Image description

বেলা ২টা। রাজধানীর মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশন থেকে গুলিস্তান-গাবতলী রুটে চলাচলকারী ৮ নম্বর বাসে ওঠেন বেসরকারি চাকুরে মহিউদ্দিন। যাবেন আধা কিলোমিটার দূরত্বের দৈনিক বাংলা মোড়ে। মতিঝিল থেকে দৈনিক বাংলা মোড়ের ভাড়া ১০ টাকা দিয়ে এসেছেন এতদিন। তবে গতকাল ভাড়া দিতে গিয়েই বাধে ঝামেলা। ২০ টাকার নোট দিলে কন্ডাক্টর ফেরত দেন ৫ টাকা। তেলে-বেগুনে রেগে যান মহিউদ্দিন। শুরু হয় দু’জনের বাকবিতণ্ডা। বাসের কন্ডাক্টর বলেন, আজ থেকে ১৫ টাকা সর্বনিম্ন ভাড়া। এর কমে রাখতে পারবো না। মহিউদ্দিন বলেন, ‘কেন? বাস ভাড়া কে বাড়িয়েছে? বাড়লে কিলোমিটারে কতো বেড়েছে? আপনি এই ১ কিলোমিটারের পথে ৫ টাকা বাড়িয়ে রাখবেন কেন?’ একপর্যায়ে যাত্রী ও কন্ডাক্টরের মধ্যে হাতাহাতির উপক্রম হয়। ওই যাত্রী ৫ টাকা ছুড়ে মারেন কন্ডাক্টরের মুখে।

এভাবেই গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন গণপরিবহন ও দূরপাল্লার বাসে ভাড়া নিয়ে বচসা ও বাকবিতণ্ডার ঘটনা ঘটে। রোববার রাত থেকে জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ায় সরকার। তবে দূরপাল্লায় কিলোমিটার প্রতি ২০ পয়সা ও শহরে ১৮ পয়সা বাস ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব দিলেও গতকাল রাত পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা দেয়নি মালিক সমিতি। এর আগে সকাল থেকেই অনেক গণপরিবহনসহ দূরপাল্লার বাসে বাড়ানো হয়েছে ভাড়া। হঠাৎ ভাড়া বৃদ্ধিতে যাত্রীরাও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। বাসে বাসে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন অনেকেই। ইব্রাহিম খলিল নামের এক যাত্রী সাইনবোর্ড থেকে নতুন বাজার যাচ্ছিলেন ইকবাল পরিবহনের এসি বাসে। তিনি মানবজমিনকে বলেন, প্রতিদিন ১০০ টাকা দিয়ে যাই। অথচ আজ ১২০ টাকা রাখলো। তেলের দাম বেড়েছে— এটা জানি। কিন্তু বাস ভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা তো শুনিনি।

সোমবার ঢাকার বিভিন্ন গণপরিবহনের যাত্রীরা অভিযোগ করেন, সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা হলেও কন্ডাক্টররা ভাড়া নিয়ে নয়ছয় করছেন। ১০ টাকা ভাড়া নিতে নারাজ তারা। কিলোমিটার প্রতি যা ভাড়া বাড়ার কথা; কিন্তু অনেক বেশি নেয়া হচ্ছে বলে যাত্রীরা অভিযোগ করেন।

এদিকে ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া বিভিন্ন দূরপাল্লার বাসেও আদায় করা হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া। এতে বিপাকে পড়েছে যাত্রীরা। দেশের উত্তরাঞ্চলের বাসগুলোর বেশির ভাগই ছেড়ে যায় গাবতলী থেকে। গাবতলী বাস টার্মিনালের কাউন্টারগুলো দেখা গেছে, বিভিন্ন রুটের বাসে ৫০ থেকে ১০০ টাকা বাড়তি ভাড়া নেয়া হচ্ছে। এসি, নন-এসি প্রায় সব বাসেই বাড়তি টাকায় টিকিট বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে দক্ষিণাঞ্চল বা দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বাসগুলো সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল হতে ছেড়ে যায়। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর গতকালই ঢাকা থেকে খুলনাসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী গণপরিবহনের ভাড়া যাত্রীপ্রতি ৫০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় বাস মালিকরা। তাদের দাবি, বিআরটিএ নতুন ভাড়া নির্ধারণ করলে সরকার নির্ধারিত কিলোমিটারপ্রতি হার অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে ভাড়া ঠিক করা হবে।

