চলতি মাস থেকে পুরোদমে শুরু হয়েছে প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপার কাজ; কিন্তু কাগজের মান যাচাইয়ের নামে ইন্সপেকশন এজেন্টের হয়রানির কারণে সেই কাজ ব্যাহত হচ্ছে। দেশের সেরা চার-পাঁচটি পেপার মিলের কাগজও আটকে দিচ্ছে ইন্সপেকশন এজেন্ট।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গুটিকয়েক প্রেস মালিকের কথামতো ইন্সপেকশন এজেন্ট এই হয়রানি করছে। কারণ কাগজ আটকালে প্রেস মালিকরা নির্দিষ্ট ভেন্ডরের কাছ থেকে কাগজ কিনতে বাধ্য হবেন। এ ছাড়া বই ছাপার কাজেও দেরি হবে, ফলে কিছুদিন পরে আর কাগজের মান দেখার সময় থাকবে না।
জানা যায়, এনসিটিবির কর্মকর্তারা মূলত শিক্ষা ক্যাডার থেকে প্রেষণে পদায়ন পান; কিন্তু বর্তমানে বহাল অনেক কর্মকর্তারই সংশ্লিষ্ট কাজে অভিজ্ঞতা নেই।
এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এরই মধ্যে মাঠ পর্যায়ে বই যাওয়া শুরু হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সব কাজ শেষ করা। আমাদের কাছে ইন্সপেকশন এজেন্টের ব্যাপারে অভিযোগ এসেছে।
এনসিটিবি সূত্র জানায়, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য ৩০ কোটি ৬১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১ কপি বই ছাপা হবে। এর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিকের জন্য ৫৭ লাখ ৩০ হাজার ৬৪০ কপি, প্রাথমিক স্তরের জন্য সাত কোটি ৯৪ লাখ ২৪ হাজার ৫৩৮ কপি এবং মাধ্যমিক স্তরের জন্য ২২ কোটি ১০ লাখ ৪২ হাজার ৯২৩ কপি বই ছাপা হবে। এসব বই ছাপাতে সরকারের ব্যয় হবে প্রায় দুই হাজার ১০০ কোটি টাকা।
সূত্র জানায়, প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই ইন্সপেকশনের কাজ পেয়েছে ইনফিনিটি সার্ভে অ্যান্ড ইন্সপেকশন (বিডি)। আর মাধ্যমিক স্তরের বই ইন্সপেকশনের কাজ পেয়েছে কন্টিনেন্টাল ইন্সপেকশন কম্পানি (বিডি) লিমিটেড। এর মধ্যে ইনফিনিটি সার্ভে অ্যান্ড ইন্সপেকশন বিডির বিরুদ্ধে রয়েছে ব্যাপক অভিযোগ। বড় পেপার মিলের মানসম্পন্ন কাগজও তারা পাস করতে গড়িমসি করছে। আর ছোট প্রেসগুলো আরো বেশি সমস্যায় পড়ছে। শুধু জামান ট্রেডিং ও বিসমিল্লাহ পেপার হাউস থেকে কাগজ কিনলে তা নির্দ্বিধায় পাস করা হচ্ছে। এমনকি ওই প্রতিষ্ঠান দুটিও কাগজ পাসের নিশ্চয়তা দিয়েই বিক্রি করছে। বিসমিল্লাহ পেপার হাউসের আগে থেকে পাঠ্যবইয়ের জন্য নিম্নমানের কাগজ বিক্রির বদনাম রয়েছে। তারা মূলত রিসাইকলড কাগজ বিক্রির অন্যতম হোতা। এ ছাড়া কন্টিনেন্টাল ইন্সপেকশন কম্পানি (বিডি) লিমিটেডের কাগজ পরীক্ষার যথাযথ যন্ত্রপাতি নেই। কেমিস্টও নিয়মিত থাকেন না। ফলে কাজের গতি কমে যাচ্ছে।
ইনফিনিটি সার্ভে অ্যান্ড ইন্সপেকশন বিডির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সিরাজিম মুনির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এ বছর একেক রোলের কাগজ একেক রকম পাচ্ছি। এ জন্য আমরা সব রোলের কাগজ পরীক্ষা করছি, যাতে শতভাগ মানসম্পন্ন কাগজে বই ছাপা হয়। এখন দেখা গেছে, ১০০ রোল কাগজের মধ্যে যদি ৬০টা পাস করে, তাহলে তা ছেড়ে দিচ্ছি, যাতে কাজ চলমান থাকে। আমি আজ পর্যন্ত কোনো প্রেসকে ঝামেলায় ফেলিনি। আর আটকে রাখার তো প্রশ্নই ওঠে না।’
