একদিনে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের একাধিক ঝটিকা মিছিল ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) জুমার নামাজের পর ঢাকা, গাজীপুর ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা একযোগে ঝটিকা মিছিল বের করেন। এসব ঘটনায় তিনটি ককটেল ও ব্যানারসহ মোট পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোতে মামলা দায়েরের পাশাপাশি মিছিলে অংশ নেওয়া অন্যদের শনাক্ত করতে অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র জানায়, রাজধানীর গুলশান থানার ৩ নম্বর রোডের কেএফসি গলি এলাকায় নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের প্রায় ১০০ থেকে ২০০ জন সমর্থক জড়ো হয়ে ঝটিকা মিছিল বের করেন। পুলিশ বাধা দিলে তারা মারমুখী হয়ে ওঠেন এবং তিনটি ককটেল ফেলে পালিয়ে যান। পরে ককটেল উদ্ধারসহ আব্দুর রহিম (৪২) ও আশরাফ ইসলাম নিহাল (১৯) নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
তবে একটি বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, পুলিশের হিসাবে ১০০ থেকে ২০০ জনের কথা বলা হলেও সেখানে প্রকৃতপক্ষে কয়েক হাজার নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন, যা ছিল শুক্রবারের সবচেয়ে বড় মিছিল।
ঢাকা, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে একযোগে নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের ঝটিকা মিছিল ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নির্দিষ্ট স্থান ও সময় সম্পর্কে আগে থেকে সঠিক গোয়েন্দা ইনপুট বা তথ্য না পাওয়ায় মিছিল শুরুর আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হচ্ছে মাঠপর্যায়ের পুলিশ
একই সময়ে গাজীপুর মহানগরের পূবাইল থানাধীন টেকপাড়া, সোবানি রিসোর্টের পেছনের রাস্তায় নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের ২৫-৩০ জন সমর্থক ব্যানার নিয়ে মিছিল করার চেষ্টা করলে পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর ও আগ্রাবাদ এক্সেস রোড এলাকায় সাবেক যুব ও ছাত্রলীগ নেতাদের নেতৃত্বে পৃথক দুটি ঝটিকা মিছিল থেকে পুলিশ ধাওয়া দিয়ে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পর থেকেই মাঠপর্যায়ে দলটির তৎপরতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তবে, দলটির যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় তা প্রতিরোধে পুলিশকে আগাম নির্দেশনা দেওয়া সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে সফলতা মিলছে না। শুক্রবার জুমার পর একই সময়ে একাধিক স্থানে অনুষ্ঠিত এসব মিছিলের মূল সুরই ছিল শেখ হাসিনার দেশে ফেরা।
গোয়েন্দা ব্যর্থতা ও প্রশাসনিক চাপ
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মিছিল বের করার পর থেকেই পুলিশের ওপর সরকারের উচ্চপর্যায়ে থেকে তীব্র প্রশাসনিক চাপ তৈরি হয়েছে। মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থাকার পরও কীভাবে নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীরা এভাবে একযোগে মিছিল করতে পারল, সে বিষয়ে কড়া জবাব চাওয়া হয়েছে।

তবে অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, এই সামগ্রিক পরিস্থিতির মূল কারণ গোয়েন্দা তথ্যের চরম ঘাটতি। পুলিশ জানিয়েছে, আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক গতিবিধি ও কৌশল সম্পর্কে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো থেকে পর্যাপ্ত আগাম তথ্য মিলছে না। কেবল নিজস্ব সূত্রের ওপর নির্ভর করে সারা দেশে একই সময়ে সংঘবদ্ধ হওয়ার সুনির্দিষ্ট তথ্য আগাম জোগাড় করা পুলিশের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। ফলে মিছিল শুরুর আগে পর্যাপ্ত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
পরপর একাধিক মিছিলের ঘটনায় সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে পুলিশের ওপর কড়া প্রশাসনিক চাপ তৈরি হয়েছে। মাঠপর্যায়ে টহল থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এসব মিছিল হলো, সে বিষয়ে জবাব চাওয়া হয়েছে। কেন সময়মতো এসবির তথ্য পাওয়া গেল না, তা নিয়ে বাহিনীর অভ্যন্তরে বর্তমানে তীব্র তোলপাড় ও বিচার-বিশ্লেষণ চলছে
বিশেষ করে, পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা থেকে মন্ত্রণালয় হয়ে মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় তথ্য পৌঁছাতে বিলম্ব হচ্ছে বলে অভ্যন্তরীণ আলোচনায় উঠে এসেছে। সময়মতো সুনির্দিষ্ট তথ্য না পাওয়ায় পুলিশ কেবল ঘটনাস্থলে গিয়ে মিছিল ছত্রভঙ্গ করা এবং পরবর্তীতে সিসিটিভি ফুটেজ বা ছবি দেখে অংশগ্রহণকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে বাধ্য হচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে পুলিশ বাহিনীর ভেতরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চাপের মুখে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারাও গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতির বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরছেন। তাদের মতে, আগে থেকে সুনির্দিষ্ট ও সময়োপযোগী তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ও নজরদারি বাড়িয়ে মিছিল শুরু হওয়ার আগেই তা পণ্ড করে দেওয়া সম্ভব হতো।

