Image description

কারখানা বন্ধ। উৎপাদন নেই। আয় নেই, ব্যবসাও নেই। কোথাও বছরের পর বছর কোম্পানির কার্যক্রম বন্ধ। অথচ শেয়ারবাজারে এসব কোম্পানির শেয়ার দিব্যি হাতবদল হচ্ছে। এমনকি কোনো কোনো বন্ধ কোম্পানির শেয়ার দরও অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। উৎপাদন বন্ধ কোম্পানির কারণে স্থিতিশীল হচ্ছে না শেয়ারবাজারও। এসব কোম্পানির ১০ টাকার শেয়ার দর কখনো কখনো ৫০০/৬০০ টাকার বেশি উঠে যায়। কীভাবে বা কেন এত দাম উঠে যায় তা কেউ জানে না। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের প্রলুব্ধ করে এভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করছে একটি চক্র। কর্তৃপক্ষ এমন অনিয়ম দেখেও কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন,  এভাবে কোনো বন্ধ কোম্পানি বছরের পর বছর বাজারে তালিকাভুক্ত থাকতে পারে। যারা এই বাজারে লুটপাটের সঙ্গে জড়িত তাদের কারণের ডিলিস্ট করছে না স্টক এক্সচেঞ্জ।

বন্ধ কোম্পানির শেয়ারে দাপট : ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ৩০টি বন্ধ বা অকার্যকর কোম্পানির একটি তালিকা প্রকাশ করে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করেছিল। ডিএসইর তালিকায় থাকা কোম্পানিগুলোর মধ্যে ছিল অ্যাক্টিভ ফাইন, এএফসি এগ্রো, অ্যাপোলো ইস্পাত, অ্যারামিটি সিমেন্ট, আজিজ পাইপস, বারাকা পাওয়ার, বিডি ওয়েল্ডিং, দুলামিয়া কটন, এমারেল্ড অয়েল, ফ্যামিলি টেক্স, ফু-ওয়াং ফুড, জিবিবি পাওয়ার, জেনারেশননেক্সট, হামিদ ফেব্রিকস, কেপিসিএল, কেপিপিএল, মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক, মেট্রো স্পিনিং, মিথুন নিটিং, নিউলাইন ক্লোথিং, নর্দার্ন জুট, নুরানী ডাইয়িং, প্যাসিফিক ডেনিমস, প্রাইম টেক্সটাইল, রহিমা ফুড, আরএসআরএম স্টিল, রিজেন্ট টেক্সটাইল, সালাম সিআরএসটি, সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ, স্ট্যান্ডার্ড সিরামিক, তুং হাই নিটিং, ইয়াকিন পলিমার ও জাহিন স্পিনিং। চলতি বছরের বন্ধ হয়েছে একাধিক কোম্পানি। এর মধ্যে রয়েছে, এসএস স্টিল, আলিফ ম্যানুফ্যাকচার। সম্প্রতি বন্ধ হয়ে গেছে লিবরা ইনফিউশন।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অকার্যকর বন্ধ কোম্পানির শেয়ারও দরবৃদ্ধির তালিকায় উঠে আসছে। এর মধ্যে লিবরা ইনফিউশন গত জানুয়ারি থেকে বন্ধ হয়ে গেলেও প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার দর লেনদেন হচ্ছে ৬০০ টাকার কাছাকাছি। কেন কোন জাদুতে একটি বন্ধ কোম্পানির শেয়ার দর এত বেশি হয় কেউ বলতে পারে না। অ্যাপোলো ইস্পাত ২০১৩ তালিকাভুক্ত হওয়ার পর দুই থেকে তিন বছর পরই বন্ধ হয়ে যায়। কোম্পানিটি তালিকাভুক্তির সময় নানা প্রশ্ন উঠে এর সক্ষমতা নিয়ে। ২০১৬ সালের পর কোনো ডিভিডেন্ড না দেওয়া কোম্পানিটি এখনো লেনদেন হচ্ছে বাজারে। আরামিট সিমেন্ট ২০২৩ সাল থেকে বন্ধ। তবুও ১১-১২ টাকায় লেনদেন হচ্ছে।

২০২৬ সালের আগস্টের দরবৃদ্ধির তালিকায় শীর্ষে ছিল তুং হাই নিটিং অ্যান্ড ডাইং। এক মাসে কোম্পানিটির শেয়ারদর ৫৩ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে জিবিবি পাওয়ারের দর বেড়েছে ৫০ শতাংশ। ডিএসইর হিসেবে উভয় কোম্পানিই বন্ধ বা অকার্যকর কোম্পানির তালিকায় রয়েছে। তুং হাই ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে এবং জিবিবি পাওয়ার ২০২৩ সালের জুন থেকে অকার্যকর। অ্যামারেল্ড অয়েল ২০১৪ সালের তালিকাভুক্তির পর অধিকাংশ সময় বন্ধ ছিল। ২০২২ সালে চূড়ান্তভাবে বন্ধ হওয়ার পর আর চালু হয়নি প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু কয়েকদিন পরপর এই কোম্পানির শেয়ার উঠে দর বৃদ্ধি শীর্ষে। 

সর্বশেষ ২৭ টাকায় লেনদেন হওয়া কোম্পানির দর কোন জাদুবলে বাড়ে কেউ জানে না। এভাবেই প্রতিদিন লেনদেন হচ্ছে শেয়ারবাজারে আজিজ পাইপস, বারাকা পাওয়ার, দুলামিয়া কটন, এমেরাল্ড অয়েল, ফ্যামিলিটেক্স, জিবিবি পাওয়ার, জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশনস, খুলনা পাওয়ার, খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং, মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক, মেঘনা পিইটি, মেট্রো স্পিনিং, নিউলাইন ক্লথিংস, নর্দার্ন জুট, নূরানি ডাইং, প্রাইম টেক্সটাইল, আরএসআরএম, রিজেন্ট টেক্সটাইল, স্ট্যান্ডার্ড সিরামিক, তুং হাই নিটিং, ইয়াকিন পলিমার ও জাহিন স্পিনিংসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।

