রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একই সঙ্গে হাম ও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে পাঁচ বছরের নাফিয়া। পাঁচ দিন জ্বরে ভোগার পর তাকে হাসপাতালে আনা হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় চিকিৎসা চলছে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে। শিশুটির হৃদযন্ত্রেও সমস্যা রয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবার। হাম ও ডেঙ্গু-দুই ভিন্ন রোগ। একটি ছড়ায় মূলত আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি ও বাতাসের মাধ্যমে, অন্যটি ছড়ায় এডিস মশার কামড়ে। কিন্তু দেশে এখন এমন ঘটনাও সামনে আসছে, যেখানে একই শিশু একই সময়ে দুই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন শিশুর শারীরিক দুর্বলতা বাড়ছে, অন্যদিকে জটিলতা সামাল দিতে চিকিৎসকদেরও বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে।
এর আগে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ছয় মাস বয়সি ফারিস্তা নূরের শরীরেও একই সঙ্গে হাম ও ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। চিকিৎসকেরা শিশুটিকে বিশেষ নজরদারিতে রাখেন এবং শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রের প্রস্তুতিও রাখা হয়েছিল।
হাম কমলেও ঝুঁকি কাটেনি : চলতি বছর দেশে হামের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়েই দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতে হামের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছিল। তখন শনাক্ত হওয়া আক্রান্তদের ৭৯ শতাংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু। পরবর্তী সময়ে টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে সংক্রমণ কমানোর চেষ্টা করা হলেও ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। ২২ সেপ্টেম্বর হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে দুজন মারা গেছেন। এ নিয়ে গত মার্চ থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৯৬৪ জন, নিশ্চিত হামে মারা গেছে ১০১ জন।
একই সময়ে বাড়ছে ডেঙ্গুও : হামের পাশাপাশি এখন ডেঙ্গুর মৌসুমও চলছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২২ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় (গত সোমবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা) দেশে ১ হাজার ৮৭২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং মারা গেছে ৫ জন। মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ২ জন ঢাকা উত্তর সিটি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি এলাকার হাসপাতালে মারা গেছে। বাকি ১ জন বরিশাল বিভাগ এবং ২ জন রাজশাহী বিভাগের হাসপাতালে মারা গেছে। এ নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৬৫ হাজার ৪৯৯ জন, মারা গেছে ১৯৫ জন।
নতুন আক্রান্তদের মধ্যে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত ৮৯ শিশু এবং ৬ থেকে ১০ বছর বয়সি ৯৪ শিশু রয়েছে। একই সময়ে ১১ থেকে ১৫ বছর বয়সি আক্রান্ত হয়েছে ১১২ জন। ফলে একই সময়ে শিশুরা দুই ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ছে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, হামের জটিলতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায় পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে।
হাম হলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় : শিশুর শরীরে হাম হওয়ার পর শুধু জ্বর ও শরীরে ফুসকুড়িই হয় না; রোগটি শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকেও দুর্বল করে দিতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হাম সংক্রমণের পর কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত অন্য সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিরোধক্ষমতা কমে থাকতে পারে। এর ফলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়াসহ অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। এ কারণে হামে আক্রান্ত শিশুর একই সময়ে ডেঙ্গু হলে তার শারীরিক অবস্থা আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হতে পারে। তবে হাম ও ডেঙ্গু একে অপরের কারণ নয়-দুটি সম্পূর্ণ আলাদা সংক্রমণ। একটি ভাইরাসজনিত এবং প্রধানত বায়ুবাহিত; অন্যটি এডিস মশাবাহিত।
ডেঙ্গুতেও শিশুদের বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন : ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে জ্বর কমে গেলেই যে বিপদ কেটে গেছে, এমন নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ডেঙ্গুর গুরুতর পর্যায় সাধারণত অসুস্থতার তৃতীয় থেকে সপ্তম দিনের মধ্যে দেখা দিতে পারে। প্রচণ্ড পেটব্যথা, বারবার বমি, দ্রুত শ্বাস নেওয়া, মাড়ি বা নাক দিয়ে রক্তপাত, অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্থিরতা, রক্তবমি বা পায়খানায় রক্ত এবং শরীর ঠান্ডা ও ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া সতর্কসংকেত। এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হয়।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, একই সময়ে দেশে হাম ও ডেঙ্গু-দুটি সংক্রমণ চলায় শিশুদের জন্য ঝুঁকির নতুন মাত্রা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অপুষ্ট শিশু, পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু, টিকা না পাওয়া শিশু এবং অন্য কোনো শারীরিক জটিলতা থাকা শিশুদের বাড়তি নজরদারির প্রয়োজন। তাই হাসপাতালে হাম ও ডেঙ্গু রোগীর পৃথক ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত শিশু শয্যা, অক্সিজেন ও নিবিড় পরিচর্যার প্রস্তুতি, দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং আক্রান্ত শিশুদের মশারি ব্যবহারের ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি হয়ে উঠেছে। হাসপাতালে যেন মশা ঢুকতে না পারে, এজন্য জাল দিয়ে ঘিরতে হবে এবং পরিচ্ছন্নতা জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে অভিভাবকদের সচেতনতা এবং শিশুদের টিকাদান নিশ্চিত করাও এই দ্বৈত সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ।