Image description

বাংলাদেশ পুলিশবাহিনীতে নতুন করে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে। এজন্য বাহিনীর সদস্যদের তিন ভাগে ভাগ করা হচ্ছে। শতভাগ পেশাদার ও দক্ষ, ষড়যন্ত্রকারী গুপ্তচক্র এবং দলীয় পরিচয়ে সুবিধা নেওয়া একশ্রেণির দুর্নীতিগ্রস্ত আত্মঘাতী গ্রুপ-এই তিন ভাগে বিভক্ত করে অ্যাকশান প্ল্যান প্রস্তুত করা হয়েছে। যারা সত্যিকারার্থে পুলিশবাহিনীতে শতভাগ দেশপ্রেম নিয়ে পেশাদারি বজায় রেখে সরকারের সদিচ্ছা বাস্তবায়নে কাজ করতে চান, তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে সরকার। আওয়ামীপন্থি ও সরকারবিরোধী আরও একটি দলের যেসব সদস্য সরকারপন্থি সেজে ‘গুপ্ত’ হিসাবে সরকারের বিরুদ্ধে অব্যাহতভাবে ষড়যন্ত্র করছেন, তাদের অনেকে ইতোমধ্যে চিহ্নিত হয়েছে। বাকিদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে। তৃতীয়ত, বিএনপিপন্থি পরিচয়ে ইতোমধ্যে সুবিধা নিয়ে যারা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন এবং ষড়যন্ত্রকারীদের প্রশ্রয় দিচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধেও শক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্ভরযোগ্য একধিক দায়িত্বশীল সূত্র যুগান্তরকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল অবেদীন শনিবার রাতে যুগান্তরকে বলেন, ‘সব বিষয় নিয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, ‘পুলিশবাহিনীতে যারা ষড়যন্ত্রকারী হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এরকম ভূমিকা যাদের মধ্যে থাকবে-প্রত্যেকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এদিকে সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার অভিযোগে সম্প্রতি প্রত্যাহার করা হয়েছে পুলিশের গুলশান বিভাগের ডিসি ও ওসিকে। এছাড়া ‘ভাইরাল অডিও’কে কেন্দ্র করে ডিএমপি সদর দপ্তর ও প্রশাসন বিভাগের কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসিকে। তবে এ দুটি ঘটনার মধ্য দিয়ে সরকারবিরোধী চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য এখন সামনে আসছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্বস্ত টিমের মাধ্যমে নেপথ্যের সব গডফাদারসহ পুরো নেটওয়ার্ককে চিহ্নিত করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঘটনা দুটি সরকারের নীতিনির্ধারক মহলকে আরও সতর্ক হওয়াসহ শত্রু-মিত্র চিনতে সহায়তা করেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের কয়েকজন উচ্চপদস্থ দায়িত্বশীল কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পরপরই পুলিশের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা ফ্যাসিস্ট চক্র রাতারাতি বিএনপি সেজে নতুন ষড়যন্ত্রে সক্রিয় হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে আরেকটি দলের গুপ্ত সদস্যরাও অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নিতে মরিয়া হয়ে মাঠে নামে। তখন ‘সমন্বয়ক’ চ্যানেল অপব্যবহার করে অনেককে রাতারাতি প্রাইজ পোস্টিং দেওয়া হয়। ওই ট্রেন বিএনপি একেবারে মিস করে বললেই চলে। বাস্তবে যা হয়েছে, সেটি আরও দুঃখজনক। বিএনপির ধ্বজাধারী কিছু প্রভাবশালী লোকজন ওই চক্রের ফাঁদে পা দিয়ে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে চুপ থাকে। ওই কর্মকর্তারা বলেন, সেসময় যেসব পেশাদার ও ত্যাগী পুলিশ কর্মকর্তা এর প্রতিবাদে সচিবালয় ঘেরাও করার কর্মসূচি দিয়েছিলেন, সেটি রহস্যজনক কারণে স্থগিত করে দেওয়া হয়। তারা আফসোস করে বলেন, ওই ক্ষতি আজও বিএনপি পুষিয়ে নিতে পারেনি। এর মধ্যে বিএনপি সরকার গঠন করলেও বর্ণচোরা ষড়যন্ত্রকারী ও বিএনপিবিরোধীরা শক্ত অবস্থান করে নিয়েছে।

তারা বলেন, মূলত সরকারের বিরুদ্ধে এখন যত ধরনের ষড়যন্ত্র ডালপালা বিস্তার করছে-সবই ওই ভুলের খেসারত। শুধু পুলিশবাহিনী নয়, প্রশাসনসহ সরকারের প্রতিটি সেক্টরে এ অবস্থা বিরাজ করছে। এ কারণে যখন সরকার গঠন করা হয়, তখন গণ-অভ্যুত্থানের আগ পর্যন্ত যারা নানাভাবে বিএনপির জন্য ত্যাগ স্বীকার করে সব ধরনের ঝুঁকি নিয়েছেন, তাদের অনেকে পেছনে পড়ে যান। এর ফলে সরকারের রেড ও ব্লু জোনের বিশ্বস্তদের কারও ঠাঁই হয়নি। যদিও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশকে এগিয়ে নিতে রাতদিন নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন। কিন্তু শুধু সরকারপ্রধান কাজ করলে তো হবে না, পুরো টিম সেভাবে চলতে হবে।

