Image description
পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত

পাঠদানের মান, পেশাদারিত্ব ও একাডেমিক আচরণ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাঠগড়ায় তুলেছেন শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) চালু করা ‘ডিইউ ইভাল্যুয়েশন’ নামে একটি ওয়েবসাইটে শিক্ষার্থীরা নিজেদের বিভাগের শিক্ষকদের মূল্যায়ন করছেন। এই মূল্যায়নের ভিত্তিতে দেওয়া হচ্ছে শিক্ষকদের রেটিং। এ মূল্যায়নে কোনো কোনো শিক্ষক ৫-এর মধ্যে ৫, আবার কোনো শিক্ষক ১ বা ২ ‘রেটিং’ পেয়েছেন। শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও সিংহভাগ শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষক মূল্যায়নের এই উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

তাদের ভাষ্য, শিক্ষক মূল্যায়ন ডাকসুর এখতিয়ারে পড়ে না। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নীতিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রয়েছে। মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর জন্য সংশ্লিষ্টদের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে শিক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এবং বাংলাদেশের কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক মূল্যায়নের সুযোগ রয়েছে। ডাকসুর এই উদ্যোগ ভালো হলেও তা নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি হবে। তাই সেটা না করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মাধ্যমে শিক্ষক সম্পর্কে ছাত্রদের স্বচ্ছভাবে মতামত নেওয়ার একটা পদ্ধতি থাকা অবশ্যই দরকার।

গত বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় ডাকসু ভবনে সংবাদ সম্মেলন করে ওয়েবসাইটটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন ডাকসুর নেতারা। ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য উম্মে উসওয়াতুন রাফিয়ার তত্ত্বাবধানে ওয়েবসাইটটি চালু করা হয়েছে।

উদ্বোধনের সময় তিনি বলেন, ‘ডাকসুর নির্বাচনি ইশতেহারে শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ করেও বিষয়টির প্রশাসনিক সমাধান না হওয়ায় ডাকসুর উদ্যোগে ওয়েবসাইটটি চালু করা হয়েছে।’

ডাকসু নেতারা জানিয়েছেন, তিন মাসের মূল্যায়ন ও মতামতের ভিত্তিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগের শিক্ষকদের নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হবে। সেই প্রতিবেদন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দেওয়া হবে বলে।

কীভাবে মূল্যায়ন করছেন শিক্ষার্থীরা ডিইউ ইভাল্যুয়েশন ওয়েবসাইটটি ঘুরে দেখা গেছে, শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য বেশ কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয় রাখা হয়েছে। কোর্সের কাঠামো ও পাঠ্যসূচি, শিক্ষাদান পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা, পরীক্ষা ও মূল্যায়ন, পেশাদারিত্ব এবং সার্বিক সন্তুষ্টির মতো ১৫টি বিষয় রাখা হয়েছে। শিক্ষক কতটা স্পষ্টভাবে পড়ান, প্রশ্ন ও আলোচনায় উৎসাহ দেন কি না, শিক্ষার্থীদের প্রতি সম্মানজনক আচরণ করেন কি না এবং সময়মতো ক্লাস নেন কি না এসব বিষয়েও শিক্ষার্থীরা মতামত দিতে পারছেন।

ডাকসুর ঘোষণা অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরবর্তী সব ব্যাচের শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারছেন। একাডেমিক ই-মেইল দিয়ে নিবন্ধন করলে ওই ঠিকানায় একটি কোড পাঠানো হচ্ছে। সেই কোড ব্যবহার করে প্ল্যাটফর্মে প্রবেশের পর শিক্ষার্থীরা শুধু নিজ বিভাগের শিক্ষকদের মূল্যায়ন করছেন। মূল্যায়নকারীর পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ডাকসুর এই উদ্যোগে শিক্ষকরা নাখোশ হলেও খুশি অনেক শিক্ষার্থী। সূর্য সেন হলের শিক্ষার্থী মামুন অর রশিদ বলেন, ডাকসু সদস্য উম্মে ওয়াসাতুন রাফিয়া শিক্ষকদের শিক্ষাদানের প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করতে একটি অসাধারণ অনলাইন সাইট তৈরি করেছেন। শিক্ষকদের মূল্যায়নের এই ইভ্যালুয়েশন সাইটে শিক্ষকদের মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সব সময় শ্রেণিকক্ষে পড়ানোর ব্যাপারে সচেতন থাকবেন। এর আগে অনেক শিক্ষককে ক্লাসে অমনোযোগী এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করতে দেখা গেছে, এ সাইটটি শিক্ষকদের জবাবদিহির আওতায় আনবে।

