বরিশালের দৈনিক সমকালের সাবেক ব্যুরোপ্রধান পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু আবারও সাংবাদিকদের জীবন ও পেশার ভেতরের এক গভীর সংকট সামনে এনেছে। গতকাল শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় বরিশালের প্যারারা রোডে সমকালের কার্যালয় থেকে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার পকেট থেকে পাঁচটি চিরকুট উদ্ধার করা হয়। পুলিশ বলেছে, চিরকুটগুলোর বক্তব্য ও ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি দেখে প্রাথমিকভাবে এটি আত্মহত্যা বলে মনে হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্ত ও তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়।
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুর সঙ্গে আরও একটি বিষয় সামনে এসেছে। তিনি ২০২৩ সালের মে মাসে সমকাল থেকে চাকরি হারিয়েছিলেন। এরপরও তিনি প্রায়ই ওই কার্যালয়ে যেতেন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তার রেখে যাওয়া চিরকুটে দীর্ঘদিনের অসুস্থতা, চিকিৎসা করেও সুস্থ না হওয়া এবং বেকারত্বজনিত কষ্টের কথা ছিল। অর্থাৎ একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিকের জীবনের শেষ অধ্যায়ে শারীরিক অসুস্থতা ও কর্মহীনতার চাপ বড় হয়ে উঠেছিল।
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত দেড় দশকে বিভিন্ন সময় দেশে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের আত্মহত্যার খবর এসেছে। তবে দেশে সাংবাদিকদের আত্মহত্যার কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি তথ্যভান্ডার নেই। ফলে মোট সংখ্যা নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া কঠিন। বিভিন্ন সময়ের সংবাদ প্রতিবেদন মিলিয়ে ২০১২ সালের মিনার মাহমুদ থেকে ২০২৬ সালের পুলক চ্যাটার্জি পর্যন্ত অন্তত ১৩ জন সাংবাদিক বা গণমাধ্যমকর্মীর আত্মহত্যার তথ্য পাওয়া যায়। এই সংখ্যা চূড়ান্ত নয়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত আরও কিছু ঘটনা বাদ পড়ে থাকতে পারে।
২০১২ সালের ২৯ মার্চ আত্মহত্যা করেন সাংবাদিক ও লেখক মিনার মাহমুদ। তিনি আলোচিত সাময়িকী বিচিন্তার সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন। ঢাকার একটি হোটেলের কক্ষ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার মৃত্যুর সঙ্গে একটি চিঠির কথাও তখন প্রকাশ্যে আসে। জীবনের নানা ব্যর্থতা ও হতাশার কথা সেখানে ছিল বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। দৈনিক আমার দেশ-এর বরিশাল ব্যুরো প্রধান জি এম বাবর আলী ২০১৪ সালের মে আত্মহত্যা করেন।
এরপর ২০১৮ সালের ২২ অক্টোবর যশোরের সাংবাদিক দানিয়েল হাবিব নোভা ওরফে নোভা খন্দকারের মৃত্যুর খবর আসে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তার মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ২০২২ সালের ২২ জানুয়ারি আত্মহত্যা করেন সাংবাদিক ও কবি সৌরভ মাহমুদ নূর। তিনি নিউজ২৪বিডি ডটনেটের সহসম্পাদক হিসেবে কাজ করেছিলেন। একই বছরের ১৩ জুলাই মারা যান সাংবাদিক সোহানা পারভীন তুলি। তিনি কালের কণ্ঠ, বাংলা ট্রিবিউন ও আমাদের সময়-এ কাজ করেছিলেন। পুলিশ তখন মানসিক হতাশাকে তার আত্মহত্যার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিল।
২০২২ সালের ২৭ ডিসেম্বর মারা যান ফটোসাংবাদিক শবনম শারমিন মুক্তি। তিনি দ্য রিপোর্ট ডট লাইভে কাজ করেছিলেন। তার মৃত্যুর পর স্বজনেরা কর্মক্ষেত্র ও পারিবারিক জীবনে নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছিলেন। ঘটনাটি নিয়ে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলাও হয়েছিল। তাই তার ক্ষেত্রে আত্মহত্যার ঘটনা থাকলেও এর পেছনের কারণ নিয়ে আলাদা তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।
২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট হাতিরঝিল থেকে গাজী টেলিভিশনের নিউজরুম সম্পাদক রাহনুমা সারাহর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার স্বামী আত্মহত্যার কথা বলেছিলেন। সে সময় সংবাদমাধ্যমে তার কর্মক্ষেত্রের অসন্তোষ ও বেতন না পাওয়ার বিষয়ও উঠে আসে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, মৃত্যুর আগে কয়েক মাস তিনি বেতন পাননি। তার মৃত্যুর ঘটনাও সাংবাদিকদের আর্থিক নিরাপত্তার প্রশ্নকে সামনে আনে।
