Image description

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বহুল আলোচিত নবম জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকরের ঘোষণার পর দেশের বিশাল অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখা বেসরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ, মানসিক চাপ ও হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার লাগামহীন খরচের মাঝে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও, বেসরকারি খাতে আয় বাড়ার সুযোগ নেই।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারি পে- স্কেল বেসরকারি খাতের জন্য বাধ্যতামূলক না হলেও পরোক্ষভাবে বাজারে চাপ তৈরি করবে। সরকারি কর্মকর্তাদের হাতে অর্থপ্রবাহ বাড়লে সার্বিক ভোগব্যয় ও পণ্যের চাহিদা বাড়বে। কিন্তু বিপরীতে সরবরাহ না বাড়লে মূল্যস্ফীতি আরও উস্কে যেতে পারে, যা বেসরকারি চাকরিজীবীদের প্রকৃত আয় ও জীবনযাত্রায় সরাসরি নেতিবাচক আঘাত হানবে। এ ছাড়া আর্থিক ভারসাম্য বজায় না থাকলে দক্ষ জনশক্তি ধরে রাখাও বেসরকারি খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

বাড়ছে আয় বৈষম্য: নতুন কাঠামোয় ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০,০০০ টাকা এবং ১ম গ্রেডের মূল বেতন ১,৫৬,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, একই বাজারে কেনাকাটা করা বেসরকারি চাকরিজীবীরা একই সময়ে কেবল বাস্তবতার কাছে হার মানছেন। বাসাভাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, সন্তানদের শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয় হু হু করে বাড়লেও তাদের মূল বেতন অপরিবর্তিত। ফলে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা দ্রুত কমছে। ঢাকা শহরে কর্মরত একাধিক বেসরকারি কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, করপোরেট পোশাকের চকচকে আবরণের আড়ালে মাস শেষে পকেট খালি থাকা এখন তাদের নিয়মিত অভিজ্ঞতা।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের অনেকেই বলছেন, মূল্যস্ফীতির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় বেড়েছে। তবে অনেক প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত বেতন সমন্বয় না হওয়ায় কর্মীদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, শুধু সরকারি খাতের বেতন বাড়ানো নয়, সামগ্রিক মজুরি কাঠামো নিয়েও দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা প্রয়োজন। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের বেসরকারি কর্মীদের জন্য ন্যায্য মজুরি, নিয়মিত বেতন পুনর্মূল্যায়ন এবং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আয় নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়া দরকার।
ঢাকার একটি বেসরকারি মার্কেটিং প্রতিষ্ঠানে পাঁচ বছর ধরে কাজ করছেন আতিকুর রহমান। তার মতে, পাঁচ বছরেও একই পদে রয়েছেন তিনি। অথচ এই সময়ে কাজের চাপ দ্বিগুণ হয়েছে। বিপরীতে বেতন বেড়েছে সামান্য। ৯ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতির বাজারে একই বেতনে সংসার চালানো ক্রমেই অসম্ভব হয়ে পড়ছে বলে জানান তিনি।

রপ্তানিমুখী একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ময়নুল ইসলাম বলেন, কাজের নির্দিষ্ট সময়সূচি নেই। এমনকি ছুটির দিনেও অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। এ ছাড়া যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক কর্মী অভ্যন্তরীণ অফিস রাজনীতির কারণে মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। বসের ‘সুনজরে’ না থাকলে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি আটকে যাচ্ছে অনেকের।
ঢাকায় কর্মরত নিরাপত্তাকর্মী আবুল হোসেন বলেন, যা বেতন পাই, তাতে পেট চলে না। ফ্যামিলি সঙ্গে রাখা তো দূরের কথা, ঢাকায় এনে কয়েকদিন রাখবো, সেই সাহসও করি না। যা বেতন পাই, তাতে পেট চলে না।

বেসরকারি খাতের সুরক্ষা নিশ্চিতে ইতিমধ্যে ‘প্রাইভেট সার্ভিস রুলস’ তৈরির প্রক্রিয়া চলছে। তবে এটি কেবল আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত মাঠপর্যায়ে কার্যকর ও কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানিয়েছেন, সরকারি পে-স্কেলের পাশাপাশি বেসরকারি কর্মীদের বেতন বাড়ানোর বিষয়টি সরকারের নীতিগত আলোচনায় স্থান রয়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির হার অনেক বেশি, যা অনুকরণ করা বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বেসরকারি কর্মীদের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। ফলে সরকারি পে-স্কেলের প্রভাবের বাইরে থেকেও বেসরকারি খাতে মজুরি সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে। তিনি মনে করেন, নতুন পে-স্কেলের ২০তম গ্রেডের ২০ হাজার টাকার প্রারম্ভিক মূল বেতনকে বেসরকারি খাতের নিম্ন আয়ের কর্মীদের জন্য একটি বেঞ্চমার্ক বা ন্যূনতম মানদণ্ড ধরা যেতে পারে।