Image description
মরিয়ম নামের কিশোরী মেয়েটি মৃত্যু যদি আত্মহত্যাও হয়, তবুও তা হত্যা। এর জন্য দায়ী স্যোশাল মিডিয়ার জাজমেন্ট, বুলিং এবং মিডিয়ার বিষাক্ত নিউজ। আর মূলহোতা মরিয়মের মামা ওবায়দুর। যে এমপি গাজী নজরুলের ড্রাইভার ছিল।
 
ঘটনার পুরোটা শুরু থেকেই জানতাম, কারণ প্রথম দিনেই মরিয়ম এবং তার বাবার সঙ্গে কথা হয়েছিল। মরিয়ম আমাকে বলেছিলেন, তিনি স্বেচ্ছায় ৭৫ বছর বয়সী গাজী নজরুলকে বিয়ে করেছেন। তাঁর এই বক্তব্যই আমার নিউজে ছাপা হয়। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, মাত্র ১৮ বছর বয়সে ৭৫ বয়সী ব্যক্তিকে বিয়ে করলেন? মরিয়ম উত্তরে বলেছিলেন, 'আমার ইচ্ছা।'
 
আমি আর প্রশ্ন করিনি। কারণ, বয়সের পার্থক্য থাকাটা আমার কাছে অগ্রহণযোগ্য হলেও, সামাজিকভাবে রুচিকর না হলেও এটা তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। এখানে আমার বলার কিছু নেই। সবাই যখন 'নারী সঙ্গে এমপির আপত্তিকর ভিডিও', 'কথিত স্ত্রীর সঙ্গে এমপির ভিডিও' বলে খবর চালাচ্ছিল, আমি খুব সিম্পল শিরোনাম দিয়েছিলাম, 'নারীর সঙ্গে ভিডিও, জামায়াত এমপি বললেন স্ত্রী'।
 
ওই নিউজে ব্যক্তিগত জীবনে না ঢুকে যতটা লেখা সম্ভব, ঠিক ততটুকু তথ্য দিয়েছিলাম। আমরা লিখেছিলাম, টাকা হাতানোর জন্য মরিয়মের মামা ওবায়দুর ভাগ্নি ব্যক্তি মুহুর্তের ভিডিও করে। তারপর লোক ডেকে ভাগ্নি ও এমপিকে আটকে একলাখ টাকা নেয়। পরে আরও দুই লাখ টাকা নেয়। বাকি ৭ লাখ টাকা না পেয়ে ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়।
 
গোপনে ব্যক্তিগত মুহুর্তের ভিডিওধারন, তা প্রকাশ করা এবং টাকা নিতে ব্ল্যাকমেইল করার মত সিরিয়াস সব অভিযোগ থাকার পরও ওবায়দুরের কিছু হয়নি সরকার এবং মিডিয়া সাপোর্টের কারণে। কারণ সরকার এবং মিডিয়া এই ঘটনায় একটি কিশোরী মেয়েকে জাস্টিস দেওয়া নয়, জামায়াতকে সাইজ করার নীতি নিয়েছিল।
ওবায়দুরের থাকার কথা ছিল জেলে। কিন্তু তার মত জঘন্য অপরাধীকে মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম দিয়েছিল। এমনকি প্রথম আলোও। ‘মেয়েটির বাবাকে ঠিকাদারি লাইসেন্স করিয়ে দেন গাজী নজরুল, স্বপ্ন দেখান কোটিপতি বানানোর’- শিরোনামে ওবায়দুরের সাক্ষাতকার ছাপা হয়। যার মাধ্যমে আসলে গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে একতরফা বলার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল ওবায়দুরকে। অথচ প্রশ্ন করা উচিত ছিল, গোপনে ভিডিও কেনো করেছেন? টাকা কেনো নিয়েছেন? ভিডিও কেনো অনলাইনে ছড়িয়েছেন?
 
