বাংলাদেশের অন্যতম বড় শ্রমবাজার মালয়েশিয়ায়। তবে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য সুখকর নয়। যতবারই দেশটির শ্রমবাজার খুলেছে, ততবারই নানা দুর্নীতি আর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, নির্দিষ্ট এজেন্সির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ আর প্রভাবশালী একটি বলয় গড়ে মনোপলি ব্যবসার অভিযোগ বহু পুরোনো।
২০১৬ সালে ১০ এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানো থেকে শুরু করে ২০২২ সালে তা বাড়িয়ে ১০১ এজেন্সি করা হয়। দুই দফাতেই বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এরপর ২০২৪ সালে বন্ধ হয়ে যায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। এসব ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে শতাধিক মামলাও করা হয়েছে। এরপর বহু জল্পনা-কল্পনা, দেনদরবার। অবশেষে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার খবর শোনা যাচ্ছে। তবে এতসব বাজে অভিজ্ঞতার পরও সেই পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের পথেই হাঁটছে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল। এবার মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে নতুন করে ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে মূল এজেন্সি হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, নতুন তালিকাতেও পুরোনো সিন্ডিকেটের ছায়া, নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ না করা বেশিরভাগ এজেন্সি রয়েছে তালিকায়। মালয়েশিয়ার দেওয়া ১০টি শর্তের মধ্যে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত থাকলেও অনুমোদন পেয়েছে চার বছরের এজেন্সি। ১০ হাজার বর্গফুট অফিস থাকার শর্তও পূরণ করেনি তালিকাভুক্ত এজেন্সিগুলো। এমনকি ৫ বছরে ৩ হাজার কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতার কথা বলা হলেও মাত্র ২০০ কর্মী পাঠানো এজেন্সিও রয়েছে তালিকায়। এ ছাড়া কোনো এজেন্সির বিরুদ্ধে জবরদস্তিমূলকভাবে শ্রমে নিয়োগ, মানব পাচার, শ্রম আইন লঙ্ঘন, জোরপূর্বক অর্থ আদায়, অর্থ পাচার বা অন্য কোনো আর্থিক অপরাধ এবং অনৈতিক অভিবাসন কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার রেকর্ড না থাকার শর্ত রয়েছে। তারপরও মানব পাচারের অভিযোগে দুদকের তালিকাভুক্ত অন্তত চারটি এজেন্সি অনুমোদন পেয়েছে।
তথ্যানুযায়ী, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ২০০৮ সালে বন্ধ হওয়ার দীর্ঘ আট বছরের দেনদরবারে ২০১৬ সালে চালু হয়। এরপর দুর্নীতির অভিযোগে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া বন্ধ করে দেয় দেশটি। এরপর দীর্ঘ ৩ বছর ফের চলতে থাকে দেনদরবার। পরে ২০২১ সালের ১৮ ডিসেম্বর নতুন সমঝোতা চুক্তির পর বাজারটি ফের খোলে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালের আগস্টে বাংলাদেশি কর্মীরা মালয়েশিয়া যেতে শুরু করেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ১ জুন আবার বন্ধ হয়ে যায় এ শ্রমবাজার।