তিনি বলেন, ডাকসু অনেক চেষ্টা করেও প্রশাসনকে দিয়ে এই ব্যবস্থা চালু করতে পারেনি। তাই তারা বাধ্য হয়ে নিজেরাই করেছে। প্রশাসন আসলে চায় না যে শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু হোক। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষকই দুর্নীতির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত ও অযোগ্য। শিক্ষার্থীদের দ্বারা মূল্যায়িত হলে তাদের মুখোশ খসে পড়বে।

মূল্যায়নে কোনো শিক্ষকের রেটিং ৫-এ ৫, কারও ২-এর নিচে গতকাল শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ওয়েবসাইটিতে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৬টি বিভাগের ২ হাজার ৪৫ শিক্ষকের বিষয়ে ৪ হাজার ৮৭৯ জন শিক্ষার্থী মূল্যায়ন করেছেন। ওই সময় পর্যন্ত মোট রিভিউ জমা পড়েছে ৯ হাজার ৩৮২টি। এর মধ্যে ৭০৮ জন শিক্ষকের মূল্যায়ন রেটিং ওয়েবসাইটে দেখা গেছে। রেটিংয়ে কোনো কোনো শিক্ষক ৫-এর মধ্যে ৫ পাচ্ছেন। আবার অনেক শিক্ষকের রেটিং গ্রেড ২-এর নিচে। তবে রেটিংয়ে ৫ পাওয়া শিক্ষকের রিভিউ কম বলে দেখা গেছে ওয়েবসাইটে।

ওয়েবসাইটির তথ্য বিশ্লেষণ দেখা যায়, ৭০৮ জন শিক্ষকের মধ্যে ৪-৫ রেটিংয়ের মধ্যে রয়েছেন ৩১২ জন শিক্ষক, ৩-৪ রেটিংয়ের মধ্যে রয়েছেন ১৭৪ জন শিক্ষক, ২-৩ রেটিংয়ের মধ্যে রয়েছেন ১২৭ জন শিক্ষক আর রেটিংয়ে ২-এর নিচে রয়েছেন ৯৫ জন শিক্ষক।

আরও দেখা যায়, ওই সময় সর্বোচ্চ ১৩৫টি রিভিউ পেয়ে ৪.৯০ রেটিংয়ে আছেন ফিন্যান্স ডিপার্টমেন্টের সহকারী অধ্যাপক কাজী গোলাম রব্বানী মওলা (৪.৯০)। রিভিউ অনুযায়ী পরের অবস্থানে রয়েছেন একই বিভাগের অধ্যপক শবনাজ আমিন (৪.৮৭), ইংরেজি সাহিত্য বিভাগের নিশাত আতিয়া শৈলী (৪.৮৭), ফিন্যান্স বিভাগের মো. ইমরান হোসেন (৪.৯৬), অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের শাহ আলম (৪.৮৭), দর্শন বিভাগের মোহাম্মদ ওয়াহিদুল আলম (৪.৯৩), মার্কেটিং বিভাগের মো. তানভীর আলম হিমেল (৪.৯৮), পরিসংখ্যান বিভাগের ড. ওয়াসিমুল বারী (৪.৯৬) ও বিকাশ পাল (৪.৮৮), ব্যবস্থাপনা বিভাগের ড. শাহ রিদওয়ান চৌধুরী (৪.৯৭), গণিত বিভাগের আদিব শাহরিয়ার জামান (৪.৮৮), অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের রায়হান সুবহান (৪.৮৩)।

