সারা দেশে একের পর এক নিখোঁজ শিশুর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় উদ্বেগ ও আতঙ্ক বেড়েছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে নিখোঁজ হওয়ার পর ২৯০ শিশুর অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ঘটেছে।
প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি বলে দাবি করেছে শিশু ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো। তারা সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছে।
চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজের ঘটনায় হৈচৈ শুরু হলে পুলিশ সদর দপ্তর নিখোঁজ শিশুদের তথ্য তুলে ধরে জানায়, ছোট শিশুরা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বাইরে গিয়ে পথ হারানো, নিজের নাম-ঠিকানা বলতে না পারা কিংবা একা বাড়ি ফেরার সময় অন্যত্র চলে যাওয়ার কারণে নিখোঁজ হয়।
তবে নিখোঁজের তথ্য পরবর্তী সময়ে হালনাগাদ না হওয়ায় পরিসংখ্যান নিয়েও বিভ্রান্তির আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে নিখোঁজ, উদ্ধার ও সর্বশেষ নিখোঁজ শিশুদের নিয়মিত হালনাগাদ জাতীয় তথ্যব্যবস্থা তৈরির দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সম্প্রতি কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর তার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি।
শিশু নিখোঁজের ঘটনা প্রতিবছর বাড়ছে বলে তিন বছরের পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।
আসকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময় হত্যা, ধর্ষণের পর হত্যা, শারীরিক ও পারিবারিক নির্যাতনসহ বিভিন্ন ঘটনায় ১৫৫ শিশু নিহত হয়। এর মধ্যে পারিবারিক পরিসরে নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গেছে ৪৯ শিশু এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ২৬ শিশুকে। ধর্ষণের চেষ্টার পর চারজনকে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া গুলিতে তিনজন, গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে শারীরিক নির্যাতনে দুজন, উত্ত্যক্তকারীর হাতে দুজন এবং অপহরণের পর একজন শিশু নিহত হয়েছে। এর বাইরে আত্মহত্যা, রহস্যজনক মৃত্যু ও মরদেহ উদ্ধারের ৯৯টি ঘটনা ঘটে।
আসকের নির্বাহী পরিচালক তাহসিনা রহমান জানান, গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ওপর ভিত্তি করে ওই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এখানে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে—নিখোঁজ শিশুরা লাশ হয়ে ফিরে আসছে। তাই নিখোঁজ হওয়ার পর কোনো শিশুর লাশ উদ্ধারকে সাধারণ বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শিশুটি কিভাবে নিখোঁজ হলো, তাকে উদ্ধারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী থেকে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, সেখানে কোনো ধরনের অবহেলা বা সমন্বয়হীনতা ছিল কি না এবং কারা এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত, সে বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখতে হবে। দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, অতীতের চেয়ে দেশে শিশুর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর পাবনা সদরে ১০ বছরের একটি শিশু নিখোঁজ হয়। সাত দিন পর ১৬ সেপ্টেম্বর একটি ডোবা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। জামালপুরের মাদারগঞ্জে সাত বছর বয়সী এক শিশু ১০ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয়ে যাওয়ার পর আর বাড়ি ফেরেনি। দুই দিন পর সহপাঠীর বাড়ির মেঝেতে মাটিচাপা দেওয়া অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ওই দুটি শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। এ ছাড়া লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে ২৫ জুন একটি ভাড়া বাসায় ঢুকে এক পরিবারের মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। রংপুরের বদরগঞ্জে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সঙ্গে ১২ বছরের ছেলে আয়ুশও হত্যার শিকার হয়। সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে ১৮ সেপ্টেম্বর একই পরিবারের ১০, সাত ও দুই বছর বয়সী তিন শিশুকে হত্যা করা হয়। একই সময় শিশু নিখোঁজের সংখ্যা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
এ বিষয়ে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে কর্মরত সংগঠনগুলোর জোট চাইল্ড সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ প্রিভেনশন (সিএসএ প্রিভেনশন) নেটওয়ার্কের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের পরিচালক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, শিশু কোথায় যাচ্ছে বা কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে—এসব বিষয়ে পরিবারের সতর্কতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও শিশুদের নিরাপত্তার পুরো দায়িত্ব পরিবারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। নিরাপদ রাস্তা, আলোকিত জনপরিসর, নজরদারি, দ্রুত পুলিশি সহায়তা এবং কার্যকর স্থানীয় সুরক্ষাব্যবস্থা রাষ্ট্র ও সমাজেরও দায়িত্ব। শিশুদের সহায়তার জন্য জাতীয় হেল্পলাইন ১০৯ এবং শিশু সহায়তা হেল্পলাইন ১০৯৮ সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর আহবান জানান তিনি।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুর রহমান বলেন, শিশুর ওপর সহিংসতার পেছনে অপরাধীদের বিকৃত মানসিকতার পাশাপাশি প্রতিশোধ, পারিবারিক বিরোধ বা বড়দের দ্বন্দ্বও ভূমিকা রাখতে পারে। এসব ঘটনার দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার হলে সচেতনতা বাড়বে এবং অপরাধ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
শিশুর জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করার আহবান জানিয়েছেন শিশু সংগঠক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী। তাঁর ভাষ্য, কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে মা-বাবার সঙ্গে মতপার্থক্য, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, স্কুলে বুলিং কিংবা পারিবারিক পরিবেশের সমস্যার কারণে আবেগীয় পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। তখন রাগ বা আবেগের বশে বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এ কারণে সন্তানদের নিরাপত্তার পাশাপাশি তাদের মানসিক ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রতিও অভিভাবকদের নজর দেওয়া প্রয়োজন।