গাজীপুরের কোনাবাড়ীর জরুন এলাকায় কেয়া গ্রুপের ৩টি স্পিনিং ও কটন মিল এক বছর বন্ধ। এগুলো হচ্ছে-কেয়া স্পিনিং মিলস, কেয়া কটন মিলস ও কেয়া ইয়ার্ন মিলস। বন্ডের সুতার আগ্রাসনসহ নানা কারণে ১ লাখ ২০ হাজার স্পিন্ডলের আধুনিক মিলগুলো বন্ধ থাকায় বর্তমানে এক হাজারের বেশি শ্রমিক কর্মসংস্থানহীন। এর মধ্যে বাক্প্রতিবন্ধী শ্রমিকও ছিলেন।
বন্ডের সুতায় লাগাম টানায় মিলগুলো পুনরায় চালুর চিন্তা করছেন কেয়া গ্রুপের উদ্যোক্তা আবদুল খালেক পাঠান। শনিবার যুগান্তরকে তিনি বলেন, ‘আমার গার্মেন্ট আছে, স্পিনিং মিলও আছে। বন্ড সুবিধায় সুতা আমদানিতে লাগাম টানায় গার্মেন্টের সাময়িক অসুবিধা হলেও বন্ধ থাকা স্পিনিং মিলগুলো আবারও প্রাণ ফিরে পেতে পারে। আমার মতো অন্য উদ্যোক্তারা হয়তো মিল চালুর চিন্তাভাবনা করবেন। এজন্য সরকারের আরও সহায়তা প্রয়োজন।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রকৃত অর্থে সরকারের এই সিদ্ধান্তের সুফল পেতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর মনিটরিং দরকার। কেননা বাংলাদেশে আর্থিক খাতে যত দুর্নীতি হয়েছে বা হচ্ছে, তার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্যাংক জড়িত। ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছাড়া দুর্নীতি সম্ভব নয়। সুতা আমদানিতে ব্যাংক গ্যারান্টির বিধান চালু করলেও মনিটরিং করতে না পারলে অতীতের মতো শুধু কাগজে-কলমে আমদানি-রপ্তানি হবে।’
আবদুল খালেক বলেন, ‘সিস্টেমে চুরি বন্ধ করতে হবে। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ড্যাশবোর্ডে প্রতিটি রপ্তানির তথ্যে প্রচ্ছন্ন রপ্তানিকারকদের (টেক্সটাইল মিল বা ব্যাংক গ্যারান্টিতে সুতা আমদানি করলে, আমদানির তথ্য) তথ্য যুক্ত করতে হবে। এটি করা গেলে কাগজ জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া রপ্তানি অনেকাংশেই বন্ধ হবে। অপরদিকে আমদানি-রপ্তানির তথ্যের গরমিল বন্ধ হবে এবং অপ্রত্যাবাশিত অর্থের পরিমাণ কমে যাবে।’
শুধু খালেক পাঠান নন, বন্ডের সুতায় লাগাম টানায় বন্ধ স্পিনিং মিল আবার চালু করার স্বপ্ন দেখছেন উদ্যোক্তারা। তাদের মতে, অর্ধেক সক্ষমতায় চলা এবং বন্ধ স্পিনিং মিলগুলো পূর্ণোদ্যমে চালু করতে প্রয়োজন নীতির ধারাবাহিকতা ও কার্যকর মনিটরিং। বাংলাদেশ ব্যাংক ও কাস্টমস সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করলে সুতার আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং কর্মসংস্থান বাড়বে বলে মনে করেন উদ্যোক্তারা।
প্রসঙ্গত, সোমবার বন্ড সুবিধায় লাগাম টেনে এনবিআর একটি আদেশ জারি করে। জারিকৃত আদেশে বলা হয়েছে, ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানি করতে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএ-এর প্রত্যয়নপত্র সংশ্লিষ্ট কাস্টমস স্টেশনে জমা দিতে হবে। একই সঙ্গে আমদানিকৃত পণ্যের শুল্ক-করের সমপরিমাণ অর্থ নিঃশর্ত ও অব্যাহত ব্যাংক গ্যারান্টি কাস্টমসে জমা দিতে হবে। খালাসকৃত সুতা দিয়ে প্রস্তুতকৃত পণ্য সম্পূর্ণ রপ্তানি হওয়া সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়নপত্রের ভিত্তিতে ব্যাংক গ্যারান্টি অবমুক্তযোগ্য হবে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংক গ্যারান্টি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করবে কতটা স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভরভাবে এটি বাস্তবায়ন করা যায় তার ওপর। আমদানি, উৎপাদন, রপ্তানি এবং রপ্তানি আয় প্রত্যাবাসনের তথ্য যদি একই ডিজিটাল ব্যবস্থায় যাচাই করা যায়, তাহলে জবাবদিহি বাড়ানোর পাশাপাশি প্রকৃত রপ্তানিকারকদের প্রশাসনিক জটিলতাও কমানো সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে বিল অব এন্ট্রি, ইউডি, বিল আ এক্সপোর্ট ও ইএক্সপি এবং অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকের রপ্তানি আয় প্রত্যাবাসনের তথ্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফরমে সংযুক্ত করা যেতে পারে। একই সঙ্গে রপ্তানিকারক প্রয়োজনীয় সব শর্ত পূরণের পর যেন ব্যাংক গ্যারান্টি অবমুক্ত করতে অযথা বিলম্ব বা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় না পড়েন, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। ব্যাংক গ্যারান্টি ব্যবস্থার এই সুবিধা চালুর ফলে রপ্তানি আয় যথাসময়ে ফেরত আসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
দুই বছরে আমদানি প্রায় দ্বিগুণ : কাস্টমসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত কয়েক বছরে বন্ড সুবিধায় সুতা আমদানি বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রায় ৩৫.০৮ কোটি কেজি সুতা আমদানি হয়। এর মূল্য ছিল প্রায় ১৪ হাজার ৪১০ কোটি টাকা। পরের অর্থবছরে (২০২৩-২৪) আমদানির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৫৮.৮৪ কোটি কেজি, যার মূল্য প্রায় ২১ হাজার ১৪২ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানি আরও বেড়ে ৬৯.৭১ কোটি কেজি এবং মূল্য প্রায় ২৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় পৌঁছে। অর্থাৎ মাত্র দুই অর্থবছরের ব্যবধানে আমদানির নিট ওজন বেড়েছে প্রায় ৯৯ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় আমদানির ওজন বেড়েছিল প্রায় ৬৮ শতাংশ এবং মূল্য প্রায় ৪৭ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও আগের বছরের তুলনায় ওজন প্রায় ১৮ শতাংশ এবং আমদানি মূল্য প্রায় ২৬ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে সুতা আমদানি হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার।
