Image description

সাক্ষ্য শুরুর দিন-তারিখ ঠিক হয়েছিল। কিন্তু এর মধ্যেই ফরমাল চার্জ (আনুষ্ঠানিক অভিযোগ) গঠনের আদেশ পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করায় ঝুলে গেছে আইনি প্রক্রিয়া। বর্তমানে এ আবেদনের শুনানির জন্য অপেক্ষা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সামনে এসে এখনও জবানবন্দি দেওয়ার সুযোগ পাননি সাক্ষীরা। তবুও যেন পর্দার অন্তরালে বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট। কারও কাছে আসছে বিদেশি নম্বর থেকে সরাসরি হুমকি, কাউকে বলা হচ্ছে সাক্ষ্য থেকে সরে যেতে। আবার কাউকে দেওয়া হচ্ছে প্রলোভন— সাক্ষ্য না দিলে গড়ে দেওয়া হবে ‘উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ’।

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে চট্টগ্রামে ওয়াসিমসহ ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২২ আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর আগেই এমন মারাত্মক চাপের মুখে পড়ার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন সাক্ষী। তাদের অভিযোগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর নাম। তার লোকজনই বিদেশি নম্বর থেকে অনবরত হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন বলে দাবি করছেন তারা। যদিও আসামিপক্ষের আইনজীবীর দাবি, এসব অভিযোগের সত্যতা থাকলে কেবল ট্রাইব্যুনালেই নয়, সাধারণ আইনি প্রক্রিয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছেও অভিযোগ জানানো উচিত।

ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা যায়, এ মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ ও শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা আসামি হিসেবে রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে গত ৩০ জুন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। একই সঙ্গে সাক্ষ্যগ্রহণের দিন নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬ আগস্ট। কিন্তু ওই আদেশের পুনর্বিবেচনা চেয়ে আবেদন করে আসামিপক্ষ। আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে শুনানির দিন ধার্য করেছেন আদালত।

চট্টগ্রামের মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর আগেই সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীর অনুসারীদের বিরুদ্ধে সাক্ষীদের বিদেশি নম্বর থেকে প্রাণনাশের হুমকি ও আর্থিক প্রলোভন দেখানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। জবানবন্দি বানচালের এ প্রক্রিয়ায় সাক্ষীদের তথ্য ফাঁস হওয়ায় ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সাক্ষীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ ও কড়া নির্দেশ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল

সাক্ষীদের অভিযোগ, এরই মধ্যে তাদের কয়েকজনের কাছে বিভিন্ন বিদেশি নম্বর থেকে একাধিকবার ফোন এসেছে। মামলায় সাক্ষ্য না দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টির পাশাপাশি তাদের বাসার ঠিকানা, পরিবারের সদস্যদের নাম ও মোবাইল নম্বর উল্লেখ করে সরাসরি ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিলে চরম বিপদে পড়ার এবং প্রাণনাশের ঝুঁকি তৈরির হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এমনকি ফজলে করিমের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়া থেকে পিছিয়ে গেলে ‘উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ’ নিশ্চিত করা কিংবা বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দেওয়ার প্রলোভনও দেওয়া হয়েছে বলে জানান এক ভুক্তভোগী।

dhakapost
 আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল | ছবি: সংগৃহীত

মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দি দেওয়া চার সাক্ষীর সঙ্গে কথা বলেছে ঢাকা পোস্ট। তাদের একজন সম্রাট রোবায়েত। তার দাবি, স্বজনদের মাধ্যমে তাকে সাক্ষ্য থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য চাপ দিচ্ছে ফজলে করিমের অনুসারীরা। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থান ঘিরে চট্টগ্রামে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞ নিয়ে মুখ না খুললে বিদেশে পড়াশোনার সুযোগ ও বিপুল আর্থিক প্রলোভন দেখানো হচ্ছে। এমনকি তার এক চাচাতো ভাইকেও ‘ঘরের মাটিসহ তুলে নেওয়ার’ কড়া হুমকি দেওয়া হয়েছে। তবে, অনবরত হুমকি এলেও ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়া থেকে পিছপা হবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন রোবায়েত।