২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে সব কর্মী নিয়োগের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সরকার নির্ধারিত খরচ ৩৩ হাজার ৩৭৫ টাকা হলেও কর্মীদের কাছ থেকে ২ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে ওই সময়। এরপর প্রায় ৩ বছর বন্ধ থাকার পর ২০২২ সালে বাজারটি আবার খুললেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়। প্রথমে ২৫ ও পরে পর্যায়ক্রমে তা বাড়িয়ে ১০০টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে কাজ দেওয়া হয়। যেগুলোর মালিক ছিলেন তৎকালীন এমপি-মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতারা। সে সময় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এ সময় প্রত্যেক কর্মীর গড়ে ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা খরচ হয়েছে বলে জানা যায় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ভেরিটে ইনকরপোরেটেডসহ পাঁচটি সংস্থার এক গবেষণায়। এসব ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে ১০০টি মামলাও করা হয়। আবারও সেই একই চক্রের মাধ্যমে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলায় কমার পরিবর্তে অভিবাসন ব্যয় আরও বাড়তে পারে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তথ্য বলছে, বাংলাদেশে আড়াই হাজারের বেশি বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি থাকলেও আগের সিন্ডিকেটে তারা সরাসরি কাজের সুযোগ পেত না। তাদের চাহিদাপত্র ওই ১০০টি এজেন্সির মাধ্যমে ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে (এফডব্লিউসিএমএস) প্রসেস করতে হতো। সহযোগী এজেন্সিগুলোকে এই মূল এজেন্সিকে প্রসেস ফি দিতে হতো। এভাবেই মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগ করা হয়। এই চক্রের পেছনে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত দাতোশ্রি আবদুল আমিনের প্রতিষ্ঠান সিনারফ্ল্যাক্স ও বেস্টিনেটের নাম বারবার এসেছে। জনশক্তি খাতে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত রয়েছে, মালয়েশিয়া সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণক মূলত দুই আমিন। তারাই মালয়েশিয়া শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণ করেন। এর মধ্যে একজন জনশক্তি রপ্তানির প্রতিষ্ঠান ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনালের মালিক ও সিন্ডিকেটের প্রধান রুহুল আমিন স্বপন। আর মালয়েশিয়া অংশের নিয়ন্ত্রক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত দাতোশ্রি আবদুল আমিন। মালয়েশিয়া শ্রমবাজারের পুরো নিয়ন্ত্রণ এই দুজনের হাতে। জানা গেছে, এবার এফডব্লিউসিএমএসে ২৫টি মূল এজেন্সি, তাদের অধীনে ১০টি করে ২৫০টি ‘অ্যাসোসিয়েট রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি’ বলা হয়েছে। এ ছাড়াও বোয়েসেলের অধীনে ৬২টিসহ মোট ৩৩৮টি এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। সহযোগী এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করলেও ধোঁয়াশায় রয়েছে মন্ত্রণালয়-ব্যবসায়ীরা।
সূত্রমতে, এবারের ২৫টি এজেন্সির মধ্যে বর্তমান প্রভাবশালীদের ১৪টি এজেন্সি অনুমোদন পেয়েছে। এ ছাড়াও ৭টি এজেন্সি নিয়ন্ত্রণ রয়েছে মালয়েশিয়া সিন্ডিকেটের বাংলাদেশ অংশের নিয়ন্ত্রক রুহুল আমিন স্বপনের ঘনিষ্ঠরা। আর বাকি চারটি এজেন্সি ‘ডামি’। অর্থাৎ এই ব্যক্তিরা গতবারের সিন্ডিকেটেও ছিল। এবার ভিন্ন নামে ভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে সিন্ডিকেটে জায়গা পেয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর ফলে সহযোগী এজেন্সিগুলোকে মূল এজেন্সিকে প্রসেস ফি দিতে হবে। ফলে অভিবাসন ব্যায় অনেক বেড়ে যাবে। এতে করে আরও ভোগান্তি বাড়বে শ্রমিকদের।
