Image description

হঠাৎ রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ দেখা দিয়েছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের তৎপরতায় নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। রাজনৈতিক পক্ষগুলোও এ নিয়ে ভাবছে। গত ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথিত প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকা দলটির নেতাকর্মীরা আবার নড়েচড়ে বসেছেন। গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, ঢাকাকে কেন্দ্র করে দলটির নেতাকর্মীরা বিদেশে বসে নাশকতার ছক কষছেন, যার মূল উদ্দেশ্য বিএনপি সরকারকে বিব্রতকর ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মুখে ফেলা। আর ঢাকায় এসব নাশকতার ছক বাস্তবায়ন করছে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পালিয়ে আত্মগোপনে থাকা দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। তাদেরকে সহযোগিতা করছেন ফ্যাসিস্ট আমলের সুবিধাভোগী কর্মকর্তারা।

গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, ৫ই আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে পালানো আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কয়েক হাজার মাঝারি ও তৃণমূল সারির নেতাকর্মী বর্তমানে রাজধানী ঢাকায় অবস্থান করছেন। তারা ঢাকার বিভিন্ন সাধারণ আবাসিক এলাকা, ব্যাচেলর মেস, সস্তা হোটেল এবং আত্মীয়স্বজনদের বাসাবাড়িতে ছদ্মবেশে আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। অনেকে সাধারণ মানুষ, হকার বা চাকরিপ্রার্থীর বেশ ধরে গোয়েন্দা নজরদারি এড়ানোর চেষ্টা করছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, ঢাকার মিরপুর, উত্তরা, বাড্ডা, খিলগাঁও, মুগদা, শাহজাহানপুর, সবুজবাগ, ধানমণ্ডি, যাত্রাবাড়ি এবং পুরান ঢাকার সূত্রাপুর-কোতোয়ালি এলাকার কিছু মেস ও ফ্ল্যাট বাড়িতে এদের ঘন ঘন যাতায়াত ও গোপন বৈঠকের খবর পাওয়া গেছে। ঢাকার বড় আয়তন এবং বিপুল জনসংখ্যার সুযোগ নিয়ে তারা এখানে সহজেই নিজেদের লুকিয়ে রাখতে পারছেন, যা ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে সম্ভব হচ্ছিল না। বিদেশে পালিয়ে থাকা নেতারা ঢাকায় আত্মগোপনে থাকা এসব নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সংঘবদ্ধ করেছেন। আওয়ামী লীগ আমলের কিছু প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এসব নেতাকর্মীদের দিয়ে ঝটিকা মিছিল, ককটেল বিস্ফোরণসহ নানা নাশকতার ছক করছেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই নাশকতার মূল পরিকল্পনা ও অর্থায়ন আসছে দেশের বাইরে থেকে। ভারতসহ মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পলাতক সাবেক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা, এমপি এবং বিগত সরকারের সুবিধাভোগী ধনাঢ্য ব্যক্তিরা এই তৎপরতার পেছনে মূল ভূমিকা পালন করছেন। তারা ভার্চ্যুয়াল যোগাযোগের বিভিন্ন এনক্রিপ্টেড অ্যাপস (সিগন্যাল, টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ) ব্যবহার করে দেশে থাকা নেতাকর্মীদের দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকার রাজপথে বড় ধরনের কোনো সমাবেশ করার শক্তি বা জনসমর্থন এই মুহূর্তে না থাকলেও, ‘হিট অ্যান্ড রান’ বা ঝটিকা মিছিলের কৌশল নেয়া হয়েছে। হঠাৎ করে ৩০-৪০ জনের একটি দল ব্যানার নিয়ে রাস্তায় নেমে ছবি ও ভিডিও ধারণ করে তা মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয়াই এদের প্রধান লক্ষ্য। এই পুরো প্রক্রিয়ার সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো— সাবেক ক্ষতাসীনদের সুবিধাভোগী এবং বর্তমানে ওএসডি বা বরখাস্ত হওয়া একশ্রেণির পুলিশ কর্মকর্তার উস্কানি।

গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিগত ফ্যাসিবাদের সময়ে পুলিশের ভেতরে বৈষম্যের শিকার দাবি করে যারা বর্তমান সরকারে ভালো পদ বাগিয়ে নিয়েছেন, এমন কিছু বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তার ভূমিকা এখন সন্দেহের তালিকায়। অভিযোগ রয়েছে— এই কর্মকর্তাদের অনেকেই অতীতে আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী ছিলেন, কিন্তু নিজেদের কৌশলগতভাবে আড়াল করে রেখেছিলেন। এখন তারা ভেতরে থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিষ্ক্রিয় রাখার চেষ্টা করছেন এবং গোপনে আওয়ামী লীগের ওই চক্রটিকে গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল তথ্য সরবরাহ করছেন। এ ছাড়া, আওয়ামী লীগ সমর্থিত এবং বর্তমানে বিদেশে পলাতক বেশ কয়েকজন সাবেক উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা বড় অঙ্কের টাকা পাঠাচ্ছেন এই ঝটিকা মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণের মতো ঘটনাগুলো সচল রাখতে। তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছেন গোয়েন্দারা। অনেক কর্মকর্তাদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

সম্প্রতি রাজধানীর গুলশানের মতো কূটনৈতিক ও অভিজাত এলাকায় জুমার নামাজের আগে আকস্মিক ঝটিকা মিছিল, ককটেল বিস্ফোরণ এবং গাড়ি পোড়ানোর ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিয়েছে। এই ঘটনার পর খোদ সরকারের হাই কমান্ড তীব্র অসন্তোষ ও বিব্রতবোধ প্রকাশ করেছে। কীভাবে এত কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে গুলশানের মতো এলাকায় এ ধরনের ঘটনা ঘটলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই চরম ব্যর্থতার দায়ে তাৎক্ষণিকভাবে গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) এবং গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) তাদের দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়। গতকাল গুলশান জোনের এডিসিকেও সেখান থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।

মাঠ পর্যায়ের চেইন অব কমান্ডে এখনো বড় ধরনের শিথিলতা রয়ে গেছে, যা নাশকতাকারীদের উৎসাহিত করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, গুলশানের ওই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর দেশ জুড়ে এবং বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ এবং র‌্যাব যৌথভাবে চিরুনি অভিযান শুরু করেছে। গুলশানের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় এ পর্যন্ত ১৭৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য বেরিয়ে আসছে। ডিএমপি’র ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গ্রেপ্তারকৃতদের মোবাইল ফোনের কললিস্ট এবং অর্থ লেনদেনের তথ্য পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এদের পেছনে খুব শক্তিশালী একটি চক্র কাজ করছে। আমরা তাদের নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ভেঙে দেয়ার জন্য কাজ করছি।

ওদিকে, ঢাকার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় (প্রবেশপথ গাবতলী, সায়েদাবাদ, আব্দুল্লাহপুর, বাবুবাজার ব্রিজ) এবং কূটনৈতিক এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) মোতায়েন করা হয়েছে। বিশেষ করে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার বিভিন্ন মেস ও সন্দেহভাজন হোটেলগুলোতে র‍্যাব-পুলিশের যৌথ ‘ব্লক রেইড’ বা আকস্মিক তল্লাশি অভিযান চালানো হচ্ছে। কোনো ধরনের বৈধ পরিচয়পত্র বা যৌক্তিক কারণ ছাড়া ঢাকার মেসে অবস্থান করা বহিরাগতদের কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।