বিশেষ করে গুলশানে বিশাল ঝটিকা মিছিলের পর পুলিশের শীর্ষপর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে তীব্র তোলপাড় শুরু হয়েছে। কেন এবং কীভাবে এত বড় একটি জমায়েতের বিষয়ে বিশেষ শাখা (এসবি) বা অন্যান্য সংস্থার থেকে আগাম কোনো তথ্য পাওয়া গেল না, তা নিয়ে বর্তমানে গভীর বিচার-বিশ্লেষণ ও অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা চলছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ক্ষমতাচ্যুতির পর ঝটিকা মিছিল এবং বিদেশে অবস্থানরত নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে কর্মীদের সক্রিয় রাখার নতুন কৌশল নিয়েছে দলটি। ডিসেম্বরকে সামনে রেখে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা বা নাশকতার পরিকল্পনা রয়েছে কি না, তা রুখতে পুলিশ বাহিনীকে হাই-অ্যালার্টে রেখে গোয়েন্দা সমন্বয় বাড়াতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল ঠেকাতে মাঠপর্যায়ের পুলিশকে আগেই কঠোর সতর্কবার্তাসহ প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তবে কোথায়, কখন এবং কারা সংগঠিত হচ্ছে— এ জাতীয় সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য সময়মতো না পাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে আগে থেকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। মিছিল শুরু হওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা ও আওয়ামী লীগের ‘ডিসেম্বর’ ঘিরে নতুন কৌশল
বিষয়টি নিয়ে পুলিশের আরেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, দেশের বিভিন্ন এলাকায় একই সময়ে এ ধরনের ঝটিকা কর্মসূচি পালন নিঃসন্দেহে বড় উদ্বেগের বিষয়। পুলিশের নিজস্ব সোর্সের মাধ্যমে সব স্থানের আগাম গতিবিধি জানা সম্ভব নয়, তাই গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে মাঠপর্যায়ে সময়মতো তথ্য পাওয়া অত্যন্ত জরুরি। শুক্রবারের ঘটনাগুলো নিয়ে ইতোমধ্যে পুলিশে অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা শুরু হয়েছে এবং ঠিক কোথায় তথ্যের ঘাটতি ছিল তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ক্ষমতাচ্যুতির পর কিছু সময় নিষ্ক্রিয় থাকলেও আগামী ডিসেম্বরকে লক্ষ্য করে নতুন কৌশলে মাঠে নামছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে অস্তিত্ব জানান দেওয়ার পাশাপাশি পলাতক শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রেখে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের চাঙ্গা রাখার চেষ্টা চলছে।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে নেতাকর্মীরা সংঘবদ্ধ হয়ে বিশৃঙ্খলা ও নাশকতার ছক কষছেন। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা পলাতক শীর্ষ নেতাদের নির্দেশনা নিচ্ছেন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, নারায়ণগঞ্জের পলাতক নেতা শামীম ওসমানও নেতাকর্মীদের ডিসেম্বরে প্রস্তুত থাকার কড়া নির্দেশ দিয়েছেন।
উচ্চপর্যায়ে রিপোর্ট ও কড়া নজরদারি
এসব উদ্ভূত পরিস্থিতি ও গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরি করে ইতোমধ্যে সরকারের উচ্চপর্যায়ে হস্তান্তর করা হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ইতোমধ্যে সব ইউনিটকে মাঠপর্যায়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার বার্তা দেওয়া হয়েছে। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, মূলত রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রাখাই এসব ঝটিকা মিছিলের মূল উদ্দেশ্য। তবে, এই কর্মসূচির সুযোগ নিয়ে কোনো বড় ধরনের নাশকতার ছক কষা হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি শুরু হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতে, গত কয়েক মাসে রাজধানীসহ চট্টগ্রাম ও গাজীপুরে আচমকা জড়ো হয়ে দলীয় স্লোগান ও সরকারবিরোধী বক্তব্য দিয়ে দ্রুত সটকে পড়ার প্রবণতা বেড়েছে। কোথাও পুলিশ তাৎক্ষণিক ধাওয়া দিয়ে মিছিলকারীদের ছত্রভঙ্গ করেছে, আবার কোথাও ঝটিকা অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার নিশ্চিত করেছে।
নিরাপত্তা জোরদার ও পুলিশের সমন্বিত পদক্ষেপ
এদিকে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, তার দেশে ফেরার আলোচনাকে কেন্দ্র করেই মাঠপর্যায়ে নিষ্ক্রিয় নেতাকর্মীরা পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন। ফলে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বক্তব্য এবং দলটির ঝটিকা মিছিল— এ দুটি বিষয়কেই বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির মূল কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।
শুক্রবার দেশের একাধিক স্থানে একযোগে ঝটিকা মিছিলের ঘটনার পর দেশজুড়ে পুলিশ বাহিনীকে ‘হাই অ্যালার্ট’-এ রাখা হয়েছে। নিষিদ্ধ ঘোষিত এই সংগঠনের যেকোনো তৎপরতার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সদর দপ্তর। একই সঙ্গে আগাম তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করতে পুলিশের প্রতিটি ইউনিটকে নতুন করে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় এখন সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় বাড়ানোর ওপর। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের স্পষ্ট কথা— মিছিল শুরু হওয়ার পর তা ছত্রভঙ্গ করার চেয়ে, আগাম তথ্য পেয়ে আগেভাগেই গতিবিধি রুখে দিতে পারলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সম্ভাব্য যেকোনো নাশকতা ঠেকানো অনেক বেশি সহজ হবে।
এ বিষয়ে জানতে পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স উইংয়ের এআইজি এ. এইচ. এম. শাহাদাত হোসাইন ঢাকা পোস্টকে বলেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো দলের কার্যক্রম সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। কোনো ঘটনায় গোয়েন্দা ঘাটতি থাকলে তা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।