রোবায়েত ঢাকা পোস্ট-কে বলেন, ‘আমার আত্মীয়-স্বজনকে কল করে ভয় দেখাচ্ছেন ফজলে করিমের ছেলে ফারাজ করিমের পিএস সাইদুল ইসলাম। তিনি সেন্ট্রাল ভয়েস অব রাউজান-এর সভাপতি ছিলেন। তার মোবাইল নম্বর ও কণ্ঠ আমাদের চেনা। মূলত তিনিই স্বজনদের ফোন দিচ্ছেন। চব্বিশের জুলাইয়ে আমরা মাঠে থেকে তাদের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালানোর দৃশ্য সরাসরি দেখেছি। তাই তারা চাইছে আমি যেন সাক্ষ্য না দিই। আর সেজন্যই ঘোরাঘুরি করে আর্থিক প্রলোভন দেখাচ্ছে। এক কথায়— সাক্ষ্য থেকে সরে দাঁড়ালে ভালো ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দেওয়া হবে এবং বিদেশে পড়াশোনার খরচ জোগানো হবে বলে ইঙ্গিত দিচ্ছে।’

আরেক সাক্ষী আনিস আহমেদ জানান, দুবাইয়ের একটি নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে কল করে তাকে সাক্ষ্য না দেওয়ার জন্য শাসানো হয়েছে। কলদাতা তার ঘরের ঠিকানা, মা ও বোনের মোবাইল নম্বর পর্যন্ত জানতেন। ফারাজ করিম দুবাইতে অবস্থান করায় তার নির্দেশে এ কল করা হতে পারে বলে সন্দেহ আনিসের।

তিনি বলেন, ‘তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দি দেওয়ার সময় আমরা যেসব তথ্য ও ঠিকানা ট্রাইব্যুনালে জমা দিয়েছিলাম, হুমকিদাতারা হুবহু সেগুলো উল্লেখ করছে। তারা এই গোপনীয় তথ্য কোথায় পেল, বুঝতে পারছি না। তবে কলটি যখন আসে, ফারাজ করিম দুবাইতে ছিলেন। আমাদের ধারণা, তিনি দুবাই বসেই অনুসারীদের দিয়ে আমাদের কল করাচ্ছেন। কারণ, মামলায় ২২ জন হেভিওয়েট আসামির মধ্যে কেবল ফজলে করিম চৌধুরীই কারাগারে আছেন।’

dhakapost
ড. হাছান মাহমুদ, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ও ফজলে করিম চৌধুরী | ছবি: ঢাকা পোস্ট

এ মামলায় ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার কথা রয়েছে ‘জুলাই রেভ্যুলুশনারি অ্যালায়েন্স’ চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি রেজাউল করিমের। তাকেও বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে জবানবন্দি না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাবার নাম ও বাসার ঠিকানা উল্লেখ করে জীবনে চরম ঝুঁকির মুখে পড়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

রেজাউল ঢাকা পোস্ট-কে বলেন, ‘তদন্ত কর্মকর্তার কাছে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় আমাদের ব্যক্তিগত নম্বর ও ঠিকানা দেওয়া হয়েছিল। দুর্ভাগ্যবশত সেটি ফাঁস হয়ে গেছে। এরপর থেকেই বিভিন্ন বিদেশি নম্বর থেকে ঘনঘন ফোন দিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে, যাতে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য না দিই। মূলত সাবেক এমপি ফজলে করিমের লোকজনেই এই কাজটি করাচ্ছেন।’

নিজের ও সহ-সাক্ষীদের নিরাপত্তা চেয়ে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন রেজাউল করিম। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সক্রিয় কর্মী ও মামলার তালিকাভুক্ত সাক্ষী হওয়ার কারণে আসামি ফজলে করিম ও তার পরিবার পরিকল্পিতভাবে বিচারিক প্রক্রিয়া বিঘ্নিত ও বিলম্বিত করতে বেআইনি কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন। চিঠিতে তিনি ফারাজ করিমের সহযোগী সাইদুল ইসলামের নম্বর সংযুক্ত করে হুমকি পাওয়া আরও চার সাক্ষীর সুরক্ষার দাবি জানান। 

dhakapost
ফজলে করিম চৌধুরীকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করানো হচ্ছে | ছবি: সংগৃহীত

নারী সাক্ষী আচিয়া খাতুন জানান, জর্ডানের একটি নম্বর থেকে ‘রহমান’ পরিচয়ে এক ব্যক্তি ফোন করে ফজলে করিমের বিরুদ্ধে কেন এবং কত টাকার বিনিময়ে সাক্ষ্য দিচ্ছেন তা জানতে চায়। জীবন বাঁচাতে হলে সাক্ষ্য থেকে সরে দাঁড়াতে বলা হয় তাকে। তবে, বিষয়টি তদন্ত কর্মকর্তাকে জানিয়েছেন বলে নিশ্চিত করেন আছিয়া।

