Image description

নতুন রাস্তা নির্মাণের পর সেই রাস্তা কেটে নালা নির্মাণের আয়োজন, বাজারদরের প্রায় দ্বিগুণ দামে ডাস্টবিন কেনাসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) একটি উন্নয়ন প্রকল্পে। কোথাও নকশা পরিবর্তনের কারণে কাজ থেমে আছে, কোথাও নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে প্রশ্ন, আবার কোথাও যোগ্য ঠিকাদারকে বঞ্চিত করে কাজ দেওয়া হয়েছে বহিষ্কৃত ঠিকাদারকে। এছাড়া কাজ না করেও বসে বসে বেতন নিচ্ছেন অনেক পরামর্শক। এমন চিত্র ‘নগর পরিচালন ও অবকাঠামো উন্নয়ন (আইইউজিআইপি)’ প্রকল্পের, যা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ঋণে বাস্তবায়ন হচ্ছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের পৃথক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে। দেশের পৌরসভা ও শহর অঞ্চলে নাগরিক সেবা বৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উন্নত করতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

প্রতিবেদনে উঠে আসা এসব অনিয়ম নিয়ে নিউজ না করতে তদবির করা হয়। প্রকল্প উপপরিচালক ইমতিয়াজ জহিরুল হক এই প্রতিবেদককে অনৈতিক আর্থিক সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করেন এবং বলেন, এটি প্রকল্প পরিচালক তোফায়েল আহমেদ তাকে দিতে বলেছেন। তবে প্রতিবেদক তা প্রত্যাখ্যান করেন (রেকর্ড সংরক্ষিত)।

জানা যায়, ৬ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটির পরিকল্পনায়ও রয়েছে নানা গলদ। সমন্বয়হীনতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ মেহেরপুরের গাংনী পৌরসভার চৌগাছা এলাকায়। সেখানে সড়ক ও নালার কাজ আলাদা প্যাকেজে নেওয়া হয়। পরে নালা করতে গিয়ে দেখে জায়গা নেই। এখন সেই নতুন সড়ক কেটেই নালা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ কাজ করতে গিয়ে অনুমোদন পেতেই কেটে গেছে কয়েক মাস। এতে একদিকে যেমন সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে।

প্রকল্পের ক্রয় কার্যক্রম নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। অডিট আপত্তিতে অস্বাভাবিক দামে নিম্নমানের ডাস্টবিন কেনা এবং যথাযথ পরীক্ষা ছাড়াই সেগুলোর বিল পরিশোধের অভিযোগ করা হয়েছে। এতে সরকারি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১৮ কোটি ৭৭ লাখ ৪৩ হাজার ৪৯ টাকা। ক্রয় কার্যক্রমের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রকল্পে দুই ধরনের ডাস্টবিন কেনা হয়েছে। এর মধ্যে ২০ লিটারের ডাস্টবিন ২ লাখ ৫২ হাজারটি। প্রতিটির দাম ৬৮০ টাকা হিসাবে এতে ব্যয় হয়েছে ১৭ কোটি ১৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। অন্যদিকে ১২০ লিটারের ডাস্টবিন কেনা হয়েছে ২৫ হাজার ২০০টি। প্রতিটির দাম ৬ হাজার ৮০০ টাকা, এতেও ব্যয় হয়েছে ১৭ কোটি ১৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। বাজারদর যাচাই করে দেখা গেছে, এসব ডাস্টবিনে প্রকৃত বাজারমূল্যের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ব্যয় হয়েছে।

বহিষ্কৃত ঠিকাদার পায় কাজ : ঠিকাদার নিয়োগেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ না দিয়ে এমন এক ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া হয়েছে, যিনি ওই সময় সরকারি কাজ থেকে বহিষ্কৃত ছিলেন। এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৫০ লাখ ৩২ হাজার ৯৫৫ টাকা। পৃথক ঘটনায় নির্ধারিত সময়ে কাজ সম্পন্ন করতে ব্যর্থ ঠিকাদারের জামানত বাজেয়াপ্ত না করে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এতে ক্ষতি হয়েছে ১ কোটি ২৮ লাখ ৩৯ হাজার ৪০০ টাকা।

