বাড়তে পারে। কাউখালীর কৃষক মংথোয়াই মারমা বলেন, জুমের ধান, আদা, হলুদসহ অন্যান্য ফসল বাজারে নেওয়ার মৌসুম চলছে। তেলের দাম বাড়ায় পরিবহণ ব্যয় বেড়েছে। কৃষিসংশ্লিষ্টরা জানান, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে কলা, পেঁপে ও জুমের ফসল বাজারে আনতে গাড়ি ও নৌকা ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা বাড়তি চাপের মুখে পড়েছেন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনিরুজ্জামান বলেন, এ মূল্যবৃদ্ধি আমন ও জুম চাষিদের বর্তমান ব্যয়ের পাশাপাশি আসন্ন বোরো মৌসুমের সেচ ব্যবস্থাপনাতেও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।

রাজবাড়ী ও বালিয়াকান্দি : জেলায় আমন চাষে এখনো জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির তেমন প্রভাব পড়েনি। বৃষ্টির কারণে অধিকাংশ জমিতে সেচের প্রয়োজন হয়নি বলে কৃষকরা জানিয়েছেন। সদর উপজেলার কৃষক আবুল কালাম আজাদ বলেন, অতি বৃষ্টির কারণে আমনের ফলন ভালো হয়েছে এবং সেচ দিতে হয়নি। বানীবহের কৃষক মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, অক্টোবর থেকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়তে পারে। সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জনি খান জানান, বৃষ্টির কারণে চলতি আমন মৌসুমে এখন পর্যন্ত কৃষকরা সেচের প্রয়োজন অনুভব করেননি। তবে বোরো মৌসুমে প্রভাব পড়তে পারে। বালিয়াকান্দিতেও একই চিত্র। উপজেলায় প্রায় ১৩ হাজার একর জমিতে আমন চাষ হয়েছে। নিচু জমিতে বৃষ্টির পানি জমে থাকায় সেচের প্রয়োজন হচ্ছে না।

পটুয়াখালী দক্ষিণ : জেলায় আমন রোপণ শেষ হলেও সেচ, ধান কাটা ও মাড়াইয়ে বাড়তি খরচের আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। কালিকাপুর ইউনিয়নের কৃষক হেলাল জানান, ৩৩ শতাংশ জমি চাষ ও সেচে আগে প্রায় ৪ হাজার ৪০০ টাকা লাগলেও এখন প্রায় ৬ হাজার ২০০ টাকা লাগতে পারে। মরিচবুনিয়ার কৃষক সোহেল খান বলেন, সেচের খরচ বেড়ে যাওয়ায় আমন চাষে লাভ থাকবে কিনা, তা নিয়ে শঙ্কিত আমি। পটুয়াখালী সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাজমুল ইসলাম মজুমদার জানান, ৩৩ শতাংশ জমিতে সেচে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি খরচ হতে পারে।

হাকিমপুর (দিনাজপুর) : হিলিতেও সেচ খরচ নিয়ে বিপাকে কৃষকরা। বৃষ্টির ঘাটতির কারণে কিছু জমিতে ডিজেলচালিত শ্যালো মেশিনে সেচ দিতে হচ্ছে। কৃষকদের দাবি, বিঘাপ্রতি সেচে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি খরচ হতে পারে। পাম্প মালিকরাও ঘণ্টাপ্রতি সেচের মাশুল বাড়িয়ে দিয়েছেন। হাকিমপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরজেনা বেগম জানান, এ বছর আবহাওয়া ভালো থাকায় ফলনও ভালো হবে বলে আশা করা হচ্ছে। উপজেলায় ৮ হাজার ১১৮ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে।

হাতিয়া (নোয়াখালী) : দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন। নদীবেষ্টিত হওয়ায় এখানে বিদ্যুৎ ও কৃষিযন্ত্রের সীমাবদ্ধতার কারণে সেচ, পাওয়ার টিলারে জমি চাষ এবং কৃষিপণ্য পরিবহণে ডিজেলের ওপর নির্ভর করতে হয়। কৃষকদের অভিযোগ, জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বাড়ছে। জাহাজমারা ইউনিয়নের কৃষক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বলেন, সার, বীজ ও কীটনাশকের বাড়তি দামের পর তেলের দাম বাড়ায় সময়মতো সেচ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। পাওয়ার টিলারচালক আবুল কাশেম জানান, বাড়তি দামে তেল কিনে জমি চাষ করতে গিয়ে নিজেদের পারিশ্রমিকও উঠছে না।

