সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি সিলেট নগর পুলিশ। রায়নগরে ট্রিপল মার্ডারের ঘটনায় শুধুমাত্র বাবুলেই বন্দি ছিল কার্যক্রম। বাবুল একেক সময় একেক কথা বলেছে। প্রথমে বলেছিল প্রেম, পরে বলেছিল টাকার জন্য ওই ফ্ল্যাটে গিয়ে তিন খুন করেছে। মামলার এজাহারকে তেমন আমলে নেয়নি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে শেষে নগর পুলিশ তদন্তভার পিবিআইয়ের হাতে ন্যস্ত করে দিয়েছে। গত সপ্তাহে আলোচিত এ মামলাটি হস্তান্তর করা হয় পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন- পিবিআইয়ের হাতে। নড়েচড়ে বসেছে পিবিআই। নথি পর্যালোচনার পর নতুন করে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে। হাতে আছে একমাত্র আসামি বাবুল মিয়া। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চায় পিবিআই।
এজন্য মঙ্গলবার সিলেটের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ফারহানা সুলতানার আদালতে পিবিআইয়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়। এর আগে পিবিআই পাঁচদিনের রিমান্ড আবেদন করলেও শুনানি শেষে আদালত দুইদিন মঞ্জুর করেন। পিবিআইয়ের পক্ষে মামলার তদন্তকারী ওসি মো. মুরসালিন আদালতে এ আবেদন করেছিলেন। পিবিআই সিলেটের পুলিশ সুপার মো. শাহাদাত হোসেন মানবজমিনকে জানিয়েছেন- আদালত বাবুল মিয়ার দু’দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। তবে তাকে এখনো রিমান্ডে আনা হয়নি। আদালতের অর্ডার কপি হাতে পেলে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তিনি বলেন- হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, আসামির পূর্বের বক্তব্যের সত্যতা এবং ঘটনায় অন্য কারও সম্পৃক্ততা আছে কিনা এসব বিষয়ে পিবিআইয়ের তরফ থেকে অনুসন্ধান করা হচ্ছে। সিলেটের রায়নগরের মিতালী আবাসিক এলাকার নিকুঞ্জ ভিলার বাসিন্দা ছিলেন আব্দুস সাত্তার।
তিনি নগরের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। পরিচিত মুখ। ১২ই আগস্ট সকালে নিজ বাসার দু’তলার ফ্ল্যাটে স্ত্রী সুরাইয়া বেগম, গৃহকর্মী তাহমিনাসহ খুন হন তিনি। সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যে ঘাতকরা বাসায় ঢুকে তাদের খুন করে বেলকনী দিয়ে পালিয়ে যায়। ঘটনার পর পুলিশ প্রযুক্তির মাধ্যমে অনুসন্ধান ও সিসি টিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে একই এলাকার বাসিন্দা রংমিস্ত্রি বাবুল মিয়াকে খুনের ঘটনায় চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করে। আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল মিয়া ট্রিপল মার্ডারের দায় স্বীকার করে। পুলিশকে জানিয়েছিল; গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে প্রেমের সূত্র ধরে সে একাই তিনজনকে খুন করেছে। প্রথম দফা জিজ্ঞাসাবাদে সে এই তথ্য দেয়ার পর নিহত আব্দুস সাত্তারের পরিবারের সদস্যরা এ নিয়ে আপত্তি জানান। বাবুলের এ বক্তব্য নিয়ে তারা প্রশ্ন তোলেন। পরবর্তী সময়ে পুলিশ বাবুলকে চারদিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করে। এ জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল কথা ঘুরিয়ে ফেলে। জানায়- টাকার জন্য সে ওই বাসাতে গিয়ে একাই তিনজনকে খুন করেছে। ওই বাসা থেকে লুট করা টাকা সে বাসার মালিকের কাছে দিয়েছে।
এ ব্যাপারে কিছুটা সত্যতা মিলেছে। বাসার কেয়ারটেকার ঘটনার পর গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন বিকালে এসে বাবুল ভাড়া বাবদ ১৫ হাজার টাকা পরিশোধ করেছে। তবে নিহতদের পরিবার আলোচিত এ ঘটনায় বাবুলকে কোনো দোষী সাব্যস্ত করেনি। তারা অজ্ঞাত আসামি রেখে মামলার এজাহার দাখিল করেন। পরবর্তীতে পুলিশ ওই এজাহারকে মামলা হিসেবে গ্রহণ করে। সেখানে তারা জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে সিরাজুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে দ্বন্দ্বের বিষয়টি তুলে ধরেন। মামলার বাদী, নিহতদের মেয়ে সেলিনা সুলতানা পরে একাধিকবার আলোচিত এ ঘটনার নেপথ্যে কারণ খুঁজে বের করতে পুলিশের কাছে অনুরোধ করেন। তারা বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও আলোচিত এ ঘটনার সঠিক তদন্তের জন্য পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন।
মামলার তদন্ত শুধুমাত্র বাবুলেই আবদ্ধ রাখে সিলেট মহানগর পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ২০শে ডিসেম্বর বাবুল নিজের দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। গত সপ্তাহে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন-পিবিআইয়ের হাতে যাওয়ার পর তদন্ত কর্মকর্তা আলোচিত এ মামলাটি নিয়ে নতুন করে তদন্ত শুরু করেছেন। নগর পুলিশের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে পিবিআইয়ের কাছে সব নথি হস্তান্তর করেছে। পিবিআইয়ের তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছেন- মামলাটি আলোচিত। ফলে তদন্তকাজ শুরু করা হয়েছে। রহস্য উদ্ঘাটনে ফের বাবুলকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করবে। এ জন্য রিমান্ড চাওয়া হয়েছে। তিনি বলেন- পরিবার যা সন্দেহ করছে সেটি নিয়ে তদন্ত চলছে। ঘটনার সঙ্গে আরও যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে পুলিশ পিবিআই সবাইকে আইনের আওতায় নিয়ে আসবে বলে জানান তিনি।