Image description
নাসিরসহ দলের ১১ জন গ্রেপ্তার

সৈয়দ নাসিরের বাড়ি বাগেরহাটে। এক সময় ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে স্বর্ণের দোকানে চুরি-ডাকাতি করতেন। এজন্য তার একটা দলও ছিল। চৌর্যবৃত্তি ছেড়ে প্রায় এক যুগ আগে তিনি পাড়ি জমান ইউরোপের দেশ ফ্রান্সে। স্ত্রীকেও নেন সেখানে। অপরাধী তালিকায় থাকা এই নামটি পুলিশ প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। তবে পুরোনো অভ্যাস ছাড়তে পারেননি নাসির। ইউরোপে বসেই দেশে ডাকাত দল চালান তিনি।

সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে শাহআলী শপিং কমপ্লক্সে দুটি জুয়েলারি দোকানে অন্তত আড়াইশ ভরি স্বর্ণালংকার চুরির মামলা তদন্ত করতে গিয়ে ফের সামনে এসেছে সৈয়দ নাসিরের নাম। ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) ওই মামলাটি তদন্ত করছে। ডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, ওই ঘটনায় এখন পর্যন্ত সৈয়দ নাসিরসহ তার ডাকাত দলের ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরপর নাসিরের পরিচয় পেয়ে তদন্তকারীরাও বিস্মিত হন।

গ্রেপ্তারের পর ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে সৈয়দ নাসির জানিয়েছেন, বহু বছর ধরেই তিনি একটি দল লালন-পালন করে স্বর্ণের দোকানে চুরি-ডাকাতি করাচ্ছিলেন। ফ্রান্সে থাকলেও মাঝেমধ্যে দেশে এসে দলের লোকজনের সঙ্গে বৈঠক করেন, নানা পরামর্শ দেন। স্বর্ণ লুট করতে নানা কৌশল করেন। সর্বশেষ গত এপ্রিল মাসে দেশে এসে শাহআলী মার্কেটের স্বর্ণের দোকান টার্গেট করেন।

স্ত্রীকে নিয়ে ফ্রান্সে বসবাস করেও দেশে কেন এটা করছেন, তদন্তকারীদের এমন প্রশ্নে সৈয়দ নাসির বলেছেন, ‘এটা তার নেশা হয়ে গেছে। দল চালানো, সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে স্বর্ণ লুট করা তার কাছে একটি হিরোইজম।’ তার ভাষ্য, বহু বছর এ ধরনের কাজ করেছেন, তবে এবারই প্রথম ধরা খেলেন।

সৈয়দ নাসিরের এলাকার লোকজন ও ডিবির তদন্তকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফ্রান্সে যাওয়ার পর তার স্ত্রী স্বামী সম্পর্কে জানতে পেরে তাকে সুপথে নেওয়ার চেষ্টা করেন। না পেরে শেষ পর্যন্ত স্ত্রী আরেকটি বিয়ে করেন।

ডিবি পুলিশের মিরপুর বিভাগের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, সৈয়দ নাসিরকে গ্রুপের সবাই চেনে ফ্রান্স নাসির নামে। তার হয়ে মূলত শ্যালক শামীম খান দেশে ডাকাত দলটিকে দেখভাল করে আসছিল। বোন চলে গেলেও শামীম তার দুলাভাইর হয়ে দেশে এ চক্রের পুরো অপরাধের সমন্বয় করে আসছিল। অপরাধ জগতে এ দলটি ‘শ্যালক-দুলাভাই গ্রুপ’ নামে পরিচিত। পরে শামীম খানকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

স্বজন ও প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, নাসির গ্রামে তেমন আসেন না। তার মা বাগেরহাটে শহরের একটি বিদ্যালয়ের আয়া পদে চাকরি করতেন। বর্তমানে বাবা-মা কেউ জীবিত নেই। নাসিররা পাঁচ ভাই-বোন। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সে মেজো। নাসিরের বড় ভাই বাগেরহাট বন বিভাগে চাকরি করেন। ছোট ভাই মালয়েশিয়াপ্রবাসী।

শামীমের বাড়ি বরিশালের উজিরপুরে। তার বাবা বরিশাল একটি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ছিলেন। শামীমও মাদ্রাসায় পড়ালেখা করেছেন। তার এলাকার লোকজন জানান, শামীম শুরুতে ছোটখাটো চুরি করলেও পরে বড় ধরনের ডাকাতির সঙ্গে যুক্ত হন। এক পর্যায়ে দুলাভাইয়ের নেতৃত্বে একের পর এক অপরাধ করছেন।