সূত্র বলছে, এ অবস্থায় সৃষ্ট সংকট ও ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে ইতোমধ্যে ধাপে ধাপে শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। তালিকায় আরও নাম যুক্ত হচ্ছে। এদিকে পুরো পুলিশবাহিনীকে ঢেলে সাজিয়ে একটি পেশাদার ও জনবান্ধব বাহিনীতে রূপান্তরের লক্ষ্যে যুগান্তকারী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করছে সরকার। এছাড়া পুলিশের ভেতর একটি ডেডিকেটেড গ্রুপ তৈরি করা হচ্ছে। এই গ্রুপে থাকছেন ৫ আগস্টের আগে লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থেকে দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করা বিএনপিপন্থি পুলিশ কর্মকর্তারা।

সরকারের উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে, বিগত সময়ে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করে ভিন্ন মতাবলম্বী গুপ্তদের দায়িত্বশীল পদে বসিয়ে বিএনপি এবং সরকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করা স্বার্থান্বেষী গ্রুপকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা গেছে। তাদের অনেকের বিরুদ্ধেই পোস্টিং বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আর্থিক দুর্নীতির পাহাড় গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে। শিগ্গিরই আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত কোর কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হবে। সভায় পুলিশ প্রশাসনের সংস্কার ও অপরাধীদের শাস্তির বিষয়ে চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে।

সরকারের নীতিনির্ধারকদের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পুলিশের ভেতর লুকিয়ে থাকা ষড়যন্ত্রকারীদের নেটওয়ার্ক কেবল দু-একজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তদন্ত যত এগিয়ে চলছে, ষড়যন্ত্রকারীদের সংখ্যা দিনদিন তত বাড়ছে। বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা, চেইন অব কমান্ড বা শৃঙ্খলা নষ্ট করা এবং অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ সৃষ্টির পেছনে যে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সক্রিয়, তাদের প্রায় সবাইকে তালিকার আওতায় আনা হচ্ছে। এক্ষেত্রে কাউকেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। তালিকাভুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা, চাকরিচ্যুত করা এবং নিয়মিত মামলা দায়েরের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়া জোরদার করা হচ্ছে। অপরাধী যে পদমর্যাদারই হোক না কেন, ষড়যন্ত্রের প্রমাণ মিললেই তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পুলিশ প্রশাসনের সবচেয়ে বিতর্কিত ও সমালোচিত দিক হলো বদলি ও পদায়নসংক্রান্ত দুর্নীতি। বিষয়টি সাধারণ মানুষের কাছে ‘পোস্টিং বাণিজ্য’ নামে পরিচিত। বিশেষ করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) থানাগুলোয় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসাবে দায়িত্ব পাওয়ার জন্য কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ বহুদিনের। সরকারের নতুন নীতিমালায় স্পষ্ট করা হচ্ছে-পুলিশে আর কোনো পোস্টিং বাণিজ্য থাকবে না। যোগ্যতা, সততা, মেধা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতেই কেবল পদায়ন করা হবে। একই সঙ্গে ঢাকার বিভিন্ন থানায় কীভাবে ও কোন প্রক্রিয়ায় ওসিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, পুরো বিষয় নিয়ে অনুসন্ধান করা হচ্ছে। ঢাকার ওসি নিয়োগের নেপথ্যে কারা ছিলেন, কার মাধ্যমে কত টাকার লেনদেন হয়েছিল এবং কোন প্রভাবশালী গোষ্ঠী সুপারিশ করেছিল-এসব বিষয় আসছে তদন্তের আওতায়। যারা অবৈধ প্রক্রিয়ায় অর্থ দিয়ে কিংবা অসাধু উপায়ে ঢাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ওসি হিসাবে পোস্টিং নিয়েছিলেন এবং যারা এই বাণিজ্যের মূল কারিগর ছিলেন-উভয় পক্ষের বিরুদ্ধে নেওয়া হবে যথাযথ ব্যবস্থা।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জনিয়েছেন, অপরাধীদের আড়াল করার দিন শেষ। একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনীতে বিশৃঙ্খলাকারী ও ষড়যন্ত্রকারীদের কোনো স্থান হতে পারে না। বিগত দিনের ভুল ও অপকর্মের দায়ভার পুরো পুলিশবাহিনী নেবে না। তাই পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের মাধ্যমে ষড়যন্ত্রকারীদের চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া বেগবান করা হচ্ছে।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে আইজিপি আলী হোসেন ফকির বলেন, পুলিশবাহিনীর ভেতরে ষড়যন্ত্রকারী রয়েছে। তাদের ইতোমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, সরকারকে বিব্রত করতে এবং অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে বিভিন্ন মাধ্যমে নানা ধরনের অপচেষ্টা ও ষড়যন্ত্র চালানো হচ্ছে। আইজিপি উল্লেখ করেন, পুলিশবাহিনীতে অপরাধ বা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত সদস্যের সংখ্যা খুবই সীমিত (১ শতাংশেরও কম)। এই অতি ক্ষুদ্রসংখ্যক দুর্নীতিপরায়ণ বা বিতর্কিত সদস্যের অনিয়মের দায় গোটা পুলিশবাহিনী নেবে না। ষড়যন্ত্রকারী এবং অপেশাদার সব পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।