Image description

সাভারের আশুলিয়ায় প্রীতি কম্পোজিট লিমিটেড কারখানার সামনে রোববার সন্ধ্যায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে সাতজন নিহত হওয়ার ঘটনা নিছক দুর্ঘটনা নয়। মেয়াদোত্তীর্ণ ও অকেজো সিলিন্ডারের অবৈধ মজুতই এর মূল কারণ বলে অভিযোগ উঠেছে। কারখানা সূত্র জানিয়েছে, বয়লার চালানোর জন্য আগের রাতে ১১টি গাড়িতে অবৈধভাবে এসব সিএনজি ও এলপিজি সিলিন্ডার আনা হয়েছিল, যা আনলোড করার সময় ঘটে ভয়াবহ বিস্ফোরণ। এরপর ধ্বংসযজ্ঞের আলামত তড়িঘড়ি করে মুছে ফেলার অভিযোগ উঠেছে কারখানা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। তবে সোমবার কারখানা কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে জানায়, কারখানাসংলগ্ন বাইরের ১১ কেভি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ট্রান্সফার থেকে স্পার্ক এলপিজি সঞ্চালনব্যবস্থাকে প্রভাবিত করলে আগুনের সূত্রপাত হয়। তবে এ দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন পল্লীবিদ্যুৎ-১ কর্তৃপক্ষ। এদিকে বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে চার সদস্যের কমিটি করেছে ফায়ার সার্ভিস। ঘটনার পর থেকে এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। এ কারণে কারখানার সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

সোমবার সরেজমিন দেখা যায়, বিস্ফোরণে আশপাশের বিভিন্ন স্থাপনার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। গ্যাস সিলিন্ডারের টুকরার আঘাতে অন্তত ৩০টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর কারখানায় তিন দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এ সময় স্থানীয়রা জানান, বিস্ফোরণে সাতজন নিহত হয়েছেন। আর অর্ধশতাধিক মানুষ মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন। তারা এলাকার বিভিন্ন হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, তদন্ত কমিটি গঠন হওয়ার আগেই তড়িঘড়ি করে পরিচ্ছন্নতাকর্মী লাগিয়ে বিস্ফোরণের আলামত ধুয়ে-মুছে নষ্ট করে ফেলা হয়েছে।

কারখানার একটি সূত্র জানায়, বিস্ফোরণের আগে ১১টি গাড়িতে (কাভার্ডভ্যান) অবৈধভাবে সিএনজি ও এলপিজি সিলিন্ডার কারখানায় আনা হয়। সাভারের লালন সিএনজি পাম্প, হেমায়েতপুর এলপিজি গ্যাস স্টেশন, রেডিও কলোনি সারাহা ফিউল স্টেশন ও স্থানীয় আরও দুটি পাম্প থেকে এসব সিএনজি ও এলপিজি সংগ্রহ করা হয়।

সূত্র আরও জানায়, কারখানার বয়লার মেশিন চালাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এসব গ্যাস সিলিন্ডার আনা হয়েছিল। সিলিন্ডারগুলোর অধিকাংশই ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ। দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে সেগুলো প্রায় অকেজো হয়ে পড়েছিল। ফলে আনলোড করার সময় সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটে।

এ ব্যাপারে সাভার মডেল থানার ওসি সাইফুল আলম যুগান্তরকে বলেন, ‘সাভারের বিভিন্ন সিএনজি ও এলপিজি গ্যাস রাতে পাম্প থেকে ভরাট করা দণ্ডনীয় অপরাধ। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে এর শাস্তির বিধান আছে।’

সাভারের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বিস্ফোরক অধিদপ্তরের ২০১২ সালের একটি পরিপত্র অনুযায়ী ফুয়েল পাম্প স্টেশন থেকে ওপেনলি যাকে-তাকে এভাবে গ্যাস সরবরাহ করা যায় না। ওই পরিপত্রটি ফলো করলে কাখানার জন্য হিউজ পরিমাণ গ্যাস কেউ নিতে পারে না।’

