দেশে উচ্চশিক্ষার মান নিশ্চিত ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল (বিএসি) গঠন করা হয়। প্রতিষ্ঠার ৮ বছর পার হলেও এটি কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোয়নি। দীর্ঘ সময় কর্মশালা, সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও জনবল নিয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এর কার্যক্রম। এ পর্যন্ত তারা চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাত্র ১১টি একাডেমিক প্রোগ্রামকে স্বীকৃতি দিতে পেরেছে। কাউন্সিলের তথ্যমতে, স্বীকৃতি পাওয়া ১১টি প্রোগ্রামের মধ্যে আটটি পেয়েছে অ্যাক্রেডিটেশন সার্টিফিকেট এবং তিনটি পেয়েছে কনফিডেন্স সার্টিফিকেট। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বিবেচনায় এ অর্জন অত্যন্ত সীমিত। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে না। ফলে কাউন্সিলের সক্ষমতা ও কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
দেশে বর্তমানে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ৫৯টি এবং অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ১১৭টি। এর বাইরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রয়েছে ২ হাজার ২৫৭টি অধিভুক্ত কলেজ ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রয়েছে ১২টি আঞ্চলিক কেন্দ্র এবং ১ হাজার ১৫৪টির বেশি শিক্ষাকেন্দ্র। এসব প্রতিষ্ঠানের বিপুলসংখ্যক একাডেমিক প্রোগ্রামের মান যাচাই ও স্বীকৃতি দেওয়ার দায়িত্বে রয়েছে অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল।
স্বীকৃতি পাওয়া ১১ প্রোগ্রাম : আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশের (এআইইউবি) ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) প্রোগ্রাম অ্যাক্রেডিটেশন সার্টিফিকেট পেয়েছে। চট্টগ্রামের প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির ছয়টি প্রোগ্রাম স্বীকৃতি পেয়েছে। এর মধ্যে ইইই, এলএলবি (অনার্স), ব্যাচেলর অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, বিএ (অনার্স) ইন ইংলিশ এবং বিএসএস ইন ইকোনমিকস অ্যাক্রেডিটেশন সার্টিফিকেট পেয়েছে। কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) প্রোগ্রাম পেয়েছে কনফিডেন্স সার্টিফিকেট। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির তিনটি প্রোগ্রাম স্বীকৃতি পেয়েছে। এর মধ্যে ইইই অ্যাক্রেডিটেশন সার্টিফিকেট এবং বিবিএ ও সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোগ্রাম কনফিডেন্স সার্টিফিকেট পেয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউবিটি) ইইই প্রোগ্রাম অ্যাক্রেডিটেশন সার্টিফিকেট পেয়েছে।
দীর্ঘ সময় কেটেছে কর্মশালায় : বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল আইন-২০১৭ অনুযায়ী ২০১৮ সালের ৯ আগস্ট প্রতিষ্ঠানটি গঠন করা হয়। একই বছরের ২৬ আগস্ট জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মেসবাহউদ্দিন আহমেদকে প্রথম চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়। কাউন্সিলকে পূর্ণাঙ্গ করতে চেয়ারম্যান, পূর্ণকালীন ও খণ্ডকালীন সদস্য এবং সচিব নিয়োগসহ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় প্রায় দেড় বছর সময় চলে যায়। এরপরও মূল দায়িত্ব পালনে দীর্ঘ সময় লেগেছে। কাউন্সিলের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১২টি, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৬১টি, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪৫টি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৭টি এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৩টি কর্মশালার আয়োজন করা হয়। অ্যাক্রেডিটেশনের প্রস্তুতি ও সচেতনতা তৈরিতে বিপুলসংখ্যক কর্মশালা হলেও দীর্ঘ সময় পর্যন্ত বাস্তব স্বীকৃতির সংখ্যা ছিল শূন্য।
শিক্ষাবিদদের মতে, কাউন্সিলের কাজ শুধু কর্মশালা আয়োজন নয়। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম, শিক্ষক, অবকাঠামো, গবেষণা, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা নির্দিষ্ট মানদণ্ডে মূল্যায়ন করে স্বীকৃতি দেওয়াই এর মূল কাজ।
কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদিত ৫৪টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন ৪৪ জন। এর মধ্যে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের নয়জন কর্মকর্তা প্রেষণে কর্মরত। কাউন্সিলের কর্মকর্তারা বলছেন, দক্ষ জনবলের সংকট প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বাস্তবায়নে বড় বাধা। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অ্যাক্রেডিটেশন সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণার অভাব এবং প্রশাসনিক জটিলতাও কাজের গতি কমিয়েছে।