এরপর ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর মারা যান সাংবাদিক সীমান্ত খোকন। রাজধানীর চামেলীবাগের বাসা থেকে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে জানিয়েছিল। সীমান্ত খোকন দীর্ঘদিন সাংবাদিকতায় যুক্ত ছিলেন এবং এনটিভির নিউজ এডিটর হিসেবে কাজ করেছিলেন। তিনি জাতীয় প্রেসক্লাবের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যও ছিলেন।
২০২৫ সালের ২২ আগস্ট মারা যান প্রবীণ সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকার। তিনি তখন আজকের পত্রিকায় কাজ করতেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কলামও লিখতেন। নিখোঁজ হওয়ার আগে তিনি একটি খোলা চিঠি পাঠিয়েছিলেন। সেখানে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের অসুস্থতা, সন্তানের চাকরি না হওয়া এবং নিজের বেতন-ভাতা না বাড়ার কারণে আর্থিক সংকটের কথা লিখেছিলেন। মেঘনা নদী থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হয়।
২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট মারা যান সাংবাদিক ওয়াহেদ-উজ-জামান বুলু। তিনি সংবাদ প্রতিদিনের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ছিলেন। রূপসা সেতু থেকে নদীতে পড়ে তার মৃত্যু হয়। পুলিশের তদন্তে ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে দেখা হয়েছিল। একই বছরের ৪ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারে মারা যান সাংবাদিক মোহাম্মদ আমিন উল্লাহ। তিনি স্থানীয় সাংবাদিকতায় যুক্ত ছিলেন। ২৭ সেপ্টেম্বর জামালপুরের ইসলামপুরে মারা যান সাংবাদিক ওসমান হারুনী। তিনি মোহনা টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি এবং আমার দেশ-এর ইসলামপুর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন।
২০২৫ সালের ১৮ অক্টোবর মারা যান গণমাধ্যমকর্মী স্বর্ণময়ী বিশ্বাস। তিনি ঢাকা স্ট্রিমে গ্রাফিক নকশাবিদ হিসেবে কাজ করতেন। তার মৃত্যুর ঘটনায় দীর্ঘ তদন্তের পর আত্মহত্যার বিষয়টি সামনে আসে।
চলতি বছরের ১৬ জুলাই যশোরে মারা যান সাংবাদিক ছাকিন হোসেন। তিনি দৈনিক সুবর্ণভূমির স্টাফ রিপোর্টার এবং গ্রিন টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি ছিলেন। এরপর ১১ সেপ্টেম্বর সামনে আসে পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু। সর্বশেষ কর্মস্থল সমকাল হলেও মৃত্যুর সময় তিনি সেখানে কর্মরত ছিলেন না। ২০২৩ সালে চাকরি হারানোর পরও তিনি পুরোনো কর্মস্থলে যাতায়াত করতেন।
সাংবাদিক ও ভাওয়াইয়া শিল্পী শফিউল আলম রাজাকে কেউ কেউ আত্মহত্যা করা সাংবাদিকদের তালিকায় রাখছেন। তিনি ২০২২ সালের একদিন মিরপুরের পল্লবীর একটি গানের স্কুলের কক্ষ থেকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার হন। পরিবারের ধারণা ছিল হৃদ্রোগে তার মৃত্যু হতে পারে। পুলিশও তখন মৃত্যুর কারণ তদন্ত করার কথা জানিয়েছিল।
এখন প্রশ্ন হলো, সাংবাদিকদের মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা কি সত্যিই দেশে অন্য অনেক দেশের তুলনায় বেশি? এর সরাসরি উত্তর দেওয়ার মতো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান এখনো নেই। কারণ দেশে সাংবাদিকদের আত্মহত্যা নিয়ে কোনো জাতীয় নিবন্ধন বা আলাদা তথ্যভান্ডার নেই। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের মোট সংখ্যা, বয়স, কর্মসংস্থান, আয়, কর্মঘণ্টা এবং আত্মহত্যার হার—এসব তথ্যও একসঙ্গে পাওয়া যায় না।
তবে বলা যায়, দেশে সাংবাদিকদের আত্মহত্যার ঘটনাগুলো নিয়ে উদ্বেগজনক ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এই প্রবণতা অন্য দেশের চেয়ে বেশি—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে পেশাভিত্তিক গবেষণা দরকার। এই সতর্কতার কথা বলেছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আহমেদ হেলালও। সাংবাদিকদের আত্মহত্যার ঘটনা বেড়েছে কি না, গবেষণা ছাড়া তা বলা যাবে না বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। তার মতে, যেসব ঘটনার ইতিহাস পাওয়া যায়, সেগুলোর মধ্যে হতাশাজনিত বিষণ্নতা, পেশাগত ও আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং পারিবারিক সংকট একসঙ্গে কাজ করেছে।