ঢাকা থেকে খুলনা রুটে চলাচলকারী একটি বাস কোম্পানির মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এসব রুটে চলাচলকারী বাস মালিকরা সকালে আলোচনা করে যাত্রীপ্রতি ৫০ টাকা ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যাত্রী যেখানেই নামুন না কেন, বর্তমান ভাড়ার চেয়ে ৫০ টাকা বেশি দিতে হবে। বাড়তি ভাড়া নেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে গাবতলীর পূর্বাশা পরিবহনের একটি বাসের সহকারী মো. ইলিয়াস বলেন, তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার পর বাড়তি ভাড়া এখনো নেয়া হচ্ছে না। সরকার নতুন চার্ট দিলেই আমরা বাড়তি ভাড়া নেয়া শুরু করবো।
অরিন পরিবহনের যাত্রী মো. রিয়াদুর রহমান যাবেন রংপুর। তিনি বলেন, ব্যবসার কাজে প্রায়ই রংপুরে যাতায়াত করতে হয়। কয়েকদিন আগেও ৮০০ টাকায় টিকিট কেটে যাতায়াত করেছি। আজ ৯০০ টাকায় টিকিট কিনতে হয়েছে। অনেক বাসে আরও বেশি ভাড়া চায়। দামাদামি করে অরিনে টিকিট কেটেছি।

সমন্বয় হলে কতো বাড়ছে বাস ভাড়া?

চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বেড়েছে। এতে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ হয়েছে। তেলের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাসের ভাড়া বাড়ানো হবে। পরিবহন মালিক সমিতি কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা করে ভাড়া বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছে। এবার বাস ভাড়া সমন্বয় হলে ৫ মাসে দুই বার বাড়বে বাস ভাড়া। যদিও এই বৃদ্ধির বিষয়টি বাস মালিকরা ‘সমন্বয়’ হিসেবেই দেখছেন।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে বাসের ভাড়া সমন্বয় করা হয় সর্বশেষ চলতি বছরের এপ্রিলে। তখন সরকার ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করেছিল। একই সময়ে অকটেন ২০ টাকা, পেট্রোল ১৯ টাকা এবং কেরোসিন ১৮ টাকা বাড়ানো হয়। এরপর বিআরটিএ’র ভাড়া নির্ধারণ-সংক্রান্ত কমিটি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে বাসের ভাড়া বাড়ানোর সুপারিশ করে।
২৩শে এপ্রিল জারি করা প্রজ্ঞাপনে দূরপাল্লার বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ১২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ২৩ পয়সা করা হয়। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের বাসের ভাড়া ২ টাকা ৪২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৫৩ পয়সা এবং ডিটিসিএ এলাকার মিনিবাসের ভাড়া ২ টাকা ৩২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৪৩ পয়সা করা হয়। অর্থাৎ দূরপাল্লা ও মহানগরের বাসে কিলোমিটারপ্রতি ১১ পয়সা করে ভাড়া বেড়েছিল।

এবার ২০ পয়সা বাড়ালে দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া দাঁড়াচ্ছে ২ টাকা ৪৩ পয়সা। তাহলে প্রতি ১০০ কিলোমিটারে ভাড়া ২৪৩ টাকা আসছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে বাস ও মিনিবাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২টাকা ৭৩ পয়সা হচ্ছে। এ ছাড়া ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) এলাকা অর্থাৎ ঢাকা ও ঢাকার আশপাশের ক্ষেত্রে ২ টাকা ৪৩ পয়সা থেকে ২ টাকা ৬৩ পয়সা হতে পারে।

ওদিকে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর পর বাস ভাড়া পুনর্নিধারণে পরিবহন মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। সোমবার বিকালে রাজধানীর বনানীতে বিআরটিএ কার্যালয়ে এ বৈঠক হয়। বৈঠকে জ্বালানি তেলের নতুন দামের কারণে বাস পরিচালন ব্যয় কতোটা বেড়েছে এবং সে অনুযায়ী ভাড়া কী হারে সমন্বয় করা হবে— তা নিয়ে আলোচনা করা হয়। প্রতি কিলোমিটারে ২০ পয়সা সমন্বয়ের প্রস্তাব করে মালিক সমিতি। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত নতুন বাস ভাড়া চূড়ান্ত হয়নি।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম মানবজমিনকে বলেন, তেলের দাম বাড়ায় নতুন করে দাম সমন্বয় করতে বিআরটিএতে জরুরি বৈঠক হয়েছে। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে বাস ভাড়া পুনর্নিধারণ করার কথা আমরা জানিয়েছি। বাকিটা বিআরটিএ সিদ্ধান্ত নেবে। কোনো কোনো রুটে ভাড়া আগেই বাড়িয়ে নেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, বিক্ষিপ্তভাবে কেউ বাড়াতে পারে। সবাই সমান না। কিন্তু আমাদের পক্ষ থেকে সবসময় বলা থাকে যাতে নিয়মের বাইরে যাতে না যায়।