এদিকে, রোবায়েতকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে প্রমাণ মিলেছে। তার ছবি, মোবাইল নম্বর ও পরিচয় ছড়িয়ে দিয়ে ‘জঙ্গি’ আখ্যা দিয়ে গত ৩ সেপ্টেম্বর একটি পোস্ট করেন সাজ্জাদ আমিন নামের এক ফেসবুক ব্যবহারকারী, যিনি নিজেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত শাখা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বলে দাবি করেন। একই দিন ‘ইশরাত জাহান মুন্নি’ নামের আরেকটি আইডি থেকেও তার নাম-ঠিকানাসহ ছবি পোস্ট করা হয়। বর্তমানে আমিরাতের বিভিন্ন নম্বর থেকে দিন-রাত ফোন দিয়ে তাকে হয়রানি করা হচ্ছে।

তবে, আসামিপক্ষ এসব অভিযোগের সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রিভিউ আবেদনের বিষয়ে ফজলে করিমের আইনজীবী ব্যারিস্টার রিজওয়ানা ইউসুফ ঢাকা পোস্ট-কে বলেন, ‘ফজলে করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই (‘কানেক্টিং দ্য ডট’ নেই)। যেসব ঘটনার কথা বলা হচ্ছে সেগুলো শহরে ঘটেছে, অথচ তার এলাকা শহর থেকে অনেক দূরে। তা ছাড়া চার্জশিটে তাকে জেলা আওয়ামী লীগের পদে দেখানোর কথা বলা হলেও তা সত্য নয়। রিভিউ আবেদনে আমরা এসব বিষয় তুলে ধরব।’

dhakapost
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম | ছবি: সংগৃহীত

হুমকির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাকেও রাতে ৪৭-৪৮টি অচেনা নম্বর থেকে ফোন দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে। প্রধান বিচারপতি, আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপির কাছে চিঠি দিয়েছি, গুলশান থানায় জিডিও করেছি। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও আমার ফাঁসি চেয়ে পোস্টার টানানো ও চরিত্র হনন করা হয়েছে। যার সব প্রমাণ আমার কাছে আছে। সাক্ষীরা যদি আসলেই হুমকি পান, তবে তারাও আইনিভাবে এসব জায়গায় অভিযোগ দায়ের করুক। শুধু ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ সীমাবদ্ধ রাখছেন কেন?’

এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘চট্টগ্রামের মামলায় হাছান মাহমুদ, নওফেল ও ফজলে করিমসহ ২২ আসামির মামলার বেশ কয়েকজন সাক্ষী নিরাপত্তাহীনতায় ভোগার অভিযোগ করেছেন। অভিযোগ পাওয়ার পরপরই স্থানীয় থানা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সাক্ষীদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আইনে সাক্ষী সুরক্ষার স্পষ্ট বিধান রয়েছে, তাই এটি আমাদের আইনি দায়িত্ব।’

সাক্ষীদের গোপনীয় তথ্য ফাঁসের প্রশ্নে তিনি বলেন, “ফরমাল চার্জ দাখিল হওয়ার পর তা ‘পাবলিক ডকুমেন্ট’ বা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত দলিলে পরিণত হয় এবং আসামিপক্ষও তা পাওয়ার আইনি অধিকার রাখে। ফলে কে কোথা থেকে তথ্য সংগ্রহ করছে, তা সবসময় সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে এসব হুমকি-ধমকি দিয়ে বিচার প্রক্রিয়া বানচাল করা যাবে না। এসব অপচেষ্টায় কোনো লাভ হবে না।’

উল্লেখ্য, এই মামলায় বর্তমানে পাঁচজন আসামি কারাগারে রয়েছেন। তারা হলেন— ফজলে করিম চৌধুরী, যুবলীগ নেতা আজিজুর রহমান, তৌহিদুল ইসলাম, মো. ফিরোজ ও দেবাশীষ পাল দেবু। অন্যদিকে, হাছান মাহমুদ ও নওফেল ছাড়াও পলাতক অন্য ১৫ আসামি হলেন— চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন, রেজাউল করিম, মহিউদ্দিন বাচ্চু, হেলাল আকবর, নুরুল আজিম রনি, শৈবাল দাশ সুমন, আবু ছালেক, এসবারুল হক, এইচএম মিঠু, নূর মোস্তফা টিনু, জমির উদ্দিন, ইমরান হাসান মাহমুদ, জাকারিয়া দস্তগীর, মহিউদ্দিন ফরহাদ ও সুমন দে।