এই বক্তব্যের সঙ্গে সাংবাদিকদের কাজের বাস্তবতাও মিলে যায়। সাংবাদিকতা এমন একটি পেশা, যেখানে কাজের সময় নির্দিষ্ট নয়। রাতের দায়িত্ব, রাজনৈতিক চাপ, মাঠপর্যায়ে ঝুঁকি, মামলা, হুমকি, সামাজিক চাপ—সবকিছুই অনেক সাংবাদিককে সামলাতে হয়। অথচ অনেক প্রতিষ্ঠানে চাকরির নিশ্চয়তা নেই। নিয়মিত বেতন নেই। বেতন হলেও তা অনেক সময় জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। চাকরি হারালে ক্ষতিপূরণ বা দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থাও দুর্বল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক খোরশেদ আলমও সাংবাদিকদের আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এনেছেন। তার মতে, সাংবাদিকেরা সামাজিক দায়িত্ব পালনের স্বপ্ন নিয়ে পেশায় আসেন। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে স্বস্তি না থাকলে তার প্রভাব পরিবারেও পড়ে। তিনি সাংবাদিকদের কল্যাণে রাষ্ট্রের ভূমিকা এবং সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের প্রাপ্য বেতন নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুর ক্ষেত্রে এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সাংবাদিকতার পর একজন অভিজ্ঞ কর্মী চাকরি হারালেন। এরপর অসুস্থতার সঙ্গে লড়লেন। তার নিজের লেখা চিরকুটে বেকারত্ব ও চিকিৎসাজনিত কষ্টের কথা উঠে এসেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। এ ধরনের ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত মানসিক সংকট হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। এর সঙ্গে শ্রম অধিকার, চাকরির নিরাপত্তা, বেতন ও সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্নও জড়িত।
আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও সাংবাদিকদের মানসিক চাপের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। কিংস কলেজ লন্ডনের গবেষকদের একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সাধারণ জনগণের তুলনায় সাংবাদিকদের মধ্যে আঘাত-পরবর্তী মানসিক চাপের হার বেশি। একই গবেষণায় বলা হয়েছে, মানসিক সমস্যার কথা সহকর্মীদের কাছে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের কর্মপরিবেশে এক ধরনের বাধা রয়েছে।
এর কারণও বোঝা যায়। সাংবাদিকদের প্রতিদিন এমন সব ঘটনা দেখতে হয়, যা সাধারণ মানুষ নিয়মিত দেখেন না। হত্যা, দুর্ঘটনা, সহিংসতা, লাশ, যুদ্ধ, দাঙ্গা, নির্যাতন ও বিপর্যয়ের খবর করতে গিয়ে সাংবাদিকেরা নিজেরাও মানসিক আঘাতের শিকার হতে পারেন। দীর্ঘদিন এমন কাজের পরও তাদের জন্য নিয়মিত মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা অনেক প্রতিষ্ঠানে নেই।
সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক কেন্দ্র আয়োজিত এক আলোচনায় মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ভিক্টর শোয়ার্টজ বলেছিলেন, আত্মহত্যার সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের প্রচলিত অনেক কাজই সমস্যাজনক হতে পারে। সামারিটানসের গণমাধ্যম পরামর্শক লর্না ফ্রেজারও বলেছেন, কয়েক দশকের গবেষণায় আত্মহত্যার সংবাদ পরিবেশনের ধরন ও আত্মহত্যার হারের মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বিশেষ করে ঘটনার পদ্ধতি বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা ঝুঁকি বাড়াতে পারে। একই আলোচনায় সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প, সহায়তার পথ এবং আশার বার্তা তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৯ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, দেশের অনলাইন সংবাদমাধ্যমে আত্মহত্যার সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা যথাযথভাবে মানা হচ্ছিল না। অধিকাংশ প্রতিবেদনে মৃত ব্যক্তির পরিচয়, আত্মহত্যার পদ্ধতি ও ব্যক্তিগত জীবনের নানা তথ্য প্রকাশ করা হয়েছিল। গবেষকেরা বলেছেন, দায়িত্বহীন সংবাদ পরিবেশন আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তাই সাংবাদিকদের আত্মহত্যার খবর প্রকাশের ক্ষেত্রেও সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব আছে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্বও আছে সংবাদমাধ্যম মালিক, সম্পাদক, সরকার ও সাংবাদিক সংগঠনগুলোর।