কাউন্সিলের সচিব প্রফেসর একেএম মুনিরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আমরা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অ্যাক্রেডিটেশনের আওতায় আনতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অ্যাক্রেডিটেশনের বিষয়ে সচেতন ও প্রস্তুত করতে বিভিন্ন কর্মশালা করেছি। এছাড়া অভিজ্ঞ জনবল সংকট রয়েছে। তাই পরিকল্পনা নিয়ে কাজ এগিয়ে নিতে বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছি।
১৮ বিশ্ববিদ্যালয় ১৩৫ প্রোগ্রামে আগ্রহী : কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, ১৮টি বিশ্ববিদ্যালয় ১৩৫টি একাডেমিক প্রোগ্রামের অ্যাক্রেডিটেশনের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এসব মূল্যায়নে একাধিক বিশেষজ্ঞ কমিটিও করা হয়েছে। কাউন্সিলের প্রতিনিধিরা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করেছেন। তবে আগ্রহ প্রকাশের তুলনায় চূড়ান্ত স্বীকৃতির সংখ্যা এখনো খুবই কম। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ কাউন্সিলের সক্ষমতা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ থাকলেও আবেদন ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় এগোতে দ্বিধা রয়েছে।
কোটি টাকা ব্যয়, কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন : ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কাউন্সিলের জন্য ৮ কোটি টাকার বেশি বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের পাশের অভিজাত এলাকায় এর দপ্তর অবস্থিত। এজন্য প্রতি মাসে প্রায় ১০ লাখ টাকা ভাড়া দিতে হয়। ফলে প্রশ্ন উঠছে-এত বড় পরিচালন ব্যয় ও সরকারি বরাদ্দের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম কতটা ফলপ্রসূ হচ্ছে? বিশেষ করে ৮ বছরে মাত্র ১১টি একাডেমিক প্রোগ্রাম স্বীকৃতি পাওয়ায় কাউন্সিলের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষায় ভোগান্তিতে শিক্ষার্থীরা : অ্যাক্রেডিটেশনের গুরুত্ব শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের মান যাচাইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত দেশের শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ। বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন করার সময় বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীর সনদ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট প্রোগ্রামের স্বীকৃতি ও মান যাচাই করে থাকে। এসব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের স্বীকৃতি না থাকলে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত যাচাই-বাছাই ও জটিলতার মুখে পড়তে হয়। ফলে একটি শক্তিশালী জাতীয় অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থা বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত ক্ষেত্রে সুবিধা তৈরি করতে পারে।
এদিকে ২৬ জুলাই অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের নতুন চেয়ারম্যান হিসাবে নিয়োগ পেয়েছেন অধ্যাপক ড. মো. আখতার হোসেন খান। একই সময়ে পূর্ণকালীন ও খণ্ডকালীন সদস্যও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি নতুন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে কাউন্সিলের ২১তম সভা হয়। এতে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের পরিধি বাড়াতে এবং আরও গতিশীল করতে আলোচনা হয়েছে।
শিক্ষাবিদরা যা বলছেন : ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ যুগান্তরকে বলেন, ‘অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের উচ্চশিক্ষার মানকে একটি নির্দিষ্ট ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মানদণ্ডের মধ্যে নিয়ে আসা। সেই জায়গা থেকে ৮ বছরে মাত্র ১১টি প্রোগ্রাম স্বীকৃতি পাওয়া অবশ্যই প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম।’
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও অ্যাক্রেডিটেশন গ্রহণের জন্য নিজেদের একাডেমিক ও প্রশাসনিক সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে কাউন্সিলের জনবল ও কারিগরি সক্ষমতা বাড়ানো, মূল্যায়ন প্রক্রিয়া দ্রুত করা এবং অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা জরুরি। অন্যথায় বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো কঠিন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান যুগান্তরকে বলেন, উচ্চশিক্ষার মান নিশ্চিত করতে অ্যাক্রেডিটেশন বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি বিএসিকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করতে হবে। এর প্রক্রিয়া সহজ ও ডিজিটাইজড করা, সরকারি সহায়তা বাড়ানো এবং নিরপেক্ষ ও কঠোর মূল্যায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ ও গবেষণা মূল্যায়ন এবং শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।