রাজধানী জুড়ে একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণ, বাসে অগ্নিসংযোগ, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিলের পর নিরাপত্তা জোরদার করেছে পুলিশ। ঢাকার প্রবেশপথ, ফ্লাইওভার, গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টসহ অন্তত শতাধিক স্পটে বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। থানা মোবাইল প্যাট্রোল, ফুট প্যাট্রোল ও হোন্ডা প্যাট্রোলের সংখ্যা বৃদ্ধিসহ ডিবি, এসআরবি, এপিবিএন, সিটিটিসি’র সঙ্গে সাদা পোশাকেও পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তবে এত বাহিনী থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন স্থানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের ঝটিকা মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোয়েন্দা সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সাধারণত রাজধানীর বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যক্রমের আগাম তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশ সদর দপ্তরের গোপনীয় শাখায় তথ্য পাঠায় পুলিশের ‘ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড অ্যানালাইসিস ডিভিশন’। এ ছাড়াও পুলিশের বিশেষ শাখা-এসবিও অপরাধ বা নাশকতার সম্ভাব্য কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আগাম তথ্য সংগ্রহ করে। এরই ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট থানা ও ইউনিটকে সতর্ক করা হয়। সেই সঙ্গে ডিজিএফআই, এনএসআই ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থাও ঠিক একই রকম কাজ করে থাকে। তবে এতগুলো বিশেষায়িত ইউনিট কাজ করার পরও শুক্রবার রাজধানীর আগারগাঁও, ঢাকা কলেজ, মহাখালী, যাত্রাবাড়ী, বাবুবাজার, গুলিস্তান, মালিবাগ, মগবাজার, বিটিভি ভবনের সামনে সহ একাধিক স্থানে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। কাফরুল থানার পাশেই যাত্রীবাহী বাসে আগুন দেয়া হয়েছে। আগের দিন রাতের এত ঘটনার পরও গতকাল সকালে গুলিস্তানের জাতীয় স্টেডিয়ামের ১ নম্বর গেটের সামনে থেকে ব্যানার নিয়ে ঝটিকা মিছিল বের করেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
গতকালও রাজধানীতে বাসে আগুন ও ককটেল বিস্ফোণের ঘটনা ঘটেছে। এর আগে কূটনৈতিক এলাকা গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিলের ঘটনা ঘটে। গত কয়েক মাস ধরেই ধারাবাহিকভাবে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক ঝটিকা মিছিলের তথ্য সকলের জানা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মাঠপর্যায়ের আগাম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, তথ্য বিশ্লেষণ ও সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের জায়গায় এখনো দুর্বলতা রয়েছে। আর এই আগাম তথ্যের ঘাটতি ও পুলিশি দুর্বলতার কারণেই কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এসব তৎপরতা চালাচ্ছে। সরাসরি ও প্রকাশ্যে অনলাইনে আলোচনার পরও এসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। যার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নিতে দেখা যাচ্ছে পুলিশের। কোথাও আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কর্মসূচির ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তৎপর হচ্ছেন। বাহিনীর ভেতর থেকেও তথ্য ফাঁস হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি গুলশানের ঝটিকা মিছিল তার উদাহরণ। পুলিশের দাবি- ঘটনার মাত্র ৮ মিনিট আগে থানা পুলিশের কাছে গোয়েন্দা তথ্য আসে।
কিন্তু আগের দিন থেকেই রাস্তায় পুলিশ না থাকার নিশ্চয়তা পান আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। আগের সপ্তাহের শুক্রবারে গুলশানের মতো সংবেদনশীল এলাকায় এত বড় মিছিলের পর গত শুক্রবারও দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত অন্তত ১০ থেকে ১২ স্পটে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। এই ঘটনাতেও আগে থেকে কোনো গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও সেভাবে ব্যবস্থা নেয়ার কোনো আলামত চোখে পড়েনি। এমনকি গতকাল সকালে গুলিস্তানের মিছিলের বিষয়েও আগাম পুলিশি ব্যবস্থা দেখা যায়নি।
বাংলাদেশ পুলিশ এসোসিয়েশনের সভাপতি ও বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল হাসান বলেছেন, একটি থানায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পুলিশ সদস্য থাকলেও তিন শিফটে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একইসঙ্গে সকলের মাঠে থাকা সম্ভব হয় না। ফলে কোনো রাজনৈতিক সংগঠন আগাম ঘোষণা না দিয়ে বা হঠাৎ বড় কোনো মিছিল বের করলে সে বিষয়ে আগাম তথ্য না পেলে সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এসব ক্ষেত্রে এসবি, সিটিএসবি ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার আগাম গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া গেলে পুলিশ প্রয়োজন অনুযায়ী আগে থেকেই ব্যবস্থা নিতে পারে।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেছেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল-মিটিং বন্ধে পুলিশকে তৎপর থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
নিষিদ্ধ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে কোনো মিছিল-মিটিং বা উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড যাতে না হতে পারে, সে বিষয়ে পুলিশকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। কোনো এলাকায় এমন ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আসতে হবে। ‘গুলশানে আওয়ামী লীগের মিছিলে জড়ো হওয়ার ঘটনায় গোয়েন্দা তথ্যের কোনো ব্যর্থতা ছিল কি না’- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তথ্য দিয়েছে এবং আগাম সতর্কতাও ছিল। তবে আয়োজকরা অন্য একটি স্থান বেছে নেয়ায় ঘটনাটি ঘটেছে। সেই হিসেবে এটাকে গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতিও বলা যেতেও পারে।
তবে এ বিষয়ে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক বলছেন, আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ কার্যক্রম ঠেকাতে শুধু থানার ওসি বা কোনো পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যথাযথ পদক্ষেপ নয়। এ ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব শুধু পুলিশের নয়, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তাই গোয়েন্দা তৎপরতা বা অন্যান্য বাহিনীর ব্যর্থতার দায় শুধু পুলিশ সদস্যদের ওপর চাপিয়ে সাময়িক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া অন্যায্য ও অযৌক্তিক। প্রয়োজন গোয়েন্দা তৎপরতা আরও শক্তিশালী করা।
ঢাকার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী বলেছেন, রাজধানীর সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজধানী জুড়ে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকা ও এর আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট, ফ্লাইওভার এবং প্রবেশপথগুলোতে বিশেষ চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি ও সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। নিরাপত্তা জোরদার করার অংশ হিসেবে রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোর পাশাপাশি ঢাকা শহরের প্রধান প্রবেশদ্বারগুলোতে কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে। যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা অপরাধমূলক তৎপরতা প্রতিরোধে মোটরসাইকেলসহ সব ধরনের সন্দেহজনক যানবাহনে নিবিড় তল্লাশি চালানো হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে রাজধানী জুড়ে বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছে। এ ছাড়া, নগরীর নিরাপত্তা ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চেকপোস্ট বসানো এবং পিকেট ডিউটি জোরদার করা হয়েছে।