প্রথম প্রয়োজন নিয়মিত ও সময়মতো বেতন। দ্বিতীয় প্রয়োজন চাকরির নিশ্চয়তা। তৃতীয় প্রয়োজন চাকরি হারালে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ। চতুর্থ প্রয়োজন অসুস্থ সাংবাদিকের চিকিৎসা সহায়তা। পঞ্চম প্রয়োজন কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা। ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালনকারী সাংবাদিকদের জন্য জীবন ও স্বাস্থ্যবিমার ব্যবস্থাও করা দরকার।
ওয়েজ বোর্ডের সুপারিশ থাকলেই হবে না। তার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সংবাদমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিককে শুধু খবর তৈরির যন্ত্র হিসেবে দেখলে চলবে না। তিনি একজন মানুষ। তার পরিবার আছে। তার চিকিৎসার প্রয়োজন আছে। তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে নিরাপত্তার প্রয়োজন আছে।
সাংবাদিকতা গণতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পেশা। একজন সাংবাদিক যখন দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার বা মানুষের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন তিনি সমাজের জন্য কাজ করেন। অথচ সেই সাংবাদিকের নিজের জীবন যদি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তাহলে পেশাটিও দুর্বল হয়।
মিনার মাহমুদ থেকে সীমান্ত খোকন, রাহনুমা সারাহ থেকে বিভুরঞ্জন সরকার, আর সর্বশেষ পুলক চ্যাটার্জি—এই নামগুলো তাই শুধু কয়েকটি মৃত্যুর তালিকা নয়। এগুলো সাংবাদিকতা পেশার ভেতরে জমে থাকা চাপ, অনিশ্চয়তা ও অসহায়তার সতর্কবার্তা।
তবে আত্মহত্যাকে কোনোভাবেই সাংবাদিকতার স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে দেখা যাবে না। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আহমেদ হেলালের ভাষায়, আত্মহত্যার পেছনে একটিমাত্র কারণ থাকে না। হতাশা, বিষণ্নতা, পারিবারিক সমস্যা, অসুস্থতা ও আর্থিক অনিশ্চয়তা একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
তাই সমাধানও এক জায়গায় নেই। সাংবাদিকের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে হবে। একই সঙ্গে তার চাকরি, বেতন, চিকিৎসা ও সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কোনো সাংবাদিক যাতে দীর্ঘদিন বেতন না পেয়ে, চাকরি হারিয়ে বা চিকিৎসার খরচ জোগাতে না পেরে একা হয়ে না পড়েন, সেই ব্যবস্থা করতে হবে।
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুর তদন্ত শেষ হলে তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও তথ্য জানা যাবে। কিন্তু তার মৃত্যুকে ঘিরে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে, সেগুলোর উত্তর এখনই খোঁজা দরকার। একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক কেন চাকরি হারানোর পর নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়বেন? অসুস্থ সাংবাদিকের জন্য তার প্রতিষ্ঠান কী করেছে? চাকরি হারানো সাংবাদিকের জন্য সাংবাদিক সংগঠনগুলোর কোনো সহায়তা আছে কি না? রাষ্ট্রের শ্রম ও গণমাধ্যম নীতিতে তাদের জন্য কী সুরক্ষা রয়েছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না খুঁজলে শুধু মৃত্যুর খবর প্রকাশ হবে। কিন্তু মৃত্যুর কারণের গভীরে যাওয়া হবে না।
আর সাংবাদিকদের আত্মহত্যার ঘটনা কমাতে হলে শুধু তাদের মানসিকভাবে শক্ত থাকার পরামর্শ দিলেই হবে না। তাদের এমন একটি পেশাগত পরিবেশ দিতে হবে, যেখানে পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য আছে, অসুস্থ হলে চিকিৎসার নিশ্চয়তা আছে, চাকরি হারালে ন্যায্য অধিকার আছে এবং সংকটে পড়লে পাশে দাঁড়ানোর মানুষ ও প্রতিষ্ঠান আছে। সাংবাদিকের অধিকার রক্ষা তাই শুধু সাংবাদিকের স্বার্থ নয়। এটি স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং গণতান্ত্রিক সমাজের স্বার্থও।