এছাড়া চুক্তি অনুযায়ী পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সরকারি স্থাপনা ব্যবহার করলেও অফিস ভাড়া দেয়নি। এতে ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৮০০ টাকা এবং পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আয়কর না কাটায় ৩৮ লাখ ৯৯ হাজার ৭১৭ টাকা ক্ষতি হয়েছে। পাঁচটি অডিট আপত্তিতে মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১ কোটি টাকা।

নির্মাণের মান নিয়েও প্রশ্ন : শুধু ক্রয় ও ঠিকাদার নির্বাচন নয়, মাঠপর্যায়ে নির্মাণকাজের মান নিয়েও একাধিক গলদ পেয়েছে আইএমইডি। প্রতিবেদনে বলা হয়, ৪০ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে সড়কের ঢাল ও বাঁকের উঁচু-নিচু ঠিকভাবে অনুসরণ করা হয়নি। এর ফলে যান চলাচলের নিরাপত্তা ও সড়কের স্থায়িত্ব নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। নকশা পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও গলদ রয়েছে। জমিদখল ও জায়গাসংক্রান্ত জটিলতার কারণে বিভিন্ন স্থানে নকশা পরিবর্তন করতে হয়েছে, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

রয়েছে নিরাপত্তাঝুঁকিও : কোথাও ফুটপাতের পাশে গভীর গর্ত থাকলেও নিরাপত্তাবেষ্টনী বা খুঁটি নেই। কোথাও পথের পাশে রেলিং না থাকায় পথচারী পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে নালার গর্তের ঢাকনা নিরাপদ না হওয়ায় নারী, শিশু ও বয়স্কদের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় নির্মিত কিছু অংশ ভেঙে গেলেও তা মেরামত করা হয়নি। কোথাও ম্যানহোলের ঢাকনা না থাকায় উন্মুক্ত নালা দুর্ঘটনা, দুর্গন্ধ, মশার উপদ্রব ও জলাবদ্ধতার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আবার কালীগঞ্জে নির্মাণবর্জ্য নালার সঙ্গে যুক্ত স্থানে ফেলে রাখায় নালার কার্যকারিতা কমে যাওয়ার চিত্রও পাওয়া গেছে। সরকারের ইটের ব্যবহার বন্ধের সিদ্ধান্ত থাকা সত্ত্বেও তা ব্যবহার করা হয়েছে।

পরিকল্পনাতেও হিসাবের গরমিল : প্রকল্পের পরিকল্পনা ও অনুমোদিত কাজের পরিমাণ নিয়েও অসঙ্গতি রয়েছে। প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার সড়ক ও ৯০০ কিলোমিটার নালা নির্মাণের লক্ষ্য উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু অনুমোদিত প্রকল্পে সড়কের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৭ দশমিক ৮১ কিলোমিটার এবং নালার পরিমাণ ৪৩৭ দশমিক ৮ কিলোমিটার। আবার প্রকল্পের যুক্তিকাঠামোতেও সড়ক ও নালার পরিমাণের ভিন্ন হিসাব রয়েছে। ফলে প্রকল্পের লক্ষ্য নির্ধারণ, সম্ভাব্যতা যাচাই এবং শেষ পর্যন্ত অনুমোদিত কাজের পরিমাণ কীভাবে নির্ধারিত হলো-সে প্রশ্নও সামনে এসেছে। প্রকল্পের আর্থিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ নিয়েও দুর্বলতা চিহ্নিত করা হয়েছে। এমনকি প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য ছিল নারী ও পুরুষের প্রয়োজন বিবেচনায় অবকাঠামো নির্মাণ এবং দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় কার্যক্রমে অন্তত ৫০ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। কিন্তু প্রায় ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে এই লক্ষ্য পূরণ হয়নি।

অনিয়মের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) তোফায়েল আহমেদ বলেন, অডিট আপত্তিগুলোর জবাব দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো কোনো আপত্তি নিষ্পত্তি হয়নি। যাচাই প্রক্রিয়া চলমান আছে। আর কাজের ক্ষেত্রে যেসব অভিযোগ উঠেছে সেগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।