Image description
► তিন মাসেই মিলেছে ১৭১ লাশ ১৫ হত্যা মামলা ► বেশির ভাগই মেলে বুড়িগঙ্গা শীতলক্ষ্যা তুরাগ ধলেশ্বরীতে

ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদী থেকে ছয় ঘণ্টার ব্যবধানে চারটি অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার করে নৌপুলিশ। কেরানীগঞ্জের মীরেরবাগ কোল্ড স্টোরেজ এলাকার তীরে পাওয়া যায় ৩০ বছর বয়সি এক নারী এবং তিন-চার বছরের এক শিশুর লাশ। নারীর গলা কালো কাপড় এবং শিশুটির লাশ ওড়না দিয়ে প্যাঁচানো ছিল। আর কালিন্দীর মাদারীপুর ঘাট এলাকা থেকে উদ্ধার হয় দুই তরুণ-তরুণীর লাশ। তাদের হাত একসঙ্গে বাঁধা ছিল এবং দুজনের শরীরেই ছিল আঘাতের চিহ্ন। গত বছরের ২৩ আগস্টের এ ঘটনার পর বুড়িগঙ্গার পারে আতঙ্ক দেখা দেয়। পুলিশও গুরুত্বসহকারে তদন্ত শুরু করে। কিন্তু লাশ পচে যাওয়ায় পরিচয় মেলেনি। লাশের দাবিদার না থাকায় ১১ দিন পর অজ্ঞাত হিসেবেই দাফন করা হয়। আলোচিত এ ঘটনার জট খোলেনি আজও। কারা এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত তাও জানা যায়নি।

১২ সেপ্টেম্বর রাজধানীর আদাবরের হাক্কারপাড়সংলগ্ন খাল থেকে খণ্ডিত এক কিশোরীর লাশ উদ্ধার করা হয়। প্রথম দিন ট্রলি ব্যাগে থাকা মাথা, দুই হাত ও দেহের অংশ পাওয়া যায়। পরদিন কিছুটা দূরে একটি প্লাস্টিকের বস্তায় পাওয়া যায় দুটি পা। এখনো ওই কিশোরীর পরিচয় শনাক্ত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ধারণা করা হচ্ছে, হত্যার পর লাশ টুকরো করে অন্য কোথাও ফেলা হয়। খালের স্রোতে ট্রলিব্যাগ ও বস্তা সেখানে ভেসে আসে। পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় রোমহর্ষক এ ঘটনার রহস্য উন্মোচিত হবে কি না প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। শুধু এ ঘটনাগুলোই নয়, হত্যার পর লাশ গুমের নিরাপদ ঠিকানা হিসেবে নদীকে বেছে নিচ্ছে হত্যাকারীরা। অন্য কোথাও হত্যার পর নির্জন এলাকায় নিয়ে অথবা ব্রিজের ওপর থেকে লাশ ফেলা হচ্ছে নদীতে। এতে লাশ পচে গেলে আর পরিচয় মিলছে না। অনেক ক্ষেত্রে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে ঘাতকরা। নৌপুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জুন থেকে আগস্ট-তিন মাসেই ১৭১টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২৩টির পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। এখনো ৪৮ লাশের পরিচয় শনাক্ত হয়নি। লাশগুলোর মধ্যে ১৫টির ক্ষেত্রে হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে। যার মধ্যে সাতজনের পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় রহস্য উন্মোচন হয়নি। ১৪০টি লাশের ক্ষেত্রে অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। যেগুলোর মধ্যে ৪১ জনের পরিচয় এখনো শনাক্ত হয়নি। ফলে তাদের মধ্যে কেউ খুনের শিকার হয়েছেন কি না, নিশ্চিত নন তদন্তকারীরা। এ তিন মাসসহ চলতি বছরের আট মাসে উদ্ধার হয়েছে ৩৭৯ লাশ। এ ছাড়া ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে উদ্ধার হয় ২ হাজার ৬৪টি লাশ। যার মধ্যে কয়েক শ লাশের পরিচয় অশনাক্তই রয়ে গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছেন, নদীতে যে লাশ পাওয়া যায় এর মধ্যে নৌকাডুবি, গোসল করতে নেমে নিখোঁজ, গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে মৃত্যুসহ বিভিন্ন কারণ রয়েছে। তবে পরিকল্পিত হত্যার পর গুমের উদ্দেশ্যে নদীতে ফেলার সংখ্যাও কম নয়। কেননা পানিতে দেহ দ্রুত পচে প্রমাণ নষ্ট হয়ে যায়। কখনো কখনো মাছের কামড় বা জাহাজের প্রোপেলারের আঘাতে সৃষ্ট ক্ষতের কারণে হত্যাকাণ্ড কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায় না। এতে তদন্ত কর্মকর্তা ও ফরেনসিক চিকিৎসকরা বিভ্রান্ত হন। সূত্র জানিয়েছেন, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী ও মেঘনা নদীতে সবচেয়ে বেশি লাশ পাওয়া যায়। তবে নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা অঞ্চলে হত্যার পর নদীতে লাশ ফেলার ঘটনা বেশি ঘটে।

জানা গেছে, প্রাথমিক তদন্তে হত্যা মনে না হলে লাশ উদ্ধারের পর পুলিশ সাধারণত অপমৃত্যু মামলা করে। তদন্তে বা ময়নাতদন্তে হত্যার প্রমাণ পাওয়া গেলে পরে সেটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘প্রতিনিয়ত নদীতে হাত-পা বাঁধা, বস্তাবন্দি বা টুকরো লাশ উদ্ধারের যে চিত্র আমরা দেখছি সেটি উদ্বেগজনক। নদীতে লাশ ফেলার পেছনে প্রধান কারণ নির্দিষ্ট সময় পর আর সেই লাশের পরিচয় শনাক্ত সম্ভব হয় না। এ ছাড়া সংশ্লিষ্টদের নজরদারির অভাবে অপরাধীরা লাশ গুমে নদীকে বেছে নিচ্ছে। বিশেষ করে গভীর রাতে ব্রিজ থেকে এবং যেখানে বসতি কম সেখান থেকে লাশ ফেলা সহজ। এ ক্ষেত্রে কোন কোন জায়গা ও ব্রিজ থেকে লাশ ফেলা হচ্ছে তা শনাক্ত করে সিসি ক্যামেরার আওতায় এনে নজরদারি বাড়াতে হবে। নদীপারের মানুষের মধ্যে পুলিশের সোর্স বাড়াতে হবে। নদীতে লাশ ফেলতে ভাড়াটে লোক ব্যবহার হয়ে থাকে। ওই চক্রকে গ্রেপ্তার করা গেলেও খুনির সন্ধান মিলতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘নজরদারিতে যখন নদী নিরাপদ হবে, যখন কেউ অপরাধ করে পার পাবে না তখন লাশ ফেলার জলাশয়ে পরিণত হবে না নদী।’

নৌপুলিশের প্রধান, অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘নদী থেকে লাশ উদ্ধার হলে সর্বাত্মক গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হয়। যে লাশগুলো হত্যাকাণ্ড বলে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয় সেগুলোয় হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। আর যে লাশগুলো পচে যায় সেগুলো উদ্ধারের সময় পাওয়া ক্লু নিয়ে পরবর্তী তদন্ত এগোনো হয়। অনেক ক্ষেত্রে লাশের পরিচয় ও কোনো দাবিদার পাওয়া যায় না। এ ক্ষেত্রে তদন্ত খুবই চ্যালেঞ্জিং হলেও নৌপুলিশ চেষ্টার কোনো কমতি রাখে না।’