নিরাপত্তাকর্মীর আড়ালে স্বর্ণের দোকানে চুরি-ডাকাতি করান নাসির: ডিবি কর্মকর্তারা বলছেন, নাসির মূলত যে মার্কেটের স্বর্ণের দোকান টার্গেট করে, ওই মার্কেটে নিজের লোকজনকে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে চাকরি দেয়। ছদ্মবেশী নিরাপত্তাকর্মীরা টার্গেট করা দোকানে কি পরিমাণ স্বর্ণ রয়েছে, দোকনটির নিরাপত্তা ত্রুটি খুঁজে বের করে। এরপর চুরি করে। এ জন্য এই গ্রুপটি একেকটা অপারেশন চালাতে দীর্ঘ সময় নেয়। স্বর্ণ লুট করলেও এরা ধরা পড়ে না।

ডিবির মিরপুর জোনাল টিমের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) সাজিদুর রহমান কালবেলাকে বলেন, সম্প্রতি মিরপুরের শাহআলী মার্কেটে দুটি স্বর্ণের দোকান থেকে স্বর্ণ লুট করার সঙ্গে জড়িত ছয়জনই সৈয়দ নাসিরের দলের সদস্য। যদিও তারা ধানমন্ডি এলাকায় অবস্থিত ‘এভান্ট গ্রেড এলায়েন্স লিমিটেড’ নামে নিরাপত্তাকর্মী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের হয়ে ওই মার্কেটে দায়িত্ব পালন করছিল।

ডিবি মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) রাকিব খান কালবেলাকে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ কোনো স্থাপনা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কোনো লোক নিয়োগের আগে অবশ্যই জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করা জরুরি। যদি কেউ ভুয়া পরিচয়পত্র দেখিয়ে কোনো অপরাধ ঘটিয়ে পালিয়ে যায়, তাকে শনাক্ত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বেগ পেতে হয়। নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ও তাদের নিয়োগকারীকে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানান এ কর্মকর্তা।

চুরির পর যেভাবে হয় ভাগবাটোয়ারা: চুরি করা স্বর্ণের ৫০ ভাগ নেয় চক্রের মূলহোতা সৈয়দ নাসির ও তার শ্যালক শামীম। বাকি অংশ দলের ভূমিকা অনুযায়ী সদস্যদের মাঝে ভাগ করা হয়। নাসির ও শামীমের ৫০ ভাগ মালের আবার তিন ভাগ হয়। এর দুই ভাগ নাসির ও এক ভাগ শামীমের। তবে তারা বড় অংশ পেলেও প্রথমে এই স্বর্ণ বিক্রি করে না। ঢাকাসহ আশপাশের জেলায় বিভিন্ন স্বর্ণ ব্যবসায়ীর কাছে এই স্বর্ণ বন্ধক রাখে। এরপর পরিস্থিতি অনুকূলে এলে বন্ধক রাখা স্বর্ণ ছাড়িয়ে নিয়ে ধাপে ধাপে বিক্রি করা হয়।

যেভাবে শাহআলী শপিং কমপ্লেক্সে স্বর্ণ লুট: গত ২৫ জুলাই শাহআলী শপিং কমপ্লেক্সের দ্বিতীয় তলার আল রাজ্জাক জুয়েলার্স ও এ হোসেন জুয়েলার্স নামের দুটি দোকান থেকে প্রায় আড়াইশ ভরি স্বর্ণালংকার লুট হয়। ডিবি ও থানা পুলিশ তদন্তে নেমে চুরিতে অংশ নেওয়া কথিত নিরাপত্তাকর্মী নাসির উদ্দিন ওরফে ইউসুফ, সোহরাব হোসেন শিকদার ওরফে বাবুল, সাদেক ওরফে রাব্বি ও আবুল কালাম মৃধাকে গ্রেপ্তার করে। এই পাঁচজন এভান্ট গ্রেড অ্যালায়েন্স লিমিটেড নামের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের কর্মী। পরে তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী মূলহোতা সৈয়দ নাসির ও সমন্বয়ক শামীমসহ আরও ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে।

ডিবি সূত্র জানায়, এভান্ট গ্রেড অ্যালায়েন্স লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ দেওয়া মার্কেটের দায়িত্বরত ওই পাঁচ নিরাপত্তাকর্মী ঘটনার পর উধাও হয়ে যায়। কর্মস্থলে জমা দেওয়া তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করে দেখা যায়, ওই কাগজপত্র ভুয়া। তাদের গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে আসে এরা আসলে সৈয়দ নাসির গ্রুপের।

ওই মার্কেটের ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা বলছেন, লুটের আগে দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তাকর্মীর ছদ্মবেশে প্রতিটি দোকানের নিরাপত্তার ত্রুটি খুঁজেছে।

এ হোসেন জুয়েলার্সের মালিক আবুল হোসেন বলেন, নিরাপত্তকর্মীদের অনেকেই বিভিন্ন সময়ে উঁকিঝুঁকি দিত। কিন্তু তখন তারা মনে করেছিলেন, এটা নিরাপত্তা তদারকির অংশ। ওই দুটি দোকান ছাড়াও মার্কেটে প্রিন্স জুয়েলার্সে তালা ভাঙা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত দোকানে প্রবেশ করতে পারেনি চক্রের সদস্যরা।