অন্যদিকে রেটিংয়ে ২-এর নিচে থাকা শিক্ষকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—ফিন্যান্স বিভাগের মোছা. নুসরাত খান (১.২৭), অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের ড. মিনহাজ ফেরদৌস (১.৪৩), ইংরেজি বিভাগের তাসনিম সিরাজ মাহবুব (১.১৯), লোকপ্রশাসন বিভাগের শেহরিন আমিন ভূঁইয়া (১.৪৯), পরিসংখ্যান বিভাগের নওশীন তাবাসসুম সোহানা (১.৪৫), মার্কেটিং বিভাগের আলী মো. কাউসার (১.৬৩), অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিহাগের সানজিদা আফরিন (১.৭২), ইতিহাস বিভাগের ড. শহিদুল ইসলাম (১.৭৮), অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরনেশন সিস্টেমস বিভাগের মো. আহসান উদ্দিন (১.৭১), ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের মো. খালেদ বিন আমির (১.০০), রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মো. মনিরুল ইসলাম (১.২৬)।

আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে থাকা শিক্ষকদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবাইদুল ইসলামের রেটিং ৪.৪৭, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ব্যাপক ড. মোহাম্মদ আল মোজাদ্দেদী আলফেসানি ৪.৪৩। তবে উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালাম ও ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর ইসরাফিল প্রাং কোনো রিভিউ পাননি। এ ছাড়া কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী পেয়েছেন ২.১৭, কলা অনুষদ ডিন অধ্যাপক ড. আবুল কালাম সরকার ২.৬৯, বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. মো. মোফাজ্জল হোসেন ৪.৬৬, আইন অনুষদের ডিন ড. মুহাম্মদ একরামুল হক ৪.৬৬, ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন অধ্যাপক আল আমিন ৩.৬৫, জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল করিম ২.৭৭, আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. হুমায়ূন কবির ১.৫৯, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. উপমা কবীর ৪.৪০ রেটিং পেয়েছেন। আর চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আজাহারুল ইসলাম, ফার্মেসি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. সেলিম রেজা কোনো রিভিউ পাননি। আর সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. কাজী মাহবুবুর রহমানের তথ্য ওয়েবসাইটেই নেই।

ক্ষুব্ধ শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ডাকসুর এই মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে ক্ষুব্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিংহভাগ শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তারা এ কাজে ডাকসুর এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ডাকসু গঠনতন্ত্রেও শিক্ষক-সংক্রান্ত কোনো দায়িত্বের কথা উল্লেখ নেই বলে জানিয়েছেন তারা। তাদের ভাষ্য, এই- মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় রাজনীতিকীকরণের আশঙ্কা রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শিক্ষকদের এ ধরনের রেটিংয়ের ব্যবস্থা আন্তর্জাতিকভাবেও রয়েছে। বাংলাদেশের কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষকদের রেটিং করা হয় বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগে এ রেটিং করা হয়। যেখানে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন শিক্ষকের বিষয়ে নিজেদের মতামত জানাতে পারেন। তবে ডাকসু এ রেটিংয়ের ফল উন্মুক্ত করে দেওয়ায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা তাদের। শিক্ষকদের মূল্যায়নের উদ্যোগটি ভালো উল্লেখ করে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মাধ্যমে তা করা যেতে পারে বলেও তারা মত দেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়টির নিজস্ব একটি নীতিমালা রয়েছে উল্লেখ করে শিক্ষকরা বলেন, ২০২২ সালে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামালের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতির নীতিমালা করা হয়। পরে ২০২৪ সালে এ পদ্ধতির অংশ হিসেবে ‘লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ (এলএমএস) নামে একটি ওয়েবসাইটও করা হয়েছিল। কিন্তু নানা কারণে তা আর আলোর মুখ দেখেনি। তাই ওই নীতিমালার আলোকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে শিক্ষক মূল্যায়ন প্রথা চালু রাখার তাগিদ দিয়েছেন তারা।