কারখানা কর্তৃপক্ষের বিবৃতি ও পল্লীবিদ্যুতের বক্তব্য : কারখানা কর্তৃপক্ষ সোমবার স্বাক্ষরবিহীন একটি বিবৃতিতে গণমাধ্যমকে জানায়, প্রাথমিক ধারণা করা হচ্ছে, কারখানাসংলগ্ন বাইরের ১১ কেভি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ট্রান্সফার থেকে স্পার্ক এলপিজি সঞ্চালনব্যবস্থাকে প্রভাবিত করলে আগুনের সূত্রপাত হয়। তবে ঢাকা পল্লীবিদ্যুৎ-১-এর জেনারেল ম্যানেজার আখতারুজ্জামান লস্কর এ ধরনের বিবৃতিকে আজগুবি বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘কারখানা কর্তৃপক্ষ তাদের পিঠ বাঁচানোর জন্য এ ধরনের আজগুবি প্রচার চালাচ্ছে। ঘটনার পরপরই আমাদের ডিজিএম শাহীন কবীর ঘটনাস্থলে ছুটে যান। এ ঘটনা বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ধারে-কাছেও ঘটেনি।’

তদন্তে চার সদস্যের কমিটি : ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বিভাগের ডিজি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহিদ কামাল যুগান্তরকে জানান, ঘটনা তদন্তে সংস্থার সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামানের নেতৃত্বে ৪ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা তিন কার্যদিবস পর প্রতিবেদন জমা দেবেন।

পুলিশের বক্তব্য : পুলিশ জানায়, কারখানার সামনে একটি কাভার্ডভ্যানে রাখা সিলিন্ডারগুলো একে একে বিস্ফোরণ ঘটতে শুরু করে। এতে কাভার্ডভ্যানটিতে আগুন লেগে যায়। আগুন পাশে থাকা অন্যান্য গাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ওইসব গাড়িতে রাখা গ্যাস সিলিন্ডারগুলোর বিস্ফোরণ ঘটে। এ সময় অন্তত সাতজন নিহত হন। আহত হন অর্ধশত। হতাহতরা কারখানার শ্রমিক, আশপাশের সবজি বিক্রেতা ও পথচারী। পরে খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের বেশ কয়েকটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। অবশ্য রোববার রাতে পুলিশ জানিয়েছিল, বিস্ফোরণে সাতজন নিহত এবং ২৬ জন আহত হয়েছেন।

এদিকে এ ঘটনায় নিহতদের মধ্যে পুলিশ দুইজনের পরিচয় শনাক্ত করলেও ঢাকা মেডিকেল কলেজ সূত্র ধরে তিনজনের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। তাদের মধ্যে বুলবুল হেসেন (৪৫) ও নজরুল ইসলাম (৪২) কারখানার আশপাশে ফুটপাতের ব্যবসায়ী। অপরজনের নাম মোসাম্মাৎ জয়নব (৫৫)। তিনি একটি চা দোকানে দাঁড়ানো ছিলেন। জয়নব গাজীপুর কাশিমপুর এলাকার মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী। সোমবার সকালে পুলিশ তার লাশ ময়নাতদন্তের পর স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করে। অন্যদের লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রয়েছে।

হাসপাতালে এলজিআরডি মন্ত্রী : তেজগাঁও (ঢাকা) প্রতিনিধি জানান, আশুলিয়ায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে হতাহতদের খোঁজখবর নিতে সোমবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শন করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান। এ সময় তিনি নিহত নজরুল ইসলামের পরিবারের হাতে ৫০ হাজার টাকা তুলে দেন। তার সঙ্গে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ছিলেন।

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার এই কঠিন সময়ে নিহত ও আহতদের পরিবারের পাশে রয়েছে। আহতদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’