প্রেস মালিকরা বলছেন, এনসিটিবিতে একটি মিনি ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু ইন্সপেকশন এজেন্ট যদি কোনো কাগজ পাস না করে, তাহলে এনসিটিবিও সেই রিপোর্ট অনুসারে কাগজ বাতিল করে দেয়। তাহলে এনসিটিবির এই ল্যাব থেকে কী লাভ হলো? যদি ইন্সপেকশন এজেন্টের পাস না করা কাগজ এনসিটিবির ল্যাবে পরীক্ষা করে ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া হতো, তাহলে অনেক সমস্যারই সমাধান হতো। নাম প্রকাশ না করে একজন প্রেস মালিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি ৩০০ টন কাগজ দেশের একটি প্রসিদ্ধ পেপার মিল থেকে কিনেছি, যে মিলের কাগজ কখনো পরীক্ষার প্রয়োজনই হয় না। অথচ সেই কাগজই ইনফিনিটি সার্ভে অ্যান্ড ইন্সপেকশন (বিডি) আটকে দেয়। যদিও পরে আমি চ্যালেঞ্জ করলে তারা আবার সেই কাগজ পাস করে ছেড়ে দেয়। আমরা শুনেছি, তারা অনেকের কাছ থেকেই টনপ্রতি একটা টাকা নিচ্ছে। অথবা কয়েকটি নির্দিষ্ট জায়গার কাগজ কিনলে তা ছাড় দিচ্ছে।’
জানা যায়, ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপার জন্য ৮০ থেকে ৯০ হাজার টন কাগজের প্রয়োজন। এখন ইন্সপেকশন এজেন্ট যদি কাগজের টনপ্রতি দু-এক হাজার টাকা করে আদায় করে তাহলেও কোটি টাকার ওপরে আয় হবে। আবার এই ইন্সপেকশন এজেন্ট বই ছাপার পরও সেই মান দেখে রিপোর্ট দেওয়ার দায়িত্বে। সেখানেও তারা প্রেস মালিকদের জিম্মি করে টাকা আদায়ের চেষ্টা করে। অথচ পাঠ্যবইয়ের কাজ পাওয়া শতাধিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিটিতেই এনসিটিবির তদারকি টিম আছে। এর সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের একাধিক টিম কাজ করছে। এনসিটিবির নিজস্ব ল্যাবও রয়েছে। তাহলে এই ইন্সপেকশন এজেন্ট রাখার যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এ ছাড়া বর্তমানে এনসিটিবির স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী ভালো মানের কাগজের দাম টনপ্রতি এক লাখ ১৮ হাজার থেকে এক লাখ ২৫ হাজার টাকা। এখন কেউ যদি কাগজের প্যারামিটার কিছু কমিয়ে ৭০ শতাংশ ভার্জিন পাল্পের সঙ্গে ৩০ শতাংশ রিসাইকলড কাগজের পাল্পের কাগজ নেয়, তাহলে তা ৯০ হাজার টাকা টনে পাওয়া যাবে। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি ১০০ কোটি টাকার বইয়ের কাজ করে, তাহলে তার প্রায় পাঁচ হাজার টন কাগজের প্রয়োজন হয়। যদি কিছুটা নিম্নমানের কাগজ দেওয়া হয়, তাহলে ১০০ কোটি টাকার কাজে শুধু কাগজ কেনায় ১৫ কোটি টাকা আয় করা সম্ভব।
আরেকজন প্রেস মালিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শতাধিক প্রেসের মধ্যে গুটিকয়েক প্রেস নিম্নমানের কাগজে বই ছাপে। তারা চিহ্নিত হওয়ার পরও এনসিটিবির পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রতিবছর একই কাজ করছে। তবে এ বছর তারা প্রথম দিকে ভালো বই দেওয়ার চেষ্টা করছে। এর পাশাপাশি তারা নিম্নমানের কাগজও সংগ্রহ করছে। সুযোগমতো কিছুদিন পরে তারা সেসব কাগজে বই ছাপবে। শেষ সময়ে তাড়াহুড়ায় স্কুল পর্যায়েও এসব নিম্নমানের বই চলে যাবে। আর এতে পুরো খাতকেই দুর্নামের ভাগীদার হতে হবে।’ বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রাথমিকের ইন্সপেকশন এজেন্ট ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাগজ বেশি রিজেক্ট করছে। প্রতি রোল কাটায় ওয়েস্টেজ বেশি হচ্ছে। আবার কাজ বিলম্বিত হচ্ছে। তবে বিশেষ মিলের কাগজ নিলে একবারেই পাস করানো হচ্ছে। এভাবে দেরি হলে শেষ সময়ে আর ইন্সপেকশন হবে না। এনসিটিবি শুধু বই চাইবে। তখন কেউ কেউ নিম্নমানের কাগজে বই ছেপে মফস্বল এলাকায় পাঠাবে।’