২৪৪ টেক্সটাইল মিল বন্ধ : বন্ডের সুতার আগ্রাসনসহ নানা কারণে ২০১৯ সালের পর থেকে প্রায় ১১৪টি সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানসহ ২৪৪টি টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়েছে। যদিও তৈরি পোশাক রপ্তানির শক্ত ভিত তৈরিতে স্থানীয় ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ টেক্সটাইল শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। এ খাতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৩ লাখ কোটি টাকার বেশি। শিল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, স্থানীয় মিলগুলো কটন ও বিভিন্ন ধরনের ব্লেন্ডেড সুতার উল্লেখযোগ্য চাহিদা পূরণে সক্ষম হলেও অনেক প্রতিষ্ঠান পূর্ণ উৎপাদনক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে না। অনেক সুতা উৎপাদনকারী কারখানা তাদের স্থাপিত সক্ষমতার মাত্র ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ব্যবহার করছে। ২০১৯ সালের পর থেকে প্রায় ১১৪টি সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানসহ ২৪৪টি টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়েছে। এজন্য বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের পাশাপাশি জ্বালানি সংকট, উচ্চ ব্যাংক সুদ এবং চলতি মূলধনের চাপ দায়ী।
বন্ডের অপব্যবহার ঠেকালে শিল্প বাঁচবে : বন্ড সুবিধার অপব্যবহার বাড়ায় দেশীয় টেক্সটাইল শিল্পে চাপ ক্রমেই বাড়ছে। একসময় গ্রামাঞ্চলের তাঁতিরা দেশীয় স্পিনিং মিলের সুতার ওপর নির্ভরশীল হলেও বর্তমানে পুরোই উলটো চিত্র। সিরাজগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদীতে দিনের আলোয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাকের ডগায় বিক্রি হয় বন্ডের সুতা। এ বিষয়ে সালমা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক চৌধুরী মোহাম্মদ হানিফ যুগান্তরকে বলেন, রপ্তানির জন্য শুল্কমুক্তভাবে আনা কাঁচামালের কোনো অংশ স্থানীয় বাজারে চলে গেলে তিন ধরনের সমস্যা তৈরি হয়-সরকার সম্ভাব্য রাজস্ব হারায়, দেশীয় উৎপাদক অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে এবং প্রকৃত রপ্তানিকারকদের জন্য দেওয়া সুবিধার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নতুন ব্যাংক গ্যারান্টি ব্যবস্থায় আমদানি-উৎপাদন-রপ্তানি শৃঙ্খলের ওপর নজরদারি বাড়লে এ ধরনের অপব্যবহারের ঝুঁকি কমতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সরকার গৃহীত নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে বন্ধ বা অর্ধবন্ধ মিলের একটি অংশ পুনরায় চালু হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বিদ্যমান মিলগুলোর আধুনিকায়ন, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি, জ্বালানি-সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি এবং উচ্চমূল্যের সুতা উৎপাদনে নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত হতে পারে। অন্যদিকে নীতি ঘনঘন পরিবর্তিত হলে, বাস্তবায়ন দুর্বল হলে অথবা বন্ড সুবিধায় আমদানিকৃত পণ্য স্থানীয় বাজারে চলে এলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা প্রত্যাশিত মাত্রায় ফিরবে না। সে বিবেচনায় ১০-৩০ কাউন্টের কটন সুতা নিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি শুধু কাস্টমস নীতির বিষয় নয়। এর সঙ্গে শিল্পনীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা এবং এলডিসি-পরবর্তী রপ্তানি কৌশল-সবকিছুরই সংযোগ রয়েছে।
১৫ লাখ কর্মসংস্থান সম্ভব : গত ২০ জুলাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, দেশের বন্ধ ও অর্ধবন্ধ টেক্সটাইল কারখানাগুলো কার্যকরভাবে পুনরায় চালু করা গেলে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। স্পিনিং শিল্পে কর্মসংস্থানের প্রভাব সরাসরি কারখানা শ্রমিকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। তুলা হ্যান্ডলিং, পরিবহণ, গুদামজাতকরণ, প্যাকেজিং, প্রকৌশল রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুৎ ও ইউটিলিটি সেবা, ব্যাংকিং, বিমা, রাসায়নিক ও যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং পরবর্তী পর্যায়ের নিটিং, উইভিং ও ডাইং শিল্পেও এর অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ে। ফলে অব্যবহৃত উৎপাদন সক্ষমতা সক্রিয় করা গেলে প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের পাশাপাশি পরোক্ষ কর্মসংস্থানও বাড়তে পারে।