এবারও বেশিরভাগই অনভিজ্ঞ এজেন্সি নির্বাচিত ২৫টি এজেন্সির বিদেশে কর্মী পাঠানোর সব তথ্য সংগ্রহ করেছে কালবেলা। সেখানে দেখা গেছে, ২৫টির মধ্যে ১৭ এজেন্সির মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। বাকি ৮টি এজেন্সি মিলে কর্মী পাঠিয়েছে ১ হাজার ৬১২ জন, যার মধ্যে ৫টি এজেন্সির নামে কর্মী গেছে ১১, ৭৪, ১০০, ১৫০ ও ২০২ জন করে। অন্য ৩টি থেকে গেছে ৪৩৬, ৩৩৩ ও ৩০৬ জন করে। এ ছাড়াও ৭টি এজেন্সি অনুমোদনের পর থেকে প্রতিটি ৩ হাজারেরও কম শ্রমিক পাঠিয়েছে। যেখানে সর্ব শেষ ৫ বছরে বিদেশে ৩ হাজার কর্মী পাঠানোর শর্ত রয়েছে।
এই ৭টি এজেন্সি মিলে সর্বসাকুল্যে বিদেশে লোক পাঠিয়েছে মোট ৮ হাজার ২৬০ জন। যার মধ্যে অনুমোদনের পর থেকে বাংলাদেশ ওয়ান ওভারসিজ পাঠিয়েছে ৮০৯, আল হায়াত ওভারসিজ পাঠিয়েছে ৪০৪ জন, ভালুকা ওভারসিজ ২৩৫ জন, ব্রাদার ট্রেডিং অ্যান্ড কন্ট্রাকটিং লিমিটেড পাঠিয়েছে ১৪৫৬ জন, কান্ট্রি এমপ্লয়মেন্ট পাঠিয়েছে ২৫৫৬ জন, জুয়েল রিংকু এন্টারপ্রাইজ ২৮২৯ জন ও দি অ্যাংকর কেয়ার গ্লোবাল মাইগ্রেশন অ্যান্ড কনসালট্যান্ট লিমিটেড পাঠিয়েছে মাত্র ৩৭১ জন।
মালয়েশিয়া থেকে দেওয়া শর্তে দেশটিতে শ্রমিক পাঠানোর অভিজ্ঞতার কথা বলা হলেও মালয়েশিয়ায় কোনো কর্মী পাঠানোরই অভিজ্ঞতা নেই এমন ১৭টি এজেন্সিও এবার তালিকাভুক্ত হয়েছে। নির্বাচিত ২৫টির মধ্যে যে ১৭টির মালয়েশিয়ায় কোনো কর্মীই পাঠানোর অভিজ্ঞতা নেই সেগুলো হলো— বাংলাদেশ ওয়ান ওভারসিজ, বেঙ্গল হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট, অন্বেষা এয়ার ইন্টারন্যাশনাল, আর্থ স্মার্ট বাংলাদেশ, খান জাহান আলী ওভারসিজ, মাদারল্যান্ড ওভারসিজ, এ-প্লাস ইন্টারন্যাশনাল, আল হায়াত ওভারসিজ, ভালুকা ওভারসিজ, চাঁদপুর ইন্টারন্যাশনাল, গডনেস সার্ভিসেস, জুয়েল রিংকু এন্টারপ্রাইজ, সাতক্ষীরা ইন্টারন্যাশনাল, ম্যানগ্রোভ ক্যারিয়ার লিংক, তানিয়া ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, ভেলী ট্রেড ও আত তাকওয়া।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে বেশ কয়েকটি রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তবে ওয়েবসাইটে দেওয়া বেশিরভাগ নম্বরই প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মচারীদের। ফোন দেওয়া হলে বাংলাদেশ ওয়ান ওভারসিজের মালিকের ছোট ভাই পরিচয়দানকারী মো. সিরাজুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, ‘আমরা মালয়েশিয়ায় অনেক লোক পাঠিয়েছি। তবে এই এজেন্সির মাধ্যমে নয়। ভাইয়ের আরও ৮-১০ এজেন্সি আছে। সেগুলোর মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে।’ মানব পাচারের অভিযোগের বিষয়টি অস্বীকার করে জেনারেল ট্রেডিং কোম্পানি লিমিটেডের মালিক মো. খলিলুর রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে দুদক মিথ্যা কিশোরী পাচারের অভিযোগ দিয়েছে। আমি কোনো নারীই পাঠাইনি। আমার কাছে বিএমইটি জানতে চেয়েছিল, আমি তাদের উত্তর দিয়েছি।’ আপনার লাইসেন্স থেকে আপনি কোনো নারীই পাঠাননি—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘না, পাঠিয়েছি। তবে ফাতেমা নামের যেই নারীকে পাচারের দায়ে আমাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে সেই নারীকে পাঠাইনি।’