লালমনিরহাট ও কালীগঞ্জ : আমন মাড়াই ও আসন্ন রবি মৌসুমের সবজি চাষে বাড়তি খরচের আশঙ্কা করছেন জেলার কৃষকরা। গত বছর প্রতি বিঘা ধান মাড়াইয়ে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা খরচ হলেও এবার তা ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা হতে পারে। আমন কাটার পর রবিশস্য, আলু ও সবজি চাষের জন্য জমি তৈরিতে ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলারের ভাড়াও বিঘাপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা বাড়তে পারে বলে কৃষকদের ধারণা।

তারাগঞ্জ (রংপুর) : তারাগঞ্জ উপজেলার কৃষকরাও ডিজেলের দাম বৃদ্ধিতে ক্ষোভ জানিয়েছেন। কুর্শা ইউনিয়নের সবজি চাষি অবিনাশ রায় বলেন, সার ও অন্যান্য উপকরণের দাম এমনিতেই বেশি। এর ওপর ডিজেলের দাম বাড়ায় সেচ, জমি প্রস্তুত, মাড়াই ও পরিবহণে খরচ বাড়বে। আলমপুর ইউনিয়নের কৃষক মোকলেছার রহমান বলেন, বোরো মৌসুমে সেচের ওপর নির্ভরতা বেশি হওয়ায় তখন সমস্যা আরও বাড়বে।

জয়পুরহাট : আমনসহ অন্যান্য ফসলের উৎপাদন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা করছেন জেলার কৃষকরা। ডিজেলচালিত শ্যালো ও গভীর নলকূপে সেচের খরচের পাশাপাশি ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার ও মাড়াইযন্ত্রের ভাড়াও বাড়ছে বলে তারা জানিয়েছেন। কৃষকদের দাবি, সেচে ব্যবহৃত ডিজেলে বিশেষ প্রণোদনা ও ভর্তুকি দেওয়া হোক।

সাঘাটা (গাইবান্ধা) : সার সংকট ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে বাংলাদেশ কৃষক সমিতি বিক্ষোভ করেছে। বুধবার গাইবান্ধা শহরের গানাসাস মার্কেটের সামনে সমাবেশ শেষে মিছিল বের করা হয়। বক্তারা সার সরবরাহ নিশ্চিত, নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রি, কৃষক হয়রানি বন্ধ এবং জ্বালানি তেলের দাম কমানোর দাবি জানান।

জেলায় প্রায় ১৩ হাজার ৫৬০টি ডিজেলচালিত সেচপাম্প রয়েছে। সাঘাটার কৃষক আফতাব হোসেন বলেন, পাঁচ বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছেন এবং তার সব জমিই মেশিনচালিত সেচপাম্পের আওতায়। ডিজেলের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচও বাড়বে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ আসাদুজ্জামান বলেন, ডিজেলচালিত সেচপাম্পগুলোর ওপর বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে, যাতে কৃষকদের উৎপাদনে বড় ধরনের ক্ষতি না হয়।

রাজারহাট (কুড়িগ্রাম) : রাজারহাট উপজেলার চর বিদ্যানন্দে সেচের একমাত্র ভরসা শ্যালো মেশিন। বিদ্যুৎ ও বৈদ্যুতিক মোটর না থাকায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বিপাকে পড়েছেন কৃষক। এরই মধ্যে আমন ধানে শীষ আসতে শুরু করায় ফসল নিয়ে দুশ্চিন্তা বেড়েছে তাদের।

চর বিদ্যানন্দ গ্রামের কৃষক মনসুর আলী বলেন, ‘চরের জমি যেখানে সেখানে বিদ্যুৎ নাই, মোটর নাই। শ্যালো মেশিনই একমাত্র ভরসা। পকেটে টাকা নাই, তাই মেশিন বাড়িতে এনে রাখছি।’ তার হিসাবে, প্রতি আমন মৌসুমে প্রায় এক ব্যারেল ডিজেল লাগে। এক ব্যারেলে প্রায় ১৫৯ লিটার তেল ধরে। আগে লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা দরে এক ব্যারেলের দাম পড়ত ১৮ হাজার ২৮৫ টাকা। এখন ১৩৫ টাকা দরে দাম দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১ হাজার ৪৬৫ টাকা। অর্থাৎ এক ব্যারেলেই বাড়তি খরচ ৩ হাজার ১৮০ টাকা।