মাদক কেনার টাকা না দেওয়ায় মা-বাবাকে মারধর, দা-চাকু নিয়ে ভয় দেখানো, আবার কোথাও মাদক কারবারিদের বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ। ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় মাদকের বিস্তার এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, ঘরে ঘরে অশান্তিরও কারণ হয়ে উঠেছে। মাদকাসক্ত সন্তানের নির্যাতন থেকে বাঁচতে সন্তানকে পুলিশের হাতে তুলে দিচ্ছেন অভিভাবকেরা। আর মাদক কারবার ঠেকাতে কোথাও কোথাও আইন নিজের হাতে তুলে নিতে বাধ্য হচ্ছেন স্থানীয়রা। পুলিশ ও প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার পরও মাদকের বিস্তার পুরোপুরি থামছে না।
ফুলবাড়িয়া থানার তথ্য অনুযায়ী, গত চার মাসে মাদকসহ ৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ৪৫টি মামলা হয়েছে। একই সময়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৩১ জন মাদক সেবনকারী ও কারবারিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও জরিমানা করা হয়েছে। মে মাসে ১৩ মামলায় ২৩ জন, জুনে ১৩ মামলায় ১৫ জন, জুলাইয়ে ১০ মামলায় ১০ জন এবং আগস্টে ৭ মামলায় ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। চলতি সেপ্টেম্বরের ৪ তারিখ পর্যন্ত দুটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন চারজন।
মাদকাসক্ত সন্তানের নির্যাতনের এমন একটি ঘটনা ঘটেছে উপজেলার পুটিজানা গ্রামে। গত রবিবার সন্ধ্যায় গ্রামের এক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, তার স্ত্রী ও মেয়ে ফুলবাড়িয়া প্রেস ক্লাবে এসে তাদের মাদকাসক্ত ছেলের নির্যাতনের কথা জানান। তাদের ভাষ্য, মেজো ছেলে সুজন উচ্চশিক্ষিত হলেও মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছেন। মাদক কেনার টাকা না দিলে তিনি মা-বাবাকে মারধর করেন এবং দা-চাকু নিয়ে ভয় দেখান। এ অবস্থায় নিরাপত্তার জন্য প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছে পরিবারটি।
মৌহাতলা গ্রামের খাইরুল ইসলাম বললেন, ‘মাদকের টাকার জন্য নিজের ছেলে যে পরিমাণ নির্যাতন করেছে, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। অসহ্য হয়ে তাকে ইয়াবা সেবনরত অবস্থায় ধরে ইউএনওকে খবর দিয়েছি।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফুলবাড়িয়ার সীমান্তবর্তী মধুপুর, ঘাটাইল, ময়মনসিংহ সদর ও মুক্তাগাছা উপজেলা হয়ে মাদক ঢোকার অভিযোগ রয়েছে। এসব এলাকায় ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইনসহ বিভিন্ন মাদক বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, উঠতি বয়সের তরুণ ও যুবকদের একটি অংশ মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।
মাদককে কেন্দ্র করে পারিবারিক নির্যাতনের আরও অভিযোগ রয়েছে। পুটিজানা ইউনিয়নের মৌহাতলা গ্রামের তানভীর হাসান (১৮) এবং বালিয়ান ইউনিয়নের বালাশ্বর গ্রামের মীর মো. শহীদুর রহমানের (২৩) বিরুদ্ধে মাদকের টাকা চেয়ে পরিবারের সদস্যদের নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। পরে তাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেন পরিবারের সদস্যরা।
মাদককে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে। গত ২৪ জুলাই রাতে উপজেলার সোয়াইতপুর গ্রামে কাস্টমসের সিপাহি আবু রায়হান তালুকদার (৪৫) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রাজু (২২) ও জিতুল (১৯) নামের দুই তরুণের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। পুলিশ পরে তাদের শ্রীমঙ্গল উপজেলা থেকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ জানিয়েছে, ওই দুজন মাদকাসক্ত ছিলেন।
এদিকে চান্দের বাজার, কুশমাইল, কড়ইতলা ও দেওনাইপাড়সহ কয়েকটি এলাকায় মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে উঠছে। গত ২৯ জুন রাতে স্থানীয় লোকজন মাদক কারবারের অভিযোগে কয়েকজনের বাড়িঘরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন। তবে এসব ঘটনায় আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
নাওগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. ইউসুব আলী বললেন, ‘গ্রামে মাদকের বিস্তার বাড়ছে। বিশেষ করে কিশোর ও উঠতি বয়সের তরুণদের একটি অংশ এতে জড়িয়ে পড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সামাজিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত চার মাসে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম সোহাগ ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) শেখ তাকী তাজওয়ার পৃথক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। এতে ৩১ মাদক সেবনকারী ও কারবারিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও জরিমানা করা হয়।
ফুলবাড়িয়া থানার ওসি মোহা. রাশেদুল হাসান বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। গত চার মাসে ৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করে ৪৫টি মামলা করা হয়েছে। অভিযানের কারণে মাদকের বিস্তার আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম সোহাগ জানান, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সন্ধ্যার পর বিভিন্ন ইউনিয়নে আনসার সদস্যদের নিয়ে টহল দেওয়া হয়। পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি, মসজিদের ইমাম ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে সচেতনতামূলক সভা করা হচ্ছে। তার দাবি, এসব উদ্যোগে মাদকের ভয়াবহতা কিছুটা কমেছে।