অনুমোদনের পর থেকে সর্বসাকুল্যে ৪০৪ জন কর্মী পাঠানোর আল-হায়াদ ওভারসিজের মালিক মো. আলাউদ্দিন কবির কালবেলাকে বলেন, ‘আমি জানি না। অনুমোদন সরকার দিয়েছে। তাদের গিয়ে জিজ্ঞাসা করেন।’
মাত্র ২৩৫ জন কর্মী পাঠানো ৪ বছর বয়সী রিক্রুটিং এজেন্সি ভালুকা ওভারসিজ। বিস্তারিত জানতে ওয়েবসাইটের দেওয়া নম্বরে ফোন দিলে এক ব্যক্তি ধরে নিজেকে ভালুকা ওভারসিজের অ্যাডমিনিস্ট্রিটিভ অফিসার পরিচয় দেন। প্রশ্ন শুনে তিনি এই বিষয়ে কিছু জানেন না এবং মালিক ফোন দেবে বলে প্রতিবেদককে জানান। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভালুকা ওভারসিজ থেকে কেউ ফোন দেয়নি।
জানা গেছে, এর আগে অনভিজ্ঞ এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর অনুমোদন দিয়েছিল মালয়েশিয়া। সেবার অনুমোদন পায় আওয়ামী লীগ নেতাদের মালিকানাধীন ও তাদের পছন্দের এজেন্সি। ব্রাদার্স ইন্টারন্যাশনালের মাত্র ৫২ জন এবং ইম্পেরিয়াল রিসোর্সের ৩২৪ জন কর্মী বিদেশে পাঠানোর অভিজ্ঞতা ছিল মালয়েশিয়ার তালিকায় নাম ওঠানোর আগে। ফেনী-২ আসনের তৎকালীন এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারীর প্রতিষ্ঠান স্নিগ্ধা ওভারসিজ লিমিটেডের (আরএল-১৫৫১) ছিল মাত্র ৯১ জন কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা। ঢাকা-২০ আসনের আওয়ামী লীগের এমপি বেনজির আহমদের প্রতিষ্ঠান আহমদ ইন্টারন্যাশনালের (আরএল-১১৪৬) আগের সাত বছরে মাত্র ৩৮৭ জন কর্মী বিদেশ পাঠিয়েছিল। পরে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বেশুমার দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। একপর্যায়ে ২০২৪ সালের ৩১ মে শ্রমবাজার বন্ধ করে মালয়েশিয়া সরকার। পরে ক্ষমতার পালাবদলে গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া সফরে দেশটির শ্রমবাজার খোলার অনুরোধ জানান। এর প্রায় দুই মাস দেশটি ২৫টি এজেন্সি বাছাই করে তালিকা প্রকাশ করে। এখন নতুন করে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার কথা শোনা যাচ্ছে।
মানব পাচার মামলায় অভিযুক্ত ৪ এজেন্সি তালিকায়:
গত বছরের ২৬ মে কালবেলায় ‘গৃহকর্মীর আড়ালে কিশোরী পাচার’ শীর্ষক ধারাবাহিক তিন পর্বের একটি সিরিজ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সেই প্রতিবেদন প্রকাশের পরে দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে বিএমইটিতে একাধিকবার অভিযান পরিচালনা করা হয়। পরে গত বছরের ৩ জুলাই দুদকের ঢাকা জেলা সমন্বিত কার্যালয় থেকে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) চার কর্মকর্তা এবং পাঁচটি এজেন্সির মালিক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এই মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, বিভিন্ন এজেন্সি পরস্পর যোগসাজশে মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মী হিসেবে পাঠানোর জন্য নারীদের ভুয়া পাসপোর্ট ব্যবহার করে। প্রকৃত আবেদনকারীর পরিবর্তে অন্য নারীর পাসপোর্ট নম্বর দিয়ে আবেদন জমা দিয়ে তা বিএমইটির ডেটাবেজে যাচাই না করে ছাড়পত্রের অনুমোদন দেওয়া হয়। এ ছাড়া সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে ২৫ বছরের কম বয়সী চারজন অপ্রাপ্তবয়স্ক নারীকে ছাড়পত্র দেওয়ারও প্রমাণ পাওয়া যায়, যা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র