শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যের পাঠ্য বই ছাপতে এবার খরচ বাড়ছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। ছাপাখানার মালিকদের দরপত্র, কাগজের দাম ও মুদ্রণ ব্যয়— সবমিলিয়ে বাড়ছে সরকারি খরচ। অথচ বাড়তি এই ব্যয়ের পরও পাঠ্য বইয়ের মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। ইতিমধ্যে ৫২টি ছাপাখানায় নিম্নমানের বই শনাক্ত করা হয়েছে। নষ্ট করা হয়েছে এক কোটির বেশি ফর্মা। নিম্নমানের কালি, মানহীন কাগজ, ফর্মা মিসিং- ডাবল ফর্মাসহ নানা অভিযোগ ধরা পড়েছে। অনিয়মের অভিযোগে শোকজ করা হয়েছে বেসরকারি ইন্সপেকশনকারী প্রতিষ্ঠানকে। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে মোট ৩০ কোটি ৬১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১ কপি বই ছাপার কথা। সব বই ছাপাতে সরকারের ব্যয় হবে প্রায় ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা। গত বছরের থেকে এবার পাঠ্য বই বেশি ছাপানো হচ্ছে ৫৯ লাখ ৪২ হাজার ৯৪৭টি।
প্রায় ৩১ কোটি বই ছাপাতে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সঙ্গে চুক্তি করেছে ১৩৩টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান। গতবারের তুলনায় এবার মুদ্রণ ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা এবং প্রাক্কলিত দরের চেয়ে প্রায় ১০০ কোটি টাকা বেশি দর দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। সবমিলিয়ে বাড়তি ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। গত শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিকে ফর্মাপ্রতি ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ টাকা ৪৪ পয়সা। এ বছর তা বেড়ে হয়েছে ৩ টাকা ৫৪ পয়সা। মাধ্যমিক পর্যায়ে গত বছর ফর্মাপ্রতি খরচ ছিল ২ টাকা ৩১ পয়সা। চলতি বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ টাকা ৩২ পয়সা। মাধ্যমিকের বই সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২২ লাখ।
পাঠ্য বইয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি ও মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে বাজেটে। তবে বিপুল অর্থ ব্যয়ের মধ্যেই মাঠপর্যায়ের পরিদর্শনে উঠে এসেছে ভয়াবহ চিত্র। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘মিনিস্ট্রি টিম’, এনসিটিবি’র ‘পরিদর্শন টিম’ এবং ইন্সপেকশন এজেন্টের সরজমিন পরিদর্শনে নানা অনিয়ম ধরা পড়ে। পরিদর্শনে ফর্মা মিসিং, ডাবল ফর্মা, আলট্রা বার্নিশ না করা, বাঁধাইয়ে ত্রুটি ও নিম্নমানের কালি ব্যবহারের মতো অনিয়ম উঠে আসে। কোনো কোনো বই ঝাপসা, কোনো বইয়ের কাগজ খসখসে। আবার ছাপা লেপ্টে যাওয়ার ঘটনাও পাওয়া গেছে। শুধু তাই নয়, কয়েকটি ছাপাখানা বইয়ের প্রথম কয়েকটি পৃষ্ঠায় ভালো মানের কাগজ ব্যবহার করলেও ভেতরের পৃষ্ঠায় নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার করেছে।
বইয়ের কাগজের মান যাচাই নিয়েও শুরু হয়েছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। প্রেস মালিকদের একাংশের অভিযোগ, দেশের নামকরা পেপার মিলের কাগজও ইন্সপেকশন এজেন্ট আটকে দিচ্ছে। আবার নির্দিষ্ট কয়েকটি ভেন্ডর থেকে কাগজ কিনলে সহজেই তা পাস করিয়ে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কাগজ আটকে দিলে প্রেস মালিকরা শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট ভেন্ডরের কাছ থেকে কাগজ কিনতে বাধ্য হন।
২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বিনামূল্যের পাঠ্য বই ছাপাতে নির্ধারিত মানের চেয়ে নিম্নমানের কাগজ ব্যবহারের সুযোগ করে দেয়ার ঘটনায় বইয়ের মান যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা ইনফিনিটি সার্ভে অ্যান্ড ইন্সপেকশন বিডিকে শোকজ করেছে এনসিটিবি। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রাক্-প্রাথমিকের বই ছাপার কাজে নির্ধারিত মানের চেয়ে কম জিএসএম’র কাগজ ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির দায়িত্ব পালনে শিথিলতার বিষয়টিও উঠে এসেছে। এ ঘটনায় চুক্তির শর্তভঙ্গ ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে কেন কার্যাদেশ বাতিলসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
তবে ইন্সপেকশন এজেন্টের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। তাদের তরফে জানানো হয়, একেক রোলের কাগজ একেক রকম পাওয়া যাচ্ছে। তাই সব রোল পরীক্ষা করা হচ্ছে। তার দাবি, ১০০ রোলের মধ্যে ৬০টি মানসম্পন্ন হলে সেগুলো ছেড়ে দেয়া হচ্ছে, যাতে কাজ চলতে পারে।
এনসিটিবি’র স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী ভালো মানের কাগজের দাম টনপ্রতি ১ লাখ ১৮ হাজার থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। অন্যদিকে ৭০ শতাংশ ভার্জিন পাল্প ও ৩০ শতাংশ রিসাইকেলড কাগজের পাল্প ব্যবহার করা কাগজ প্রায় ৯০ হাজার টাকা টনে পাওয়া যেতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি ১০০ কোটি টাকার বইয়ের কাজ পায়, তাহলে প্রায় ৫ হাজার টন কাগজ প্রয়োজন হতে পারে। কাগজের মান কমিয়ে দিলে শুধু কাগজ কেনাতেই প্রায় ১৫ কোটি টাকা পর্যন্ত পার্থক্য তৈরি হতে পারে।
একজন প্রেস মালিক বলেন, সব প্রতিষ্ঠানের কাজ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে না। কিছু প্রতিষ্ঠান প্রতি বছরই নিম্নমানের কাজ করেও পার পেয়ে যায়। পাঠ্য বইয়ের কাজ আমরা ভালোভাবেই করি। কিন্তু অল্প কিছু প্রেসে নিম্নমানের কাজ হয়। তারা শেষ সময়ে তাড়াহুড়া করে এসব নিম্নমানের বই গছিয়ে দেয়। আর গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের জন্য আমাদের বদনাম হয়।
এনসিটিবি’র সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু বলেন, ইন্সপেকশন এজেন্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়ার পর মাধ্যমিকের এজেন্টকে শোকজ করা হয়েছে। অন্য এজেন্টদেরও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। বইয়ের মানের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেয়া হবে না। আমরা সময়মতো এবং মানসম্মত পাঠ্য বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দিতে চাই। এর জন্য কাজ করে যাচ্ছি।