Image description

এপ্রিলে ঢাকায় ৩৭০ কোটি মার্কিন ডলারে ১৪টি বোয়িং কেনার চুক্তি করেছিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। ছয় মাসের মাথায় আরও ১১টি বোয়িং কেনার ঐতিহাসিক চুক্তি করতে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। নতুন পুরাতন মিলিয়ে রাষ্ট্রীয় পতাকা বহনকারী প্রতিষ্ঠানটির বহর হবে রেকর্ড ৪৭টির। তবে এবারের ঐতিহাসিক চুক্তি হবে নিউ ইয়র্কে। হাই লেভেল নেগোসিয়েশন কমিটির সবুজ সংকেতের পর সরকার এই বিশাল কেনাকাটার সব প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেছে। এর প্রথম ধাপ হিসেবে বুধবার নিউ ইয়র্কে বোয়িংয়ের সঙ্গে ১১টি অতিরিক্ত উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি সই হতে যাচ্ছে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে নিউ ইয়র্ক সময় বিকাল ৪টা ১৫ মিনিটে একটি হোটেলে এই চুক্তি সই অনুষ্ঠান হবে। বিমানের পক্ষে চুক্তি স্বাক্ষর করবেন বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে চুক্তির সাক্ষী হবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উপস্থিত থাকবেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। চুক্তির পর পরই বোয়িং গ্লোবাল প্রেসিডেন্ট ড. ব্রেন্ডন নেলসন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে এই চুক্তি শুধু বাণিজ্যিক নয়, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।

বিমান সূত্রে জানা গেছে, নতুন ১১টি বোয়িংয়ের মডেল, মূল্য ও অর্থায়ন কাঠামো এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। এটি গত ৩০শে এপ্রিলের চুক্তিরই সম্প্রসারণ। কারণ বিমান তখন ১৪টি বোয়িং কেনার চুক্তি করেছিল। ওই প্যাকেজে ছিল ৮টি অত্যাধুনিক ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, ২টি ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং ৪টি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স। যার ডেলিভারি শুরু হবে ২০৩১ সালের নভেম্বর থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে। নতুন ১১টি যোগ হলে বোয়িংয়ের সঙ্গে বিমানের মোট অর্ডার দাঁড়াবে ২৫টিতে। অন্যদিকে ১০টি এয়ারবাস কেনার লক্ষ্যে গঠিত কারিগরি-আর্থিক কমিটি গত ৩১শে আগস্ট তাদের প্রতিবেদন বোর্ডে জমা দিয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৪টি ওয়াইডবডি এ৩৫০-৯০০ এবং ৬টি ন্যারোবডি এ৩২১ নিও কেনা হচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি সেপ্টেম্বরের শেষে বা অক্টোবরের শুরুতেই এয়ারবাসের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর হবে। বর্তমানে বিমানের বহরে মাত্র ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে। নতুন ৩৫টি যুক্ত হলে এবং পুরনো উড়োজাহাজ প্রতিস্থাপনের পর ২০৩৫ সাল নাগাদ বিমানের মোট বহর দাঁড়াবে ৪৭টিতে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের এই বিশাল কেনাকাটার পেছনে ভূ-রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক কৌশল রয়েছে। গত ৩০শে আগস্ট দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোর জানান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে একটি ‘অবিশ্বাস্য নতুন চুক্তি’ হয়েছে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ বোয়িংয়ের অর্ডার ব্যাপক বাড়াচ্ছে। পরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজে সেই পোস্ট শেয়ার করে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখে প্রশংসা করেন। বিমান সূত্রমতে, ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য শুল্ক (ট্যারিফ) চাপ কমানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাসের কৌশল হিসেবেই বোয়িং থেকে এই বিশাল ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। গত সপ্তাহে বিমানমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত বৃটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক। বৈঠকে এয়ারবাস ক্রয় প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। মন্ত্রী জানান, বিমানের বহরে স্বল্পতা দূর করতে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বজায় রেখেই এই কেনাকাটা করা হচ্ছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকাকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়তে এই আধুনিকায়ন ইতিবাচক। তবে এভিয়েশন বিশ্লেষকদের উদ্বেগও রয়েছে। আইএটিএ’র তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক রুটের বাজারের ৭৫ শতাংশই বিদেশি এয়ারলাইন্সের দখলে, দেশীয় সংস্থার হাতে মাত্র ২৫ শতাংশ। এই প্রতিযোগিতার বাজারে কোনো সমন্বিত ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ছাড়া ৪৭টি উড়োজাহাজের বিশাল বহর কীভাবে লাভজনকভাবে চলবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শত শত কোটি ডলারের এই খরচের কতোটুকু বিমানের নিজস্ব তহবিল থেকে আসবে এবং কতোটুকু সরকারি গ্যারান্টিতে বাণিজ্যিক ঋণ থেকে আসবে তারও কোনো স্পষ্ট রূপরেখা এখনো মেলেনি। বিশাল বহর চালাতে যে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক, দক্ষ রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত পাইলট ও প্রকৌশল সক্ষমতা প্রয়োজন- তা বিমানের আছে কিনা, তা স্পষ্ট নয়। বিশ্লেষকদের মতে, দূরদর্শী ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া শুধু উড়োজাহাজ কেনা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঋণের ফাঁদ বা আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।