লঙ্ঘন করে করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, এ জালিয়াতির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন। অভিযান শেষে সংরক্ষিত রেকর্ডপত্র যাচাই করে প্রতারণা ও জালিয়াতির অপরাধের প্রমাণ মেলে। এ মামলার তদন্তে গিয়ে আরও ৫৭টি রিক্রুটিং এজেন্সির যোগসাজশ পায় দুর্নীতি দমন কমিশন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৩ জুলাই চিহ্নিত ৫৭ এজেন্সির তথ্য চেয়ে দুদকের সহকারী পরিচালক এবং তদন্ত কর্মকর্তা বিএমইটি মহাপরিচালককে একটি চিঠি দেন। এ তালিকায় মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর কাজ পাওয়া চার এজেন্সির নাম রয়েছে। এগুলো হলো রিফা ইন্টারন্যাশনাল (নিবন্ধন নম্বর ৬৯৩), জেনারেল ট্রেডিং (নিবন্ধন নম্বর ৩২০), গডনেস সার্ভিস লিমিটেড (নিবন্ধন নম্বর ২০৬৮) ও ভেলি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল (নিবন্ধন নম্বর ১২৬৮)। এ ছাড়া কালবেলায় ওই প্রতিবেদনের ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে গত বছরের ১৩ জুলাই ‘বেপরোয়া ৫৩ এজেন্সি’ শীর্ষক একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। সেই প্রতিবেদনেও গৃহকর্মীর আড়ালে নিয়মকানুন না মেনে বিদেশে কিশোরী পাচারের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া ৫৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্যেও এ চারটি ছিল। যদিও মালয়েশিয়া থেকে দেওয়া ১০টি শর্তের ৬ নম্বরে রয়েছে— এজেন্সির বিরুদ্ধে জবরদস্তিমূলকভাবে শ্রমে নিয়োগ, মানব পাচার, শ্রম আইন লঙ্ঘন, জোরপূর্বক অর্থ আদায়, অর্থ পাচার বা অন্য কোনো আর্থিক অপরাধ এবং অনৈতিক অভিবাসন কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার রেকর্ড থাকা যাবে না।
জানা গেছে, অতীতে শুধু বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ এজেন্সি বাছাই হলেও এবার মালয়েশিয়া ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইনসহ আট দেশের ক্ষেত্রে এজেন্সি নির্ধারণ করেছে এফডব্লিউসিএমএস। এটি মালয়েশিয়া সরকারের অনুমোদিত প্ল্যাটফর্ম, যা পরিচালনা করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে বেস্টিনেট নামের প্রতিষ্ঠান। এ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগে ভিসা কেনাবেচা, নিবন্ধনে চাঁদা নেওয়াসহ নানা অভিযোগ ছিল আগের দুবার। হাজার হাজার কোটি টাকা দুর্নীতি ও পাচারের অভিযোগের পর এই শ্রমবাজার বন্ধ হয়। তৃতীয়বারের মতো একই পদ্ধতিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
বিস্তারিত জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোখতার আহমেদের সঙ্গে। সচিবের নম্বরে ফোন দিলে সেটি তার একান্ত সচিব (সিনিয়র সহকারী সচিব) মো. তরিকুল ইসলাম রিসিভ করে সচিব মিটিংয়ে আছেন বলে পরে যোগাযোগ করতে বলেন। তবে পরবর্তী সময়ে তাকে ফোন দেওয়া হলে আর রিসিভ করেননি।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো অতিরিক্ত মহাপরিচালক (যুগ্ম সচিব) মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান খান কালবেলাকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। আমাদের কিছুই জানানো হয়নি। মন্ত্রণালয় থেকেও আমাদের কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। আমাদের কাছে এখনো কোনো চিঠিই আসেনি। আমরা এ বিষয়ে কোনো কিছুই অবগত নই।’