এক শিক্ষক বলেন, ডাকসু যেভাবে মূল্যায়ন করছে, তাতে একজন শিক্ষার্থী একজন শিক্ষকের ক্লাস না করেও মন্তব্য করার সুযোগ পাচ্ছেন। আবার মূল্যায়নের ফল উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। ফলে কোন শিক্ষকের রেটিং কী, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছাড়াও সাধারণ মানুষজনও দেখতে পারছেন। যার কারণে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে।

আরেক শিক্ষক বলেন, ডাকসুর অধিকাংশ নেতাই একটি রাজনৈতিক মতাদর্শের। আবার ভিন্নমতের শিক্ষকদের রেটিং কম দেখা যাচ্ছে। এতে রেটিং পদ্ধতিতে রাজনীতিকীকরণের আশঙ্কা রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আবুল কালাম সরকার কালবেলাকে বলেন, শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে চালুর সিদ্ধান্ত ছিল। তিনি বলেন, শিক্ষক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কাঠামো থাকা জরুরি। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় কোনো শিক্ষার্থীকে মূল্যায়নের সুযোগ দেওয়ার আগে তার ক্লাসে অন্তত ৭৫ শতাংশ উপস্থিতি থাকার মতো বিষয় বিবেচনায় রাখা হয়েছে। কারণ নিয়মিত ক্লাস করা শিক্ষার্থীরাই একজন শিক্ষক কতটা নিয়মিত ক্লাস নেন, সিলেবাস শেষ করেন, পাঠদান পদ্ধতি কেমন—এসব বিষয়ে যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারেন।

ডিনের অভিযোগ, ডাকসু শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা দ্রুত চালুর দাবি জানিয়ে এমনভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করছে, যেন এটি তাদের নতুন উদ্যোগ। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় এরই মধ্যে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ বিষয়ে নীতিমালা চূড়ান্ত করেছে। তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কোনো ব্যবস্থা হঠাৎ করে বা নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে চাপের মুখে চালু করা উচিত নয়; সংশ্লিষ্ট কমিটি, একাডেমিক কাউন্সিলসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত কাঠামোর মধ্য দিয়েই তা বাস্তবায়ন করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, শিক্ষক মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন এবং এর মাধ্যমে শিক্ষকদের ত্রুটি-বিচ্যুতি চিহ্নিত করে উন্নতির সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। তবে এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাউকে রাজনৈতিকভাবে বা ব্যক্তিগতভাবে ছোট-বড় করার সুযোগ থাকা উচিত নয়। মূল্যায়নের ফল যথাযথ প্রশাসনিক চেইনের মাধ্যমে, বিভাগীয় চেয়ারম্যান, ডিন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পর্যায়ে ব্যবহারের ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং কোনো শিক্ষার্থী কী মূল্যায়ন করেছেন, তা শিক্ষকের কাছে প্রকাশ না করাই উচিত।

মূল্যায়ন পদ্ধতি থাকা উচিত, তবে ডাকসুর মূল্যায়নে বিশৃঙ্খলা বাড়াবে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির সিএসইর সাবেক শিক্ষার্থী নূরে নিশীতা বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের পাঠদানের মান ও পেশাদারিত্ব নিয়ে গোপনে তথ্য নেওয়া হতো। যেসব শিক্ষকদের নিয়ে আপত্তি থাকত তাদের বিষয়ে বিভাগের ডিন ও সিনিয়র শিক্ষকরা ফের ক্লাস রিপ্রেজেন্টেটিভদের (সিআর) কাছ থেকেও তথ্য নিতেন। এরপর তারা ওই শিক্ষকদের বিরুদ্ধে একাডেমিক ব্যবস্থা নিতেন, যা শিক্ষকের এসিআরে উল্লেখ থাকত।’

ডাকসুর সাবেক সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘বিদেশে পড়ার সময় দেখেছি শিক্ষকদের মূল্যায়ন হয়। বাংলাদেশেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রশাসনিকভাবে শিক্ষকদের মূল্যায়ন করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এটা হতে পারে। তবে ডাকসুর উদ্যোগে মূল্যায়ন কখনো দেখিনি। ডাকসুর হয়তো কোনো রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি রয়েছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নের মুখে পড়বে।’

