ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের (মসিক) সরকারি কেনাকাটায় নানা অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে ভারী যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় টেন্ডারের শর্ত ও সরবরাহ করা যন্ত্রের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতি লক্ষ্য করা গেছে। জানা গেছে, ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর সাত বছরে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন প্রায় ১০০ কোটি টাকার ভারী যন্ত্রপাতি কেনে। সোহেল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড এবং এইচটিএমএস এসব যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে। এজন্য মোট ৭টি টেন্ডার হয়, তার মধ্যে ৬টিই পায় এইচটিএমএস। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এইচটিএমএসের মালিক সাবেক সহকারী সচিব আফতাব আহমেদ। আগে তার প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল এএসএল। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০১৯ সালে বিভিন্ন খাতে অনিয়মের অভিযোগে যে ১৪টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করেছিল তার মধ্যে আফতাব আহমেদের এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানও ছিল।
অভিযোগ রয়েছে, কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার পর নতুন নামে আফতাব আহমেদের এইচটিএমএস কার্যক্রম শুরু করেছে। এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪ সালের আগস্টে ১৩ টনের একটি নতুন হুইল ডেজার কেনার জন্য টেন্ডার আহ্বান করেছিল ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন। কার্যাদেশ পেয়েছিল সোহেল ইঞ্জিনিয়ারিং। প্রতিষ্ঠানটি সরবরাহ করেছিল রাইনো ব্র্যান্ডের হুইল ডোজার। টেন্ডারের শর্ত ছিল, যন্ত্রটি যুক্তরাষ্ট্রসহ নির্ধারিত ২৩টি দেশের যেকোনো একটি দেশের উৎপাদিত হতে হবে। ওই তালিকায় চীনের নাম ছিল না।
কিন্তু তথ্যানুসন্ধানে পাওয়া নথিতে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের রিহিনো ইক্যুইপমেন্টস নিজেদের আরডব্লিউডি১৩২-এস মডেলের ডেজার চীনের চ্যাংঝু রিহিনোসিরোস ইউনিকোরনিস মেশিনারি (Changzhou Rhinoceros Unicornis Machinery) থেকে আমদানি করেছে। পরে ওই ব্র্যান্ডের যন্ত্রই বাংলাদেশে সরবরাহ করা হয়েছে। জানা গেছে, গত জুনেও একই ব্র্যান্ডের যন্ত্রপাতি সরবরাহে প্রায় ১৫ কোটি টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। সর্বশেষ টেন্ডারেও উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় চীনের নাম না থাকলেও ওই একই ব্র্যান্ডের পণ্য সরবরাহের প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রাপ্ত অভিযোগ অনুযায়ী, রাইনো ইক্যুইপমেন্টস (Rhino Equipments)-এর দেওয়া নথিতে ফ্লোরিডার একটি ঠিকানাকে কারখানা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে ওই ঠিকানাকে ‘গ্লোবাল কমার্সিয়াল অ্যান্ড অপারেশনাল অফিস’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে কোনো উৎপাদন কারখানার তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানটি আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব ইক্যুইপমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারারস (এইএম)-এর সদস্য বলেও দাবি করেছে। তবে এইএম-এর ওয়েবসাইটে রাইনো ইক্যুইপমেন্টস নামে কোনো সদস্যের তথ্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে মিয়ামি মিউনিসিপ্যালিটির তথ্য অনুযায়ী, রাইনো ইক্যুইপমেন্টস মূলত একটি মারচেন্ট এবং হোলসেল কোম্পানি। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি নিজে যন্ত্রপাতি তৈরি না করে অন্য দেশ থেকে পণ্য কিনে বিক্রি করে।
উল্লেখ্য, গত জুনের টেন্ডারে সর্বনিম্ন দরদাতা ছিল বাংলাদেশ সায়েন্স হাউস। প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাবিত জাপানি কোমাটসু ব্র্যান্ডের যন্ত্রকে টেকনিক্যালি রেসপন্সিভ নয় বলে উল্লেখ করেছিল সিটি করপোরেশন। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, টেন্ডারের শর্ত অনুযায়ী হাইড্রোলিক ট্যাংকের ধারণক্ষমতা কমপক্ষে ৭০ লিটার হওয়ার কথা থাকলেও সায়েন্স হাউসের প্রস্তাবিত যন্ত্রে তা ছিল ৬৯ লিটার। সিসিও ছিল অনেক কম। নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সোহেল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রস্তাবিত রাইনো যন্ত্রে হাইড্রোলিক ট্যাংকের ধারণক্ষমতা ছিল মাত্র ৪০ লিটার।
যদিও সায়েন্স হাউসের দরের থেকে সোহেল ইঞ্জিনিয়ারিয়ের দর মাত্র ৪ লাখ টাকা বেশি। এ কারণে সায়েন্স হাউস গত ২৯ জুলাই বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (বিপিপিএ) কাছে রিভিউ আপিল করে। পরে রিভিউ প্যানেল সিদ্ধান্তে জানায়, সব শর্ত পূরণ করে সোহেল ইঞ্জিনিয়ারিং সর্বনিম্ন দরদাতা। অন্যদিকে টেন্ডারের সব শর্ত সায়েন্স হাউস পূরণ করেনি। সোহেল ইঞ্জিনিয়ারিয়ের কর্মকর্তারা জানান, তারা যা কিছু সরবরাহ করবেন তা জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদিত এবং সেগুলো টেন্ডারের সমস্ত শর্ত মেনেই।
জানা গেছে, বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, সড়ক ও জনপথ বিভাগসহ সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শত শত কোটি টাকার যন্ত্রপাতি সরবরাহের কাজ পেয়েছে এইচটিএমএস। ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনেও ভ্যাকুয়াম লোডার, হুইল লোডারসহ একাধিক ভারী যন্ত্রপাতি সরবরাহের কার্যাদেশ পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এ বিষয়ে এইচটিএমএস-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আফতাব আহমেদ বলেন, ‘আমি এসব দেখি না। এগুলো অন্য একজন দেখেন।’ ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী ও টেন্ডার কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলাম মিয়া এ নিয়ে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।