বরং ওবায়দুরের বক্তব্য ছাপানো হয়, এমপির সঙ্গে ভাগ্নির অনৈতিক সম্পর্ক মেনে নিতে পারেননি। তা তিনি বাধা দিয়েছেন। তাকে তো প্রশ্ন করা উচিত ছিল, ভাগ্নি কারো সঙ্গে সম্পর্ক থাকলে আপনার কী? এটা দেখার জন্য সে নিজে এবং তার বাবা-মা আছে।
 
প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে, ওবায়দুল যে গাড়ি চালান, সেটি ভাড়া নিয়েছিলেন গাজী নজরুল। তারপর সে একদিন তার ভাগ্নিকে এমপির কাছে নিয়ে আসে চাকরির জন্য। এরপর সেই মেয়ে এবং এমপির খাতির হয়। মেয়ের বাবার সঙ্গে এমপির খাতির হয়। তারপর বিয়ে হয়। মেয়ের বাবা ঠিকাদারি লাইসেন্স পান। মেয়ের চাচা এমপি জমিজমা চাষবাসের জন্য পান। কিন্তু ওবায়দুর কিছুই পায়নি। তার দাবি ছিল, আমিই মূল ব্যক্তি আমি কেনো কিছু পাবো না। সে তখন এমপির কাছে দাবি করে, তাকে একটি গাড়ি কিনতে হবে। তা না পেয়ে টাকা দাবি করে।
 
তা না পেয়ে নিজের আপন ভাগ্নি ভিডিও করে ছড়িয়ে দেয় সোশ্যাল মিডিয়ায়। মিডিয়া এটাকে নিয়ে চূড়ান্ত নোংরামি করে। হাতেগোনা দুই তিনটি মিডিয়া ছাড়া সবাই তা প্রকাশ করে। মেয়েটির নাম পরিচয়, ছবি, চেহারা সব প্রকাশ করে। দেশের প্রাচীনতম অনলাইন সংবাদমাধ্যম যারা, সাংবাদিকতার নৈতিকতার পাঠ পড়ায়, তারাও তাদের ইতিহাসে প্রথমবারের মত একই অপকর্ম করে, শুধুমাত্র জামায়াতের প্রতি অন্ধ বিরোধিতা থেকে।
 
রাজনৈতিক কারণে বিএনপি, আওয়ামী লীগ, বাম নির্বিশেষে ঝাঁপিয়ে পড়ে। যা তা করে প্রচারণা চালায়। কিশোরী মেয়েটির ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে কেউ সম্মাণ করেনি।
 
যারা বিয়েকে স্বীকার করেছিল, তারাও বলতে থাকে, মেয়েটি চাকরির প্রলোভনে এমপিকে বিয়ে করেছিল। এটা একজনকে চারিত্রিকভাবে শেষ করা দেওয়া। যদি আপনাকে ক্রমাগত বলতে থাকি, আপনি সম্পদের লোভে আপনার স্বামী বা স্ত্রীকে বিয়ে করেছেন, আপনি এই অপমান নিতে পারবেন? কিন্তু এই অপমান রোজ মেয়েটাকে করা হয়েছে। তারাই আসলে মেয়েটার খুনি।
 
অসম বিয়ের কারণে গাজী নজরুল বহিষ্কার হওয়ায়, তার ক্যারিয়ার, সামাজিক সম্মাণ শেষ হয়ে যাওয়ায় নিশ্চয় তার কিশোরী স্ত্রীর প্রতি সদয় ছিলেন না। নজরুলের আগের স্ত্রী, সন্তানরা সমাজে যে পরিস্থিতিতে পরেছেন, তারা নিশ্চয় মেয়েটিকে দোষারোপ করছিলেন। তো নজররুল এবং তার আগের পক্ষে স্ত্রী-সন্তান যদি মেয়েটির সদয় না থাকে, এই দায়ও বুলিং করা লোকজন এবং মিডিয়ার।
 
গাজী নজরুলের সদ্য প্রয়াত স্ত্রী কিছু চিরকুট লিখে গেছেন। ঠিক সুইসাইড নোট নয়। গত কয়ে মাস ধরে লেখা কবিতা বা ডায়রি। এসব লেখায় বোঝা যায়, স্বামীর প্রতি তার গভীর ভালোবাসা, অভিমান, অনুরাগ ছিল, আর দশটা স্বাভাবিক দম্পত্তির মত। স্বামীকে এককভাবে না পাওয়ার হাহাকার রয়েছে। লিখেছে, 'অন্য কারো স্বামীকে বানিয়েছিলাম নিজের শখের পুরুষ'। আরও অনেক ব্যক্তিগত।
 
কিশোরীটি হয়ত স্বামীর সঙ্গে অভিমানে বা সতীনের সঙ্গে মনোমালিন্যে আত্মহত্যা করেছেন। তার বাবা নিশ্চয় মামলা করবেন আত্মহত্যা প্ররোচনার। এমপিকে, মেয়ের মামাকে হয়ত আসামি করবেন। কিন্তু আরো যে আসামিরা আছে, তারা অন্য দিন অন্য কারো জীবন বিষিয়ে দেবে।