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ বলেন, ইউরোপ, আমেরিকায় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে শিক্ষকদের সম্পর্কে মূল্যায়ন নেওয়া হয়। তবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ডাকসু মূল্যায়ন পদ্ধতি অনেক প্রশ্ন তৈরি করবে। বিষয়টি অনেক জটিল হতে পারে। তবে শিক্ষক সম্পর্কে ছাত্রদের মতামত নেওয়ার একটা পদ্ধতি থাকা অবশ্যই দরকার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি, ইউজিসি ও পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ কালবেলাকে বলেন, শিক্ষকদের মূল্যায়ন নিয়ে ডাকসু একভাবে চিন্তা করছে, আবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আরেকভাবে চিন্তা করছে। ডাকসুর উদ্যোগকে নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে। এ রিপোর্ট একপেশে হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারে। তাই আমি ডাকসুর নেতাদের বলব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে বসে তাদের চাপ দিয়ে নিয়মিত শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা কার্যকর করা যেতে পারে।

ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ বলেন, ‘শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা ২০২২ সালে চালু করা হয়; কিন্তু সব বিভাগে পুরোদমে চালু করা হয়নি। ২০২৪ সালের মধ্যে এটা পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নানা অজুহাতে দেরি করেছে। আমরা তা পুরোপুরি চালুর জন্য ডাকসু নির্বাচনের পর থেকে আন্দোলন করেছি; কিন্তু সফল হতে পারিনি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে যখনই যেতাম, তারা বলত পরবর্তী মাস থেকে চালু হবে; কিন্তু এক বছরেও তা আলোর মুখ দেখেনি। ফলে আমরা আমাদের আন্দোলনের স্ট্র্যাটেজি হিসেবে এটি চালু করেছি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যখন আনুষ্ঠানিকভাবে এটা চালু করবে, তখন আমাদেরটা বন্ধ করে দিব। অথবা তারা চাইলে আমাদেরটা নিয়েও সিস্টেম ডেভেলপ করতে পারে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক ড. ইসরাফিল প্রাং বলেন, ‘শিক্ষক মূল্যায়ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কাজ করছে। এর মধ্যেই ডাকসু যে সিস্টেম চালু করেছে, তা তাদের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না। ডাকসুর কাজ যদি হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে চ্যালেঞ্জ করা, তবে তা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম বলেন, ‘ডাকসু নিশ্চয়ই কোনো ভালো উদ্দেশ্য থেকেই কাজটি করেছে; কিন্তু যে কোনো কাজের একটি নির্দিষ্ট নিয়ম থাকে। আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হচ্ছে যে, ৩-৪ বছর ধরে চেষ্টা করেও নাকি প্রশাসন এটি চালু করতে পারেনি। অথচ আমরা দায়িত্বে এসেছি মাত্র ৩ থেকে ৪ মাস হলো। এর মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে আমরা একটি চূড়ান্ত নীতিমালা গ্রহণ করেছি, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ একাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেটে পাসও হয়েছে। এরই মধ্যে কীভাবে বিভাগগুলো নিজেদের এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করবে, সে-সংক্রান্ত দিকনির্দেশনাও প্রদান করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের মূল্যায়ন ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে। আমাদেরও বেশ কিছু বিভাগে এটি আগে থেকেই কার্যকর আছে। তবে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে সামগ্রিকভাবে চালু না থাকায় আমরা এই সমন্বিত উদ্যোগটি নিয়েছি। আমরা নিশ্চিত করতে চাই যেন, এই প্রক্রিয়ার কোনো অপব্যবহার বা ‘ম্যালপ্র্যাকটিস’ না হয়। তাই কোনো শিক্ষকের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে যাতে ওই বিভাগের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর বস্তুনিষ্ঠ রেটিং প্রতিফলিত হয়, সেদিকে আমাদের বিশেষ নজর থাকবে।’