ব্যবসা বন্ধ, দর বাড়ার যুক্তি কী? : কোম্পানির ব্যবসা বন্ধ, উৎপাদন বন্ধ, আয় সৃষ্টি হচ্ছে না, সেই কোম্পানির শেয়ারদর হঠাৎ লাফিয়ে বাড়ছে কেন? জিবিবি পাওয়ারের ক্ষেত্রেই বিষয়টি স্পষ্ট। কোম্পানিটির বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে। অস্বাভাবিক দর ও লেনদেন বৃদ্ধির বিষয়ে কোম্পানিটি ডিএসইকে জানিয়েছিল, এ ধরনের দরবৃদ্ধি ব্যাখ্যা করার মতো কোনো অপ্রকাশিত মূল্যসংবেদনশীল তথ্য তাদের কাছে নেই। তাহলে তথ্য ছাড়া দর বাড়ছে কীভাবে-এই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে উঠছে।

গুজবই মৌলভিত্তি : শেয়ারবাজারে একটি কোম্পানির দর বাড়ানোর গুজব তৈরি করে বলা হয়, শেয়ারবাজার কারসাজি চক্র এই বন্ধ কোম্পানি নিয়েই নানা গুজব অপতথ্য ছড়িয়ে হাতিয়ে নেয় হাজার হাজার কোটি টাকা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিনিয়োগকারী গ্রুপ ও বাজারের বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে নানা ধরনের তথ্য। কোম্পানি আবার চালু হবে, নতুন বিনিয়োগকারী আসবে, মালিকানা বদল হবে, সম্পদ বিক্রি করে বিপুল অর্থ পাওয়া যাবে-এমন নানা গুঞ্জনকে কেন্দ্র করে বাড়ছে শেয়ার কেনাবেচা। এরপর দর বাড়ছে।

নিয়ন্ত্রকের নজরদারিতেও প্রশ্ন : বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান বাজার কারসাজি, ইনসাইডার ট্রেডিং, সার্কুলার ট্রেডিং, ওয়াশ ট্রেড ও ‘পাম্প অ্যান্ড ডাম্প’ ধরনের কর্মকাণ্ড দ্রুত শনাক্ত করার জন্য সমন্বিত রিয়েল-টাইম নজরদারির কথা বলেছেন। কোনো বন্ধ কোম্পানির শেয়ার যদি হঠাৎ বাজারের শীর্ষ দরবৃদ্ধিকারীদের তালিকায় চলে আসে। একই সঙ্গে লেনদেন ও ক্রয়চাপ বেড়ে যায়। তাহলে তার পেছনে থাকা বিনিয়োগকারী, লেনদেনের ধরন এবং গুজবের উৎস অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। তবে এ কথার পরেও থেমে নেই কারসাজি চক্র। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বাজার কারসাজি শনাক্ত ও দমন করার দায়িত্ব নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং স্টক এক্সচেঞ্জের ওপর। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ উদাসীন থাকছে বছরের পর বছর।

ভূতুড়ে কোম্পানি, জীবন্ত শেয়ার : তালিকাভুক্ত কোম্পানির ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলেও তার শেয়ার বাজারে থেকে যাওয়ার ফলে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত বাস্তবতা-কোম্পানি কার্যত মৃত, কিন্তু শেয়ার জীবন্ত। ডিএসইর ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে ৫১টি তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক তথ্য প্রকাশ না করার বিষয়টি উঠে এসেছে। এর মধ্যে ২০টি কোম্পানির কার্যক্রম ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীর হাতে কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থার পর্যাপ্ত তথ্য না থাকলেও শেয়ার কেনাবেচা চলতে পারে। আর তথ্যের ঘাটতিই গুজব ছড়ানোর সবচেয়ে উর্বর ক্ষেত্র।

জানতে চাইলে শেয়ারবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বন্ধ কোম্পানি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করে একটি সুন্দর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। যে কোম্পানির কারখানা বন্ধ, ব্যবসা বন্ধ, আয় নেই-তার শেয়ার কেন প্রতিদিন লেনদেন হবে? কেন তার দর হঠাৎ বাড়বে? কারা সেই শেয়ার কিনছে? কারা বিক্রি করছে? দর বাড়ার আগে কোনো গুজব ছড়ানো হয়েছিল কি না? একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পরস্পরের মধ্যে শেয়ার হাতবদল করছে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই এখন জরুরি।

জানতে চাইলে ডিএসই পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বন্ধ কোম্পানির কারণে শেয়ারবাজার বড় রকমের সংকট। আমাদের অসহায়ত্ব আছে। বর্তমান যে সংকট তার জন্য বেশির ভাগই দায়ী এই বন্ধ কোম্পানি। একদিকে  বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সারা বিশ্বের আইন, কয়েক বছর বন্ধ থাকলে অটোমেটিক ডিলিস্ট হয়ে যাবে কোম্পানি।

বাংলাদেশে উল্টোটা ঘটছে। দুর্বল নিয়ন্ত্রক সংস্থা কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। তিনি আরও বলেন, কোনো কিছু পচে গেলে সেটা যেমন ঘরে রাখা যায় না। পুরো পরিবেশ নষ্ট করে বন্ধ কোম্পানিও আমাদের শেয়ারবাজারকে নষ্ট করছে। এখন এই বন্ধ কোম্পানি নিয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। আইনগত নীতিমালা তৈরি করে বাজার থেকে এসব কোম্পানি ডিলিস্ট করা দরকার।