সরকারের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণায় নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নেওয়া সিদ্ধান্ত ও এখতিয়ার নিয়ে পরোক্ষভাবে প্রশ্ন তুলেছেন সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা। তারা বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতি ও সংসদ নির্বাচনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। অন্য নির্বাচনগুলো স্থানীয় সরকার আইন অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হয়। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয় রয়েছে। এ নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সূচি ঘোষণার আগে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেনি ইসি। মঙ্গলবার সচিবালয়ে পৃথক প্রতিক্রিয়ায় তারা এসব কথা বলেন। তারা আরও বলেন, বৃহস্পতিবার ইসিতে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।
এর আগের দিন সোমবার ইসি সাত ধাপে চার হাজার দুইশর বেশি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করে। ওই ঘোষণার পরদিনই সরকার তরফ থেকে এই প্রতিক্রিয়া এলো। অবশ্য প্রতিক্রিয়ায় ইসি অনেকটাই নীরব। কমিশনও জানিয়েছে, আগামীকালের সভা শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
রোববার ও সোমবার দুটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করে সাত ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয় ইসি। প্রথম ধাপ ১২ নভেম্বর, দ্বিতীয় ধাপ ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপ ৩০ ডিসেম্বর, চতুর্থ ধাপ আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি, পঞ্চম ধাপ ৪ ফেব্রুয়ারি, ষষ্ঠ ধাপ ২২ এপ্রিল এবং সপ্তম ও শেষ ধাপের ভোট ২৭ মে সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করে গণমাধ্যমকে জানায় ইসি। পরদিনই মঙ্গলবার প্রথমে এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া দেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। সচিবালয়ে তিনি বলেন-আমরা পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টেলিভিশনগুলোতে দেখেছি নির্বাচন কমিশন কয়েক ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে। আমি দেশবাসীকে জানাতে চাই, এ ব্যাপারে সরকার কিছু জানে না এবং সরকারের সঙ্গে কোনো পত্র যোগাযোগ বা অন্য কোনোভাবে আলোচনা হয়নি।’ তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন স্বাধীন এবং নির্বাচন পরিচালনার সাংবিধানিক ক্ষমতা তাদের রয়েছে। তবে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে প্রস্তুতিমূলক সভা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বৈঠকের পর নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এখানে বাজেটসহ বিভিন্ন বিষয় থাকে। নির্বাচন কমিশন যে তারিখগুলো ঘোষণা করেছে, সে বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বা সরকারের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। সরকার এ ব্যাপারে কিছু জানে না।’
এদিকে, মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজের অগ্রগতি ও সমসাময়িক বিষয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে দেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতি ও সংসদ নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত। অন্য নির্বাচনগুলো আইন অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হয়। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয় রয়েছে। উপদেষ্টা বলেন, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী যেভাবে বলেছেন, সরকারের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে নির্বাচন কমিশন তাদের মতো করে তারিখ ঘোষণা করেছে-আমরা এই বক্তব্যটাকেই সঠিক ধরে নেব। এই নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে সরকারের সঙ্গে কোলাবরেট করেই এটা করতে হবে। তিনি আরও বলেন, এটাকে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে কোনো ‘গ্যাপ’ হিসাবে দেখার কারণ নেই।
উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচন কমিশনের দেওয়া সময়সূচি নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে। নির্বাচন কমিশন যে তারিখ দিয়েছে, ওই তারিখে নির্বাচন হবেই-এটা বলা যাবে না। তিনি বলেন, সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব এখতিয়ার রয়েছে এবং সংবিধান অনুসরণ করে তারা নির্বাচন আয়োজন করতে পারে। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়টি রয়েছে।
ইউপি নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশন আইন ভঙ্গ করেছে কিনা-এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমি আইন ভঙ্গ করেছে এভাবেও বলতে চাই না। আপনারা নির্বাচন কমিশনের কাছেও একটু ভেরিফাই করুন। তাদের বক্তব্য নিলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। তিনি বলেন, পার্টিসিপেটরি (অংশগ্রহণমূলক) ইলেকশন হবে কিনা, একটু অপেক্ষা করুন। ওটা হতে বাধ্য। বিভিন্ন দল তাদের সমর্থিত প্রার্থী দিচ্ছে। একটি নতুন দলও তাদের সম্ভাব্য প্রার্থী ঘোষণা করেছে। সুতরাং পার্টিসিপেটরি ইলেকশন হবেই।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে ঢাকা শহরের মেগা প্রজেক্টের কারণে উদ্ভূত যানজট রোধসংক্রান্ত এক সভা শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও ইসির এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, সাংবিধানিকভাবে ইসির দুটি দায়িত্ব-রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও সংসদ নির্বাচন। স্থানীয় সরকার আইন অনুসারে স্থানীয় নির্বাচন হবে। এ আইনে এমন কিছু নেই, যেখানে বলা আছে সরকারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ব্যতিরেকে করতে পারে; এটি সমন্বয়ের ব্যাপার। তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে ১৭ সেপ্টেম্বর আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবরা থাকবেন। সে সভার সিদ্ধান্তের আলোকে ভবিষ্যতে নির্বাচনের তফসিল সাজাবে ইসি। সে পর্যন্ত তো আমরা অপেক্ষা করি।
মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টার বক্তব্যের প্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশনারদের অবস্থান জানতে চাইলে তারা সরাসরি উত্তর দেননি। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর মন্তব্যের বিষয়ে ইসি সচিব বলেন, ‘উনি যেটা বলেছেন সেটা শিরোধার্য। তবে এ বিষয়ে পালটা কোনো মন্তব্য করার ধৃষ্টতা আমি দেখাব না। নো কমেন্টস ফ্রম মাই সাইড।’ অপর প্রশ্নের জবাবে আখতার আহমেদ বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে এটি নিশ্চিত। তবে নির্বাচন কবে এবং কী পদ্ধতিতে বা কোন পর্যায়ে হবে, তা নিয়ে কমিশনে গত দুই দিন ধরে প্রাক-প্রস্তুতিমূলক আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, এর ধারাবাহিকতায় সোমবার একটি টেন্টেটিভ (সম্ভাব্য) সময়সূচি করা হয়েছে। সেখানে পাঁচটি ধাপে নির্বাচন আয়োজনের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি দুটি ধাপ রিজার্ভ রাখা হয়েছে। তবে এটি একেবারেই প্রাথমিক সময়সূচি। সচিব বলেন, ১৭ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে বৈঠক হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ইনপুট নেওয়া হবে। এরপর এসব মতামতের ভিত্তিতে কমিশন নির্বাচনের সময়